আকাশ অম্বর-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আজ অনেকদিন পর, দুপুরের নির্জনতায়, প্রখর রোদের প্রবল উষ্ণতায় আর শুষ্ক সময়ের নিষ্ক্রিয় এক ক্ষণে প্রেম এসেছিলো আমার দুয়ারে।
চৈত্র-মধ্যাহ্নের এই তপ্ত-উষ্ণ বায়ু-প্রভাবিত কুটকুটে শরীর আর স্যাঁতস্যাঁতে চামড়ার আর্দ্রতাপুষ্ট অবসন্ন সিক্ত লোমের নিষ্প্রভতায় আমি শুনেছিলাম আমার সরু করিডোরের গায়ে পাতা-মচমচে পায়ের শব্দ। ধুলো পড়া মোজাইকের গায়ে পা টেনে চলা সেই ধূসর পদশব্দ যখন আমার কানে এলো, আমি তখন চুপচাপ আমার একাকী কক্ষে বিরাজমান। তার অঙ্গসঞ্চলন আমার চিরচেনা। আজ অনেক মুহূর্ত কেটে গেছে হয়তো, তবু তার সেই ধীর স্থির খুঁড়িয়ে চলা শব্দ-তরঙ্গ আমার কর্ণকুহরে অনুরণন তুলতে ভুললো না মোটেই। তার মৃদু খুক্খুকে কাশি আর ঢলঢলে আলখাল্লার নীরব ঘর্ষণ-ধ্বনি আমি বিস্মৃত হতে বসেছিলাম প্রায়। তার ক্ষীণকায় কৃশকায় ছায়া যখন আমার উষ্ণ-ঘরের পুরু-কাঠের দরজার তলায় এসে স্থির হোলো, আমার হঠাৎ এই গদি-আঁটা চেয়ারখানি থেকে দণ্ডায়মান হয়ে অভ্যর্থনার ঝুলি নিয়ে এগিয়ে যেতে ইচ্ছে হোলো খুব। অহংবোধ বা আত্মমর্যাদাহানির ভীতি বা যাই হোক না কেন, আমি তাই বসেই রইলাম। চিবুকে হাত রেখে। ঘরের দেয়াল অথবা ওটার গায়ে আটকে থাকা এক টিকটিকির দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলাম। ওটা পালিয়ে গেলে আমার চোখ খুঁজে নিলো শূন্য-কক্ষে বেঁচে থাকা এক ক্যাকটাসের দীর্ঘদিনের যত্নে লালিত এক সূচালো কণ্টক।
- আসবো? (ফ্যাসফ্যাসে হালকা মৃদুস্বর)
- কে? (আমার মিথ্যাভিমান)
- আমি প্রেম। আসবো?
ইতস্তত আমি।
সে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো।
দরজাটা খোলাই ছিলো।
আমি এক পলক তাকিয়ে দেখলাম তাকে।
ছিঁড়ে যাওয়া পাদুকা। ধুলোয় ধূসরিত পদাঙ্গুলি। পাজামার ছিন্ন অংশ দিয়ে উদগ্র লোমশ পায়ের কিঞ্চিত দৃশ্যমান। মোটা কাপড়ের হলুদ আলখাল্লা। দুএক জায়গার ফুটো দিয়ে অন্তর্বসন দিব্যি দৃশ্যমান। লোমশ হাতে চর্মরোগের অতীত দাগ। কাঁচা-পাকা খোঁচা-খোঁচা দাড়ির আড়ালে রোদে পোড়া জড়বুদ্ধির হলদেটে উঁচু দাঁত। জটা ধরা তামাটে চুল। উৎকট গন্ধ। বামহাত জেবে ঢুকিয়ে অন্য হাতে উলের রঙচটা মাফলারটা এই গরমে আরও জড়িয়ে নিলো সে। রুক্ষ, বিত্তহীন, নিঃস্ব ও দুর্গত এক সত্তা। মৃদু ফ্যাকাসে হাসি তার আমার উদ্দেশ্যে।
এ কী হাল তার!
