লেখকের ক‌থা

সদর দরজা

কারবালা বিবি

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

ওপারে সন্যাসী গ্রাম। এপারে কলারণ। মাঝখানে পানঘুচি নদী। ও নদীর কুল নাই কিনারা নাই—আছে দৈরার পানি। পানি দেখলে প্রাণ ছমছম করে। দেখে দেনাজ মাঝি হাসে। বৈঠা হালকা মেরে বলে, আপনের বাড়ি কনে?
–ফরিদপুর।
–হেইয়াতো মোগো আত্মীয় লাগে। ফরিদপুইরা লোকে মোগো দ্যাশে ধান কাডতি আইত। তাগো কাচিতে ধার পেরখর। আর?
–আর কি?
–আর শ্যাখ সাবের বাড়ি। শ্যাখ মুজিবর। পাকিস্তানীগো যম। মোগো নেতা। হ্যায় ফরিদপুরের লোক। আপনে হইলেন মোগো শেখ দাদা। ডর করেন ক্যান।

সন্যাসী গ্রাম মোড়োলগঞ্জে। আর কলারণ পিরোজপুরে। বরিশাল আর বাগেরহাট। মামাতো ভাই ফুফাতো ভাই। হ্যার তুলনা নাই।

শেখ সাহেবের বাড়ির লোক শেখদাদা পানঘুচিতে এসেছেন। তাকে ইজ্জত দেওন দরকার। এই হেতু দেনাজ মাঝি নাও বেয়ে মাঝগাঙ্গে নিয়ে যায়। সেখানে পদ্মাপাপড়ির মত নৌকার সারি। মাছ ধরা চলছে। মাছের নাম রামশোচ। কমলা বর্ণ। মুখে দাঁড়ি গোঁফ আছে। এদেশে দাঁড়ি গোঁফকে শোচ বলে। মাছগুলো তাজা। করিম মণ্ডল নৌকা থেকে এক খোলা মাছ তুলে তুলে দিয়েছে। বলেছে, তাজা মাছ ভাইজা খাইয়েন।

কলারণ থেকে বালিপাড়া। বালিপাড়া থেকে পত্তাশি। পথে পথে খাল। ভাঙা রাস্তা। কখনো মাটির। কখনো খোয়া তোলা। এরপর ইন্দুরকানি। শিয়রে চারাখালি নদী। এইটুকু আসতে এক দুপুর। আসতে গেলে এধারকা হাড় ওধারকে এলেস পেলেস নিশ্চিত। চারাখালি নদী পার হলে পাড়ের হাট, শঙ্করপাশা—নামাজপুর হয়ে পিরোজপুর শহর। একদিনের ধকল। এই মাছ নিতে নিতে মাঝে দফা রফাতে সাঙ্গ। দেনাজ মাঝি বলে, চিন্তা নাই। চলেন, সালাম জমাদ্দারের বাড়ি যাই। তিনি খেদমত জানেন।

বাড়ির দেষ্টে ছোটো খাটো চরভিটে। ছৈলাগাছের শ্বাসমূল হা হয়ে চর ফেলেছে। আর আছে বেতিবন। বাঁ-পাশ ঘুরে আচি খাল। খাল দিয়ে যেতে যেতে জমাদ্দারের বাড়ি।
বেতিবনে কে একজন মাঝে মাঝে মাথা তুলছে। আর মাথা নিচু করছে। দেনাজ হেকে বলে, সেলাম আলেকুম।
বেতিবনে তিনি শুনতে পান কি পান নাই বোঝা যায় না। বেতিবনে জোয়ারের পানি ঢুকছে। কুল কুল শব্দ ভাসছে। দেনাজ মাঝি বলে, ওনার নাম কারবালা বিবি।
–উনি কি করেন?
–উনি কথা কন না। গাঙ্গের দিকে চাইয়া থাকেন। আর কোনো কাম নাই।

সালাম জমাদ্দার বাড়ির কান্দিতে কলাপাতা কাটছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন। যত্ন করে জলচৌকি পেতে দিলেন। হাত পাখা দিলেন। তাতে গোলাপ ফুল খাড়া। এর হাওয়া শীতল শীতল। সালাম জমাদ্দার বললেন, আইসা যখন পড়ছেন– তখন আইজ আর নিস্তার নাই। কলাপাতায় রামছোচ মাছ ভাজা হইবে। খাইয়া যাইবেন।

তার আগে হুগলী ধানের মুড়ি এসেছে। রূপেশ্বর ধানের খই এসেছে। আমযতনের নারিকেল এসেছে। লগে নলেন গুড়। পাকা কাঁঠালী কলা। কালো গরু দুধ। আর গাছপাকা সফেদা। দুটো গন্ধ লেবু। সালাম জমাদ্দার বলেন, নাস্তা সারেন গো শেখ দাদা। শীলদিদিরে খবর দিছি। আইয়া পড়লেন বৈলা। তার হাতের রান্না—বোঝলেন শেখদাদা, তুলনা নাই। ফাস্টো কেলাস।

শেখ দাদা খাবে কি—চেয়ে চেয়ে দেখে জমাদ্দারের দোচালা টিনের ঘর। চৌদিকে বারান্দা। বারান্দার আবার বারান্দা। এই শেষ বারান্দার নাম ফইটা চাল। ঘরের সামনে উঠোন। উঠোনে কুড়হা পাখি কক কক করে। পুকুর হাঁস পাক পাক করে। একপাশের উঁচু বাঁশের আগায় বাঁধা জালালির খোপ। জালালি বাক বাকুম করে। চৌচালার মাথায় দুটো টিনের ময়ূর চক্ষু মেলে আছে। আর মাঝখানে একখানি বাঁকা চাঁদ করিতেছে খেলা। তাহাকে তোমরা কেহ করিও না হেলা।

