কুলদা রায়-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এমএমআর জালাল
কুলদা রায়
দাশুবাবু ছিলেন ময়মনসিংহের বিখ্যাত প্রতিমা শিল্পী। পুরো নাম ধীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ওরফে দাশুবাবু। নাটকঘর লেনে তিনি প্রতিমা গড়তেন। সে সময় একটি ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে দেখত দাশুবাবুর শিল্পীত হাত কি করে একটি মাটির দলাকে বানিয়ে ফেলছে মা দুর্গা। পাশে কার্তিক, পেটমোটা গণেশ। লক্ষ্মী ঠাকুরুণের প্যাঁচাটি হাসি হাসি মুখ করে আছে। আর সরস্বতীর বীণাটিতে তার বসালেই বেজে উঠবে—হা রে রে রে আমায় ছেড়ে দেরে দেরে।
ছেলেটির নাম রশিদ। বাড়ি ত্রিশাল। ভাই ডাকবিভাগে ডাক বাছাইয়ের চাকরী করত।ভাইয়ের কাছে থাকত ছেলেটি। অতি দরিদ্র।
রশিদ প্রতিমাঘরের পড়ে থাকা মাটি দিয়ে দেখে দেখে নাক গড়ত। কান গড়ত। একদিন ঠিক সাইজমত দুর্গা ঠাকুরুনের একটি হাত গড়ে ফেলল। দাশুবাবু দেখে অবাক। হাতটি ফিট করে দিলেন প্রতিমার গায়ে।একদম ঠিক। বুঝলেন ছেলেটির এলেম আছে।
দাশুবাবু মাঝে মাঝে জিরিয়ে নেন। আর তার হয়ে কাজ করে রশিদ। এইভাবে রশিদ হয়ে উঠল দাশুবাবুর হাতে গড়া সেরা প্রতিমাশিল্পী।
হিন্দুদের অনেক স্পর্শবাতিক আছে। কোন মুসলমান পূজার মন্দিরের ঢুকতে পারে না। কিন্তু রশিদের প্রতিমা এই ভেদ ঘুচিয়ে দিল। একজন মুসলমান ছেলে প্রতিমা গড়ছে—আর তা দিয়ে পূজা করছে হিন্দুরা। ধর্ম নষ্ট হচ্ছে বলে কেউ অভিযোগ করে নি। সেটা ষাট দশকের কথা।
মনসা, কালি, সরস্বতী, গণেশ, বিশ্বকর্মা—সারা বছর ধরে হিন্দুদের এই প্রতিমা নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রশিদ। দুর্গা পূজার সময় তার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিমার সঙ্গে তিনি পূজা মন্দিরের অঙ্গ সজ্জাও করে দিতেন। আর সঙ্গে গড়তেন পুরানের নানান মূর্তি।ময়মনসিংহ শহরে মহারাজা রোডে ছিল তাঁর প্রতিমা ঘর। হিন্দুদের প্রতিমা গড়াই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র পেশা।
কবি নির্মলেন্দু গুণের বাড়ি ছিল নেত্রকোণার বারহাট্টায়। সেখানে সরস্বতী পূজার প্রতিমা নিয়ে প্রতিযোগিতা হত। নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন—দুর্গামূর্তি বানিয়ে তিনি (রশিদ) খুব নাম করেছিলেন। হিন্দুরা তার মূর্তি তৈরি নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি—মুসলমানরাও কিছু বলে নি। তার সঙ্গে আলাপ করে আমার খুব ভাল লাগল। তিনি আমাকে একটি চমৎকার সরস্বতী বানিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন, যাতে প্রতিযোগিতায় আমরা জয়ী হতে পারি।