মনে মনে আহ্লাদিত হলাম।
চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আনমনে ভাবতে থাকলাম কিছু। সরল ছন্দিত স্পন্দনে পদযুগল নাচাতে থাকলাম।
সে ঘরময় পায়চারি করতে থাকলো। শূন্য গেলাসখানি হাতে নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা চালালো কিছুক্ষণ। অসহিষ্ণু এই দাবদাহে গলদেশ কিঞ্চিত শুকিয়ে আসতেই পারে, কিন্তু আমার চেয়ারের পাশেই নিরালায় পড়ে থাকা জলের পাত্রটির গোপনীয়তা প্রকাশে দ্বিধাচিত্তে অপরাধবোধে ভুগতে রাজী হলাম না আমি।
- কোথায় বসবো? (শুষ্ক কণ্ঠে বিনীত জিজ্ঞাসা)
- যেখানে ইচ্ছে...
সে খুঁজে নিলো শূন্য মেঝে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পা গুটিয়ে বসলো। মায়া ভরা চোখে আমার দিকে তাকালো। করুণা প্রত্যাশী দৃষ্টি।
চোখ সরিয়ে নিলাম। মানবিকতার খাতিরে আর সামাজিকতা রক্ষার্থে কিছু কথা না বললেই নয়,
- কেমন আছো?
- এই তো...চলছে...তুমি? তুমি? (আগ্রহী অনুরাগপুষ্ট স্বর)
- সবসময় ভালো।
- (বিগলিত হাসি) অনেকদিন তোমার সাথে দেখা নেই...ভাবলাম...
- কোন প্রয়োজন ছিলো না...
চুপচাপ দুপুর। বাইরের রোদের আঁচ হিলহিলিয়ে দেহের অভ্যন্তরে সেধিঁয়ে যাচ্ছে। দেহের উপর ফেলে যাচ্ছে চট্চটে প্রলেপ। কর্মোদ্যমহীন রক্তমাংস। অকর্মণ্য প্রাণ। নিস্তেজ সত্তা। মরা পৃথিবী।
টিকটিকিটা শুধু আবার ফিরে এসেছে। ওঁৎ পেতেছে শিকারের।
- কতক্ষণ থাকবে? (একনিষ্ঠ প্রশ্ন আমার)
- (কোনো শব্দ নেই)
- (ঘড়ি দেখার ভান করলাম) আমার একটু কাজ ছিলো...
- (চোখে প্রত্যাখানের ছায়া...অপক্ষেপ)
সে চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো।
ধুলো ঝেড়ে গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলে খোলা দরজা দিয়ে ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হোলো এক প্রাচীন উপেক্ষিত সত্তা।
হাঁফ ছেড়ে শিথিলচিত্তে হাত বাড়িয়ে কেরোসিন কাঠের তাক থেকে আমি তুলে নিলাম ‘নিঃসঙ্গতায় আত্মাহুতি’ বইটি। অজানা কোন লেখক। সংশ্লিষ্টতা, সম্পৃক্ততা, সংসৃষ্টতা প্রয়োজনীয় শুধু এখন। হোক সেটা জড়বস্তুর সাথে। অধ্যয়নরত মানস শুধু ক্ষণে ক্ষণে তাকায় শূন্য মেঝের দিকে। দেয়ালে আগন্তুকের পিঠের ঘাম শুকোয়নি এখনো।
দরজাটা সে খোলা রেখে গেছে।
একরাশ বিরক্তি শুধু আমার ভাবলেশহীন দুইচোখে।
_____________________
(পূর্ব-প্রকাশিত)
মন্তব্য
কিছু লেখা তাড়াহুড়ো করে চোখ বুলিয়ে যাবার মত হয়না, এর গভীরে ঢুকতে হলে চাই সেই স্থির শান্ত মন, আপনার এই লেখাটি সে মনোযোগের দাবীদার।প্রিয়তে রাখছি।
লেখকের মন্তব্য
হাহা! ধন্যবাদ হে মেঘ। কিন্তু আমার লেখা কোন কিছু দাবী করে না। আমার লেখা পথ চলতেই আনন্দ পায়। লেখা শেষ হলে তার আর কিছু চাওয়ার থাকেনা। আপনার মন শান্ত স্থির হওয়ার প্রয়োজনীয়তাটুকু একান্তই আপনার নিজের! এটার সাথে এই লেখার তো কিছু যায় আসে না! লেখাটা অগুরুত্বপূর্ণ। সে তার গুরুত্ব হারিয়েছে পথ চলা শেষ হওয়ার পর।
আপনি সবাইকেই বেশ অনুপ্রেরণা দেন। ভালো লাগে।
ভালো থাকুন, সবসময়।
আমি বলিনি যে আমার মন শান্ত স্থির হওয়ার সাথে এই লেখার কিছু যাবে আসবে। আসলে ব্যক্তিগতভাবে কথাটা বলিনি।
ভালো থাকবেন ভাই আকাশ।
লেখকের মন্তব্য
তাহলে আমারই বুঝতে ভুল হয়েছে! আপনিও ভালো থাকবেন সিসটার!