জমাদ্দার হাসেন। হাসতে হাসতে বলেন, শেখ দাদা ঘাবড়াইয়েন না। এই চাঁদ আসমানের চান্দ না। হ্যার চাইয়াও প্রেখর। রাইত আহুক—কেরমে কেরমে পাইবেন টের। বিশ্বাস রাইখেন—কলারণের কেউ মিছা কথা কয় না। সদা সইত্য বলে। এই চান্দনি পশরে দুলদুল আইবে।
–দুল দুল কেডা?
–দুলদুল ঘোড়া। হযরত ইমাম হোসেনের ঘোড়া। ফোরাতকুলে করে বাস। অখন মাঝে মাঝে পানঘুচি গাঙ্গের পাড়ে আইয়া পড়ে। ঘাস খায়। এই ঘাসের তুল্য তাগদ—আর কোনো ঘাসে নাই।

বারান্দার ঘরে একখানি ছবি বাঁধানো আছে। ছবিখানি মলিন। বহু পুরাতন। কাপড়ের পরে রঙিন সুতোয়া বোনা। একটি ঘোড়ার চিত্র। ঘোড়া ছুটিতেছে। ঘোড়ার ল্যাঞ্জা তোলা। সারা গায়ে তীর বেঁধা। রক্ত ঝরছে। নিচে লেখা—

আসমান জমিন কাঁদে হায় হায় হায়।
কার খুনে খুন ঝরে—দুল দুল যায়।।

দুলদুলের চিত্রটি দেখিয়ে সালাম জমাদ্দার বলেন, আমার দাদীজান সাহারাবানু চিত্রটা খাড়ছিলেন। আমার বাপজান বাঁধাইয়া আনছেলেন। বড় পবিত্র চিত্র।
ছবিতে ধুলো পড়েছে। গামছা দিয়ে ডলে ডলে ধুলোসাফ করেন জমাদ্দার। চিত্রের নিচে লেখা আছে, আদর্শ চিত্র বাঁধাই। পো: নারায়ণ বসু। দড়াটানা খেয়াঘাট। বাগেরহাট। ১৯৪৭ সাল। জমাদ্দার বলেন–মেনাজ ফকিরের কাছে খবর গেছে। তিনি আইজ কারবালার পালা গাইবেন।
–মেনাজ ফকির কে?
–দেনাজ মাঝির বাপে। এককালের নৌকার মাঝি। অখন বুড়া হইছেন। জারি গাওয়া তার সখ। গ্রামের মানুষের গান গাওন ছাড়া আর কি সখ থাকতি পারে, কন।

দুলদুলের পাশে বিছানা পেতে সালাম জমাদ্দার বেরিয়ে গেছেন। তার মেলা কাজ। মেহমানদারির খাসির হদিস করতে হবে। বেড়ার গায়ে একখানি তক্তা বাঁধা। সেখানে কাপড়ে পেচানো দুটে বই। শেখ দাদা খুলে দেখলেন—পয়লা বই. পবিত্র কোরআন শরীফ। দুসরা. বিষাদ সিন্ধু। প্রণেতা : মীর মশাররফ হোসেন। মহানবী (সঃ) এর দৌহিত্রদ্বয় হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত হোসেন (রঃ) এর চরম বিয়োগান্তক পরিণতি নিয়ে মীর মশাররফ হোসেনের অমর উপন্যাস “বিষাদ সিন্ধু”।. একদিকে হাসান-হোসেন। অন্যদিকে এজিদ। এজিদ দামেস্কের নিষ্কণ্টক খলিফা হতে চায়। মহানবীর নাতিদ্বয় তার পথের কাঁটা। এই কাঁটা তুলতে এজিদ বড় ভাই হাসানকে বিষ খাইয়ে মেরেছে। ছোটো ভাই হোসেনকে প্রথমে মদিনা ছাড়া করেছে। পরে কুফা নগরীতে ডেকে পাঠিয়ে ফোরাত নদীর কুলে কারবালার মাঠে সীমারকে দিয়ে হাসানকে সীমারকে দিয়ে খুন করেছে। এই খুনের ঘটনা নিয়ে বইটির তিনটি পর্ব – “মহরম পর্ব, “উদ্ধার পর্ব”, ও “এজিদ বধ পর্ব” প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ ইং সালে।