পূজার আগের দিন রাতের ট্রেনে আমরা যখন রশীদের সরস্বতী নিয়ে বারহাট্টা স্টেশনে নামলাম—হ্যাজাক লাইটের আলোতে বারহাট্টা স্টেশনের চেহারাটাই গেল পালটে। সবাই বলল এমন চমৎকার সরস্বতী পূর্বে কখনই দেখে নি। রশীদের নাম এবং দাম দুই বেড়ে গেল। এই চমৎকার মূর্তিটি একজন মুসলমানের তৈরি জেনে স্থানীয় মুসলমানদের আগ্রহও যুক্ত হল। হিন্দু-মুসলমান মিলে বহু লোক দূর থেকে আমাদের ঐ প্রতিমা দর্শন করতে এল। রশিদ ছিলেন জাতপাতের উর্ধে একজন শিল্পী।
শিল্পাচার্য জয়নুলের বাড়িও ছিল ময়মনসিংহ। তিনি রশিদের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাকে নিয়ে গেলেন ঢাকায়। তাকে আর্ট স্কুলে মডেলিং বিভাগে ভর্তি করে দেন। শিল্পাচার্যের সাহচর্যে তার শিল্পবোধেও এল পরিবর্তন। তিনি রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, মা ও শিশু, মিশুক নামে বেশ কিছু ভাষ্কর্য তৈরি করেন। কিন্তু ঢাকায় থেকে তার আয়ের কোনো সুরাহা না হওয়ায় ময়মনসিংহে ফিরে আসেন-- পুরনো প্রতিমা গড়ার কাজে আবার লেগে পড়েন।
ষাটের দশকে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ময়মনসিংহ শহরের বড় মসজিদ গড়ার জন্য মসজিদে চাঁদা ওঠানো হচ্ছিল। রশিদ নামাজ পড়ার পরে কিছু টাকা দিলেন। হিন্দুদের প্রতিমা গড়ার টাকা দিয়ে মসজিদ গড়া যাবে না বলে মৌলানা সাহেব সে টাকা নিতে অস্বীকার করলেন। তখন রশীদ বললেন—একজন ঘুষখোর চাকুরে যখন তার ঘুষের টাকা মসজিদে দিচ্ছেন বেহেশতে যাবার আশায়, তখনতো কেউ আপত্তি করছেন না। একজন অসৎ দোকানদার ভেজাল মিশিয়ে মানুষের সর্বনাশ করে যে লাভ করছে, সেই লাভের টাকা মসজিদে দিলে তো কেউ আপত্তি করছে না। কিন্তু যখন আমি আমার কষ্টের উপার্জনের টাকা মসজিদের জন্য দান করতে যাচ্ছি , তখন কেন এই আপত্তি? প্রতিমা তৈরি আমার পেশা। এই পেশা থেকে আমার উপার্জন—সৎ উপার্জন। আমার কঠিন শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সৎ উপার্জনের টাকা আমি আল্লাহর ঘরে দান করছি, আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন। মানুষ না গ্রহণ করবার কে? রশিদের এই একটি কথাতেই তাঁর টাকা নিতে সম্মত হয়েছিল মুসল্লিরা। এই ঘটনাটি লিখেছেন যতীন সরকার।
উন্নিশ একাত্তরের ১৭ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরে পাকহানাদার বাহিনীর বিমান আক্রমণ করে। সারা শহর ছেড়ে লোকজন পালিয়ে যায়। কিন্তু রশীদ যায় নি। তিনি একা মানুষ। বিয়ে করেন নি। ভাষ্কর্য গড়াই তাঁর নেশা আর পেশা।তাঁর তো শত্রু নেই। কিন্তু শত্রু তো ওৎ পেতেই ছিল।
শহরের মধুবাবুর গলির একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন রশিদ। ২৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী ময়মনসিংহ শহর দখল করে নেয়। তারপরই শুরু হয় বিহারীদের নির্বিচারে তাণ্ডব—লুটতরাজ আর হত্যাযজ্ঞ। জামাতের ইসলামী ছাত্র সংঘ, মুসলিম লীগের কিছু কর্মী আর মোনায়েম খানের পোষা গুণ্ডারা যোগ দেয় তাদের সঙ্গে।