প্রতিটি শব্দ অক্ষরে অক্ষরে নিজ ভান্ডারে তুলে নিলাম।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ জানালাম
আকাশ, আপনার এই লেখাটা যে কারও গভীর মনোযোগের প্রত্যাশা করতে পারে। চমৎকার লিখেছেন।
লেখকের মন্তব্য
হুম। ধন্যবাদ হে সকাল। মেটাফিজিক্যাল এন্টিটিটা কিন্তু পুরোদস্তুর ফিজিক্যাল হতে পারে। পুরোনো কোন অবাঞ্ছিত অতিথি হু ইজ নট ওয়েলকাম এট এল। যার নাম হতে পারে 'প্রেম চোপড়া'! :~ হাহাহা! সুহৃদ পাঠকের হাতেই লেখকের মৃত্যু। এটা বেশ মজার!
শুভেচ্ছা, সবসময়।
হুমমম
লেখকের মন্তব্য
জলরঙ বলেছেন - হুমমম
সুন্দরম আকাশ ।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদম, হে বোহেমিয়ান
খুব ভালো লাগলো ভ্রাতা। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না...
লেখকের মন্তব্য
ভাষা হোক মুক্ত (কপিরাইট অভ্র)!
পড়েছেন জেনে ভালো লাগলো, ভ্রাত্রী।
অবস্তুকে নিয়ে আমার উন্মাদ-কল্পনার রূপ অনেকটা এরকম, তাই এই লেখাটা অসামান্য-রকমের ভালো লাগলো। ভালোবাসার কতো ছিন্নখিন্নরূপ! দেখে মায়া হলো, আমি তাকে সবসময়েই ভালোবাসি! এ আপনার কাছে অভিযোগ ঠুকে গেলাম!
লেখকের মন্তব্য
অভিযোগটা আমি সুযোগ পেলে চেয়ারে বসে থাকা পাপিষ্ঠটাকে জানিয়ে দেবো, ছন্ন। শুভেচ্ছা, সবসময়।
কমেন্ট করতে বসে খেই হারাইয়া ফেল্লাম-----আমি কিছু পড়তে গেলেই অনে কবেশি ভিজুয়ালাইজ কৈরা ফেলি, দৃশ্য কল্প বানাইয়া ফেলি, কিন্তু লেখাটা আমারে মনে হৈলো নিজের মত কৈরাই পড়াইলো, লেখাটার যেনো একটা জীবন টাইপ ব্যাপার আছে, একলার।
লেখকের মন্তব্য
লেখার জীবন থাকুক বা নাই থাকুক, জীবন্ত বিড়ালকে ভালো লাগতেছে।
সুন্দর লেখাগুলোতে সুন্দর কোন কমেন্ট দিতে ইচ্ছা করে, সেটা পারা যায় না বলেও মাঝে মাঝে হুমাই, এবং নিজেই বিরক্ত হই ভালো লেখাতে হুমাইলে। এইখানে হুমানোর জন্য খুবই বিরক্ত হইছি নিজের উপর
লেখকের মন্তব্য
হুমাহুমি ব্যাপার না আপু। বিরক্ত হবেন না অনুগ্রহ কোরে।
মন্তব্য করুন