মহরম পর্বঃ চতুর্বিংশ প্রবাহ /১
——————--------------
হোসেন সপরিবারে ষষ্টি সহস্র সৈন্য লইয়া নির্বিঘ্নে কুফায় যাইতেছেন। কিন্তু কতদিন যাইতেছেন, কুফার পথের কোন চিহ্নই দেখিতে পাইতেছেন না। একদিন হোসেনের অশ্বপদ মৃত্তিকায় দাবিয়া গেল। ঘোড়ার পায়ের খুর মৃত্তিকা মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাইতে লাগিল, কারণ কি? এইরূপ কেন হইল? কারণ অনুসন্ধান করিতে করিতে হঠাৎ প্রভু মোহাম্মদের ভবিষ্যৎ বাণী হোসেনের মনে পড়িল। নির্ভীক হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হইল, অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। হোসেন গণনা করিয়া দেখিলেন, আজ মহরম মাসের ৮ম তারিখ। তাহাতে আরো ভয়ে ভয়ে অশ্বে কশাঘাত করিয়া কিঞ্চিৎ অগ্রে গিয়া দেখিলেন যে, এক পার্শ্বে ঘোর অরণ্য, সম্মুখে বিস্তৃত প্রান্তর। চক্ষুনির্দিষ্ট সীমামধ্যে মানবপ্রকৃতি-জীবজন্তুর নামমাত্র নাই। আতপতাপ নিবারণোপযোগী কোনপ্রকার বৃক্ষও নাই, কেবলই প্রান্তর-মহাপ্রান্তর। প্রান্তর-সীমা যেন গগনের সহিত সংলগ্ন হইয়া ধূ-ধূ করিতেছে। চতুর্দিকে যেন প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বরে আক্ষেপ-হায়! হায়! শব্দ উত্থিত হইয়া নিদারুণ দুঃখ প্রকাশ করিতেছে। জনপ্রাণীর নামমাত্র নাই, কে কোথা হইতে শব্দ করিতেছে তাহাও জানিবার উপায় নাই। বোধ হইল যেন শূন্যপথে শতসহস্র মুখে, ‘হায়! হায়!’ শব্দে চতুর্দিক আকুল করিয়া তুলিয়াছে।

হোসেন সকরুণ স্বরে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিয়া সঙ্গিগণকে বলিতে লাগিলেন, “ভাই সকল! হাস্য পরিহাস দূর কর; সর্বশক্তিমান্ জগৎ-নিদান করুণাময় ঈশ্বরের নাম মনে কর। আমরা বড় ভয়ানক স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি। এই স্থানের নাম করিতে আমার হৃদয় কাঁপিয়া উঠিতেছে, প্রাণ ফাটিয়া যাইতেছে। ভাই রে! মাতামহ বলিয়া গিয়াছেন, ‘যে স্থানে তোমার অশ্বপদ মৃত্তিকায় দাবিয়া যাইবে, নিশ্চয় জানিয়ো, সেই তোমার জীবন বিনাশের নির্দিষ্ট স্থান এবং তাহারই নাম দাস্ত কারবালা।’ মাতামহের বাক্য অলঙ্ঘনীয়; পথ ভুলিয়া আমরা কারবালায় আসিয়াছি, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। তোমরা কি কর্ণে কিছু শুনিতে পাইতেছ? দৈব শব্দ শুনিতেছ?” তখন সকলেই মনোনিবেশ করিয়া শুনিতে লাগিলেন, চতুর্দিকেই, ‘হায়! হায়!!’ রব। ধন্য নূরনবী মোহাম্মদ! হোসেন বলিলেন, “মাতামহ ইহাও বলিয়া গিয়াছেন, চতুর্দিক হইতে যেস্থানে ‘হায়! হায়!!’ শব্দ উত্থিত হইবে নিশ্চয় জানিয়ো সেই কারবালা। ঈশ্বরের লীলা কাহারো বুঝিবার সাধ্য নাই। কোথায় যাইব? যাইবারই-বা সাধ্য কি? কোথায় দামেস্ক, কোথায় মদিনা, কোথায় কুফা, কোথায় কারবালা? আমি কারবালায় আসিয়াছি, আর উপায় কি? ভাই সকল! ঈশ্বরের নাম করিয়া গমনে ক্ষান্ত দাও।” ক্রমে সঙ্গীরা সকলেই আসিয়া একত্রিত হইল। হোসেনের মুখে কারবালার বৃত্তান্ত এবং চতুর্দিকে ‘হায়! হায়!!’ রব স্বকর্ণে শুনিয়া সকলেরই মুখে কালিমা-রেখা পড়িয়া গেল! যে যেখান হইতে শুনিল, সে সেই খানেই অমনি নীরবে বসিয়া পড়িল।

হোসেন বলিলেন, “ভ্রাতৃগণ! আর চিন্তা কি? ঈশ্বরের নিয়োজিত কার্যে ভাবনা কি? এই স্থানেই শিবির নির্মাণ করিয়া ঈশ্বরের উপর নির্ভর করিয়া, তাঁহারই নাম ভরসা করিয়া থাকিব। সম্মুখে প্রান্তর, পার্শ্বে ভয়ানক বিজন বন, কোথায় যাই? অদৃষ্টে যা লেখা আছে, তাহাই ঘটিবে; এক্ষণে চিন্তা বিফল। শিবির নির্মাণের আয়োজন কর। আমি জানি, ফোরাত নদী এই স্থানের নিকট প্রবাহিত হইয়াছে। কত দূর এবং কোন্ দিকে তাহার নির্ণয় করিয়া কেহ কেহ জল আহরণে প্রবৃত্ত হও। পিপাসায় অনেকেই কাতর হইয়াছেন, আহারাদি সংগ্রহ করিয়া আপাততঃ ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ কর।”