প্রথমেই মহারাজা রোডে রশিদের প্রতিমা ঘরটির ধ্বংস করে দেয়। মধু বাবুর গলির সেই বাসা থেকে দালাল পাক হানাদার বাহিনী নিয়ে ধরে আনে রশিদকে।
পিঠমোড়া করে বেঁধে পিটিয়ে পিটিয়ে মহারাজা রোডে এনে ছেড়ে দেয় ওকে। ওরা বিহারী ছেলেমেয়েদের লেলিয়ে দেয়। ওরা ইট-পাথর ছুড়তে থাকে রশিদের শরীরে। তার মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে গা থেকে মাটিতে। রশীদ চলছে যীশুর শেষ যাত্রার মতো টলতে টলতে। স্টেশন রোডে এসে পড়ে যায়। আর ওঠার সামর্থ্য নেই। তখনো তাকে রেহাই দেওয়া হয় নি। বিহারীরা—জামাতী দালালরা তাকে মারতে মারতে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। তারপর হৃদপিণ্ড তাক করে গুলি করে। তখন রশীদের শরীরের কোনো আকার ছিল না। এরপর রশিদের এই প্রাণহীন মাংসপিণ্ডটি ছুড়ে ফেলা হয় ব্রহ্মপুত্রের জলে। তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ।
জামাত , মুসলিম লীগ, বিহারী আর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছে রশীদের অপরাধ ছিল—তিনি মূর্তি বানাতেন। সে মুর্তিকে হিন্দুরা প্রতিমাজ্ঞানে পূজা করত। আর তাতে ভাত কাপড় জুটত রশীদের। রশীদের কারণে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হত।
ভাষ্কর রশিদের দুটো শিল্পকর্ম মা ও শিশু এবং মিশুক ময়মনসিংহ যাদুঘরে এখনো পড়ে আছে।ময়মনসিংহ শহরের এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন হাই স্কুলের পিছনের সড়কটিকে একাত্তরের পর নামকরণ করা হয়েছিল শহীদ শিল্পী রশীদ সড়ক।
-----------------------------------------------------------------------------------------------
নোট : রশীদ বিষয়ে মূল তথ্য দিয়েছেন কৃষিবিদ এমএমআর জালাল। আর কৃষিবিদ ডঃ আতাউল করিমের একটি লেখা থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
মন্তব্য
,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
রশীদেরা কেন থাকে না? তাঁদের কেন যে চলে যেতে হয়? যেতেই হয়, আটকানো যায় না কোন ভাবেই আর?
চোখ ভেজানো কাহিনী। দক্ষ হাতে সুসজ্জিত বাগানে অজস্র ফুলের বাহারী সমাহারে মুগ্ধ হলাম।
রশীদকে শ্রদ্ধা জানাবার মত এত শ্রদ্ধা আমার এ শীর্ণ শরীরে নেই, যেটুকু আছে তার সবটা দিলাম উজাড় করে।
সর্বোচ্চ রেটিং, পোস্ট প্রিয়তে আর ব্লগারকে প্রিয় তালিকায় নিয়েও প্রাণ জুড়োয় না রে ভাই।
কুলদা আপনাকে ধন্যবাদ।
লেখকের মন্তব্য
আমাদের এরকম অনেক সত্যি আছে। আছে ভাগীরথী, তারান্নুম বিবি, রওশনআরাসহ অনেকে এদের খুঁজে দেখা দরকার। একাত্তরে মানুষের ইতিহাসটা কী ছিল সেটা জানা দরকার। ধন্যবাদ এই পোস্টটি পড়ার জন্য।
কিছু বলার নেই পড়ে শুধু আবেগাপ্লুত হয়েছি। সত্যি সর্বোচ্চ রেটিং দিয়েও প্রাণ জুড়ায় না।
মন্তব্য করুন