শিবির নির্মাণ করিবার কাষ্ঠস্তম্ভ সংগ্রহ করিতে এবং রন্ধনোপযোগী কাষ্ঠ আহরণ করিতে যাহারা বনমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল, শোণিতাক্ত কুঠার হস্তে অত্যন্ত বিষাদিত চিত্তে বাষ্পাকুললোচনে তাহারা হোসেনের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিতে লাগিল “হজরত! এমন অদ্ভুত ব্যাপার আমরা কোন স্থানেই দেখি নাই, কোন দিন কাহারো মুখে শুনিয়ো নাই। কী আশ্চর্য! এমন আশ্চর্য ঘটনা জগতে কোন স্থানে ঘটিয়াছে কি-না তাহাও সন্দেহ। আমরা বনে নানা প্রকার কাষ্ঠসংগ্রহ করিতে গিয়াছিলাম; যে বৃক্ষের যে স্থানে কুঠারঘাত করিলাম, সেই বৃক্ষেই অজস্র শোণিত চিহ্ন দেখিয়া ভয় হইল। ভয়ে ভয়ে ফিরিয়া আসিলাম। এই দেখুন! আমাদের সকলের কুঠারে সদ্যশোণিতচিহ্ন বিদ্যমান রহিয়াছে।”

হোসেন কুঠারসংযুক্ত শোণিত দর্শনে বলিতে লাগিলেন, “নিশ্চয়ই এ-ই কারবালা! তোমরা সকলে এই স্থানে ‘শহীদ’ স্বর্গসুখ ভোগ করিবে, তাহারই লক্ষণ ঈশ্বর এই শোণিত চিহ্নে দেখাইতেছেন। উহাতে আর আশ্চর্যান্বিত হইও না, ঐ বন হইতেই কাষ্ঠ সংগ্রহ করিয়া আনয়ন কর। দারু রস শোণিতে পরিণত দেখিয়া আর ভীত হইও না।”

দুটো হাঁস গুঁই সাপ দেখে ভীত হয়েছে। পুকুরের মধ্যে পাক পাক করে ডাকছে। শেখ দাদা বিষাদসিন্ধুর পাতা উল্টাতে উল্টাতে বেড়ায় টানানো সাহারাবানুর দুলদুলের চিত্রটি দেখছেন। এর মধ্যে শিলদিদি এসে পড়েছেন। পাকা চুল। পরনে থান কাপড়। গলায় আইচার মালা। সঙ্গে চুকাই শাকের পাতা। জমাদ্দারের বিবি হাড়ি কুড়ে বের করে দেন। বটি পেতে মাছ কুটতে বসেছে দুইজন। কান্দির পাড়ে খাসি জবেহ হচ্ছে। বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর। হে পরওয়ার দিগার, তুমি একে হালাল করে দাও। দুটো হাঁস পোলোর নিচে আটকে রাখা আছে। রামচন্দ্র মাস্টার কাটবেন। এইটা রামচন্দ্রের স্পেশাল। চুলায় শুকনো কাঠ চেপেছে। আগুন জ্বলে উঠছে।

দুটো ছেলে এসে উঠোনে তাপ্পমারা সামিয়ানা টানিয়ে দিয়েছে। এক কোনে লেখা—নবতারা সংঘ, কলারণ, সন ১৯৭১।. ছেলে দুটো নবতারা সংঘের ভলান্টিয়ার।

এর মধ্যে শেখ দাদা বিষাদ সিন্ধুর প্রবাহ চতুদর্শ প্রবাহ শেষ করে ফেলেছেন। লেখা আছে–

ইমামের বাক্যে সকলেই আনন্দোৎসাহে শিবির সংস্থাপনে যত্নবান্ হইলেন। সকলেই আপন আপন সংস্থানোপযোগী এবং ইমামের পরিজনবর্গের অবস্থান জন্য অতি নির্জন স্থানে শিবির স্থাপন করিয়া যথাসম্ভব বিশ্রাম করিতে লাগিলেন।

আরবদেশে দাসের অভাব নাই। যে সকল ক্রীতদাস হোসেনের সঙ্গে ছিল, তাহারা কয়েকজন একত্রিত হইয়া ফোরাতের অন্বেষণে বহির্গত হইয়াছিল; ম্লানমুখে ফিরিয়া আসিয়া সকাতরে ইমামের নিকট বলিতে লাগিল, “বাদশাহ নামদার! আমরা ফোরাত নদীর অন্বেষণে বহির্গত হইয়াছিলাম। পূর্ব-উত্তর প্রদক্ষিণ করিয়া শেষে পশ্চিমদিকে গিয়া দেখিতে পাইলাম যে, ফোরাত নদী কুলকুল রবে দক্ষিণবাহিনী হইয়া প্রবাহিত হইতেছে। জলের নির্মলতার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া জলপানেচ্ছা আরো চতুর্গুণরূপে বলবতী হইল, কিন্তু নদীতীরে অসংখ্য সৈন্য সশস্ত্রে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া অতি সতর্কতার সহিত নদীর জল রক্ষা করিতেছে। যতদূর দৃষ্টির ক্ষমতা হইল, দেখিলাম এমন কোন স্থানই নাই যে, নির্বিঘ্নে একবিন্দু জল লইয়া পিপাসা নিবৃত্তি করা যায়। আমরা সৈন্যদিগকে কিছু না বলিয়া যেমন নদীতীরে যাইতে অগ্রসর হইয়াছি, তাহারা অমনই অতি কর্কশ বাক্যে বিশেষ অপমানের সহিত আমাদিগকে বিতাড়িত করিয়া দিয়া বলিল, “মহারাজ এজিদের আজ্ঞায় ফোরাত নদীকূল রক্ষিত হইতেছে, এই রক্ষক বীরগণের একটি প্রাণ বাঁচিয়া থাকিতে এক বিন্দু জল কেহ লইতে পারিবে না। আমাদের মস্তকের শোণিত ভূতলে প্রবাহিত না হইলে ফোরাত প্রবাহে কাহাকেও হস্তক্ষেপ করিতে দিব না। জল লইয়া পিপাসা নিবৃত্তি করা তো অনেক দূরের কথা। এবারে ফোরাতকূল চক্ষে দেখিয়া ইহজীবন সার্থক করিয়া গেলে,-যাও; ভবিষ্যতে এদিকে আসিলে আমাদের দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত থাকিতে হইবে। নদীর তীরে এক পদও অগ্রসর হইতে দিব না। এই সুতীক্ষ্ণ শর তোমাদের পিপাসা শান্তি করিবে। প্রাণ বাঁচাইয়া ফিরিয়া যাও। নিশ্চয় জানিয়ো, ফোরাতের সুস্নিগ্ধ বারি তোমাদের কাহারো ভাগ্যে নাই।“

ছায়া ঘনানোর আগেই এ পাড়া থেকে ওপাড়া থেকে লোকজন এসে গেছে। মেহমান শেখ দাদার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বর মানিক মুন্সী পকেট থেকে এক বাক্স স্টার সিগারেট এগিয়ে ধরলেন। বললেন, গদিনশীন কদম পীর সাবকে খবর দেওন হইছে। তিনি আইতে পারবেন না। পত্তাশীর বড় মসজিদে এতেকাপে আছেন। ইশারায় দোয়া করছেন। তিনি জৌলুসে পীর। শুনে সবাই বলল, আমীন আমীন।

কলাপাতায় মাছ ভাজি হচ্ছে। ঘ্রাণ আসছে। টগবট করে ফুটছে মন্তেশ্বর চালের ভাত। উঠোনে কাশেম মোল্লা নামে একজন লম্বা চওড়া লোক তাসের খেলা দেখাচ্ছেন। লোকটি গৌরনদীর দি দি লক্ষণ দাসের সার্কাস পার্টির ঘোড়ার সহিস ছিলেন। তার গলায় দুটো মেডেল ঝোলানো। কাশেম মোল্লা কিছু যাদু বিদ্যাও জানেন। সময় পেলে রাক্ষস সেজে দেখাবেন। তারপর সহি কারবালা পালা হবে। গায়ক মেনাজ ফকির। দেনাজ মাঝির বাপ। মেনাজ ফকির খবর পেয়েছেন। রেডি হতে একটু সময় লাগছে। এর মধ্যে খাসির গোস্ত কড়াইতে ড্যাগে চড়ছে। মসলার খুশবু বের হচ্ছে। সফেদা তলায় একজন কুড়মুড় ভাজা বিক্রি করছে। আরেকজন মদন কটকটি কাটছে।

মেনাজ ফকিরের আসল বাড়ি শরণখোলা। ঘরজামাই হেতু কলারণের পূবের পাড়ায় ভিটা। লম্বা চওড়া মানুষটি। একটু শুকনো কিসিমের। মাথায় ঝাকড়া চুল নাই। কানে একটা দুল আছে। আসরে নেমেই তিনি মুসলমান ভাইগো সালাম এবং হিন্দু ভাইগো আদাব জানালেন। তার হাতে দোতরা টুংটাং করে ওঠে। পায়ে নূপুর। পালা কারবালা।

ফোরাতের কুলে নটি রাত কেটে গেছে। সকলে পানি তেষ্টায় কাতর। বিবি সাহারাবানু ইমাম হোসেনের কাছে দুধের শিশুকে নিয়ে এলেন। তার বুকের দুধও শুকিয়ে গেছে। ছেলেটি মরমর। বলছেন, প্রভু, আমরা মরি মরি, এই শিশুটিকে বাঁচান। আপনি ফোরাতের কুলে যান। পানি নিয়ে আসেন।
ফোরাত নদীর কুল এজিদে সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে। হোসেনকে পেলে বধ করবে। ছাড়াছাড়ি নেই।

ইমাম হোসেন তৃষ্ণার্ত দুধের শিশুকে নিয়ে প্রিয় ঘোড়া দুলদুলে চড়ে বসেছেন। দুলদুল হাওয়ার বেগে ফোরাতের কুলে এসে গেছে। তিনি দুলদুলের পিঠ থেকে নেমেছেন। সৈন্যদের মিনতি করে বলছেন, এই শিশুটিকে পানি দাও। একে বাঁচতে দাও।

সৈন্যদল হাহা করে হেসে উঠেছে। হাসতে হাসতে একটি তীর ছুড়ে মেরেছে। তীরটি হোসেনের কোলের মাসুম শিশুটির বুক ভেদ করে চলে গেছে। রক্ত ঝরে পড়ছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন এবং তাঁর পরিবারকে তাঁর মৃত্যুর ক্ষতি ও শোক কাটিয়ে ওঠার সামর্থ দান করুন। আমীন!!

মেনাজ ফকির গেয়ে উঠেছেন—
শিশুটির মুখে কোনো নাই আর বানী।
খুনে ভাইসা যাইতাছে ফোরাতেরও পানি।।
কহ কহ আসমান জমিন ও চান তারা।
কিবা দোষে মাসুম শিশু হৈল পরান হারা।।

আসর স্তব্ধ প্রায়। কারো কণ্ঠে বাক্য নাই। কারো চক্ষে জল। কেউ একজন কেঁদে উঠতে যাবে—তার আগে মেনাজ ফকির বলে ওঠেন, কেউ কাইন্দো না। কারবালা আমাগোও আছে।
–কারবালা কোথায়?
–আমাগো সামনে।

উঠোন ভর্তি মানুষ। চারিদিকে গাছ। উপরে আসমান। চাঁদ ওঠেনি। সন্ধ্যাতারা ফিক ফিক করে জ্বলছে। এর মধ্যে কারবালা বিবি এসে দাঁড়িয়েছেন। মৃত শিশুর শোকে কাতর হেতু কেউ তাকে খেয়াল করেনি। তার হাতে এক থাল রামশোচ মাছ ভাজা। চোক্ষু স্থির। শূন্য চরণ। সেদিকে তাকিয়ে মেনাজ ফকির গাইছেন—
কারবালা আছে জাইন্য আমাগেরি বুকে।
কারবালা বাঁইচা থাকে দুঃখে ধুকে ধুকে।।
হায় হায় হায়–
মোগো পরান পুইড়া যায়,
দুঃখ মোগো না ঘুচিলো কী করিগো উপায়।।

ধুয়া শেষ হতে না হতেই কারবালা বিবির হাত থেকে রামছোস মাছের থালটি ধপ করে নিচে পড়ে যায়। পড়ে ধুলোমাটিতে ঝনঝন করে কাঁপে। ভাজা মাছগুলো ফাল দিয়ে ওঠে। তারা ছোসগুলো ঘষটে ঘষটে উঠোন থেকে চলে যায়। কাশেম মোল্লা শুধু একবার ওঠে আর একবার বসে। তার পকেটের যাদুর কাঠিটি ঠক ঠক করে। মেনাজ ফকিরের দোতরার টুং টাং থেমে গেছে। গলা খাকরি দিয়ে বলেন, মাফ করবেন শেখ দাদা। আর গাইতে পারমু না।
এই ঘোষণা শুনে উঠোন ভরা লোক বাক্য ফিরে পায়। হায় হায় করে ওঠে। ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বর মানিক মুন্সী বলে ওঠেন, কোনোদিন কি আপনে কারবালা পালা শ্যাষ করবার পারবেন না মেনাজ চাচা?

মেনাজ মুন্সী কথা বলেন না। দোতরার তার কেটে গেছে। সেটা ঠিক করতে হবে। দপ দপ করে নবতারা সংঘের হ্যাজাক বাতি নিভে গেছে। কেউ বাতিটির দিকে এগিয়ে আসে না। মাথা নিচু করে সবাই বসে আছে। কারো মুখ দেখা যায় না। অন্ধকার। কারো পায়ের শব্দ পাওয়া যায়। তাকে দেখতে পাওয়া যায় না বলে চৌচালার টিনের ময়ূরগুলি ককক ককক করে ডেকে ওঠে। সেই বাঁকা চাঁদ জেগে ওঠে। একটা হালকা নীলাভ আলো বের করে। সে আলোয় কারবালা বিবির মুখ কুকড়ো মুকড়ো। পা ঘষটে ঘষটে তিনি উঠোন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। মাথার উপরে ঘোমটা নেই। চুল খোলা। নীল আলোর মধ্যে বাড়ির নিচে মিলিয়ে গেছে।

২.
আসর শেষ হতে হতে রাত হয়ে গেছে। লোকজন চলে গেছে। নবতারা সংঘের ছেলেরা গোছগাছ করছে। সালাম জমাদ্দার বললেন, শেখ দাদা, আপনেরে আর দেরী করামু না। জ্যোৎস্না উঠতেআছে।
–যাব কেমনে?
–দুলদুল আইবে।
–দুলদুল কে?
–কাশেম মোল্লার ঘোড়া। দি দি লক্ষণ দাস সার্কাসের ঘোড়া। স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত। পথঘাট চেনে। খালবিল পারাইতে পারে। আপনেরে ঠিক হাওয়ার বেগে পিরোজপুর পৌঁছায় দেবে।

কাশেম মোল্লা অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে পানঘুচির দিকে। ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বর মানিক মুন্সী শেখ দাদাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। বলছেন, আবার আইসেন। মেনাজ ফকির আবার গাইবেন কারবালা পালা। এ জনমে শেষ হয় না এই পালা। মেনাজ ফকির বুক টান করতে গিয়ে কুঁজো হয়ে পড়ে। পায়ে জুতো নেই। বুড়ো মানুষের মতো শেখ দাদার সঙ্গে হাঁটে । নবতারা সংঘের একটা ছেলে পিছনে পিছনে আসছে। হাতে একটা টিমটিমে হারিকেন। মেহমানকে সিধে একা ছাড়তে নেই। জমাদ্দারের বাড়ি পেরিয়ে আচি খাল। তারপর পানঘুচি– বেতিবন অব্দি হাটা পথ।

এক ফাঁকে ফস করে আলম বিড়ি ধরান মেনাজ ফকির। একটু ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটেন। লম্বা করে বিড়ির টান মারেন। বলেন, শেখ দাদার জন্ম কবে?
–একাত্তর সাল।
–একাত্তর সাল? তাইলে তো আপনে কচি মানুষ। মোর বয়স তখন বড়জোর বাইশ তেইশ।

আবার বিড়ি টানেন মেনাজ ফকির। দোতরার ছেড়া তার ঠিক করা হয়েছে। একটু ঢিলা করে দেন। খুক খুক করে কাশেন। কাশতে কাশতে বলেন, আপনের বাপজানে তখন যোয়ান মানুষ। এইসব ঘটনা তিনি জানবেন। বলে—লম্বা করে ধোয়া ছাড়েন। দুটো ব্যাঙ গ্যাঙ গ্যাঙ করে ডাকে।

আমি মুহাম্মদ মেনাজ ফকির। বাপের নাম মুহাম্মদ আব্দুল আলী খয়রাতি। নিবাস শরণখোলা। তখনো পুরা ফকির হইতে পারি নাই। তাজা মাঝি। গাঙ্গে গাঙ্গে নাও চালাই। আর ফাঁকে মাছ ধরি। সখে সখে গান গাই। ডরপুক নাই।

তখন বর্ষাকাল। পূব পাড়ে জুজখোলা। পশ্চিমপাড়ে আন্ধারমানিক। মাঝখানে বলেশ্বর গাঙ। এই গাঙ পার হলে আচি খাল। সে খাল দিয়ে ঢুকলে পালপাড়া। তারপর সাহাপাড়া। বামে ঋষিপাড়া। ডানে নমো পাড়া। হ্যার মাঝে দোলখোলার মাঠ। মাঠের পরে সুনীল সাধুর বাড়ি। বিখ্যাত গায়েন। বিখ্যাত বায়েন। তার দোতরার তুলনা নাই।

বলে থেমে গেছেন মেনাজ ফকির। গলায় শ্লেষা জমেছে। থুক করে একদলা থু থু ফেলেন। মাথার উপরে ধ্রুব তারা থির হয়ে আছে। নড়ন চড়ন নট।
তিনি আসমান পানে তাকান। ঝি ঝি পোকা ডাকে। দুএকটা শিয়াল দূরে দুরে হাঁকে। আচি খালে তারা তিনজন এসে পড়েছে। খালপাড়ে গাছপালা। আর শেকড়বাকড়। ফাঁকে ফাকে সরু পথ। মেনাজ ফকির বলেন, দেইখা হাঁইটেন। শহুরে মানুষ আপনে, হোঁচট খাইয়েন না।

আন্ধারমানিক যেতে যেতে বেলা পড়ে এলো। সূর্য নামে পাটে। গাঙ্গ ফাঁকা। কেউ নাই। গা ছম ছম করে। আমি মেনাজ ফকির, সত্য কইতেআছি– বলেশ্বর গাঙ্গ থেকে আঁচি খাল দিয়া ঢুকতে যামু, চাইয়া দেহি আচি খালের পানি লাল। পাড়ে আন্ধারমানিক আছেলে। এখন নাই। মাঝে মাঝে পোড়া গাছ। ঘর নাই। দোর নাই। আন্ধারমানিকের ছাই গাদা। পথে পথে মরা গরু। মরা কুকুর। আবার ঘড় ঘড় করে কাশি আসে। কাশতে কাশতে মেনাজ ফকির বলেন, বোঝলেন শেখ দাদা, মানুষ নাই। লাশ। পুরা কারবালা।

আর দাঁড়াতে পারেন না ফকির। হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছেন। বসে হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক ওদিক মাথা নাড়েন। খানিকটা জিড়িয়ে নেন। বলেন, বুড়া হইছি। যোয়ানকালের মতো তাগদ নাই। ম্যাদা মাইরা গেছি।

তখন যোয়ানকাল। ডরপুক নাই। গ্রামের মইদ্যে ছুইটা বেড়াই। চিক্কুর পাইড়া কই, সাধু বাবা, সাধু বাবু। আপনে কোয়ানে?

সাড়া শব্দ নাই। সন্ধ্যা নামছে। ভুতও নামছে।

তখন, বোঝলেন শেখদাদা, তখন সুনীল সাধুর বাড়ির পিছনে খস খস শব্দ ওঠে। কান খাড়া হয়ে শুনতি পাই, শিশুর গলা। আজিব কারবার। মরনের মইদ্যে শিশু হাসে।

শিশুই বটে। হোগলার ঝোঁপে শিশু। মায়ের কোলে টলটলে মাসুম শিশু। আর বাপটা কচুড়িপানায় ঢাকা। কচুড়ি পানার আড়াল থেইকাই কয়, মোরা নির্দুষী। আমাগো মাইরেন না।

মা-টার কপাল কাটা। রক্ত জমাট হয়ে কালা হয়ে আছে। আর শিশুটি হাত বাড়িয়ে ছুটে আসতে চায়। আমি মেনাজ ফকির। সাং শরণখোলা। বাড়ির কাছে বাদাবন। উপরে আল্লা। আর বনবিবির কিরা। শিশুটির মায়ের মুখ সাদা। থরথর করার শক্তিও নাই। দেখে পরাণ উইড়া যায়। কই—দেরী কইরেন না। উইঠা আসেন।

তখন রাত্রি নামছে। ঘোর অন্ধকার। নৌকা আচি খাল থেইকা বলেশ্বর গাঙ্গে পড়ছে। বাপো মায়ে জড়াজড়ি কইরা নৌকার পাটাতনে বইসা আছে। পোলা নিদ্রা যায়। জিগাই, বাড়ি কনে?
–ফরিদপুর। টুঙ্গিপাড়া।
–শ্যাখ মুজিবের টুঙ্গিপাড়া?

লোকটা কথা কয় না। চুপ করে থাকে। বিবিটা নেতিয়ে আছে। ছপ ছপ করে বৈঠা চলছে। আর কোনো শব্দ নাই। ভাটা গোন লেগেছে। পানি নামছে।
এর মধ্যে মিহি সুরে কান্নার আওয়াজ আসে। জলের শব্দে হারিয়ে যায়। কান না পাতলে শোনা যায়। নিজের সঙ্গে কথা বলছে। নেতিয়ে পড়ে বিবিটা ফুলে ফুলে কাঁদছে। কইছে, শ্বশুরবাড়ি থিকা পালাইছি। বাপেরবাড়ি থিকাও পালাইছি। অখন যাই কনে? পোলাডারে বাঁচাই ক্যামনে।
বাপের কোলে পোলা ঘুমায়। মিয়া বিবিটার পিঠে হাত রাখে। বলে, চুউপ। চুউপ।
–মোরা কী খেতি করছি? কাউরি মারিও নাই। ধরিও নাই। মেলিটারি আমাগো মারতি লাগিছে। মারণ ছাড়া কি আর কিছু নাই?
–চুউপ। চুউপ।

আমি মেনাজ ফকির। আমার বাপে ফকির আছেলে। তিনি মিছা বোল জেবনে কয়েন নাই। শিশুকোলে জননী কান্দিতেছে। আর বাপে ডরে গাছপাথর। কইছি, কাইন্দেন না মাজান। আপনেগো আর পলান লাগবে না। আমার লগে চলেন। আপনেগো লইয়া যাইতেআছি কলারণ।
–সেইখানে পাকিস্তানী মেলিটারি নাই?
–নাই। সেখানে মীর কদম পীর সাহেব আছেন। তিনি বড় জৌলুসী পীর। হ্যারে মেলিটারি তো মেলিটারি, হ্যার বাপে—আইয়ুব খানেও ইজ্জত করছে। হ্যার পোলায় ইয়াহিয়া খানে‌ও ইজ্জত করে। আসমানি বেপার। কলারণ গ্রামে ডর নাই। গরু ছাগলও নিরাপদ।
–তাইলে আমরা বাচুম?
–বাঁচবেন। আলবৎ বাঁচবেন। পীরে হাক্কানিয়ার ডেরায় কেউ মরে না।

এই সময় ফুটকি ফুটকি জোনাক জ্বলে পাড়ে পাড়ে। বর্ষাকাল। বৃষ্টি নাই। মিয়া বিবি সারাদিন হোগলা বনে পালিয়ে বেঁচেছে। এখন নিরাপদ ভেবে নিন্দ যায়। আর মাসুম পোলা চুক চুক করে দুধ খায়। খিল খিল করে হাসে। এ হাসি হিন্দু কি মুসলিম—মুসলিম কি হিন্দু কেডা ধরে।
পানঘুচি গাঙ্গে নৌকা আসতে আসতে রাত্রি ঢলে পড়ে। এর মধ্য ভট ভট করে শব্দ শোনা যায়। মিয়া বিবি জেগে ওঠে। আতঙ্কে বলে ওঠে—কিসের শব্দ? মেলিটারির লঞ্চ আসতেছে নাকি?

আমি মেনাজ ফকির। জেবনে মিছে কথা কওয়ার নিয়ত নাই। তাগো কই, মেলিটারির লঞ্চ পাইলেন কই। ওডা ধানকলের শব্দ।
মিয়া বলে, তাইলে বাঁচুম?
–বাঁচবেন। চিন্তা নাই।

এর মধ্যে কলারণের ঠোঁটা দেখা যায়। ওপারে সন্যাসী গ্রাম। এপারে কলারণ। মীর কদম পীরের মঞ্জিল। এখানে মানুষতো মানুষ—পশুপক্ষীও নিরাপদ। এর মধ্যে ভট ভট শব্দ বাড়ে। আর হঠাৎ করে একটা সার্চ লাইট নদীর এপাড় ওপাড় আর নদীর গায়ে ঘুরতে দেখা যায়।
মিয়া বলে, অইতো লঞ্চ। ধানকল না। মেলিটারি আইতেছে।
–আপনি ঘাবডাইড়েন না। বৈঠা ধরেন। ঝপাঝপ কইরা বাইয়া লঞ্চ আসনের আগেই আচি খালে ঢুইক্যা পড়ি।

তখনো শুকতারা ওঠে নাই। অন্ধকার নদীর গায়ে পাক খাচ্ছে। মিয়া সাব বিবিটাকে ঠেলে ওঠায়। তার দিকে ঘুমন্ত পোলাটাকে এগিয়ে দেয়।

খলখল পানঘুচি কোলে হাসে খোকা।
ধরো বউ পোলা ধরো না হইও গো বোকা।।
হাত মেইলা ধরতি গেছে পূর্ণিমারো চান।
ঠাস কইরা শব্দ হইছে স্রোতে মারে টান।।

নবতারা সংঘের ছেলেটা থমকে গেছে। তার হাতে ছোটো একটা ব্যাগ। ব্যাগে কিছু পাকা পাকা সফেদা। ব্যাগটি তার থেকে ফসকে পড়ে। পায়ের তলায় পড়ে সফেদা ফল ভেচকে গেছে। ছেলেটা মোনাজ ফকিরকে বলে, কী অইছে মেনাজ দাদা? গুলি হইছে?
মেনাজ ফকির হেসে ওঠে। দোতরায় টুং টাং শব্দ ওঠে। নদীর পানে তাকিয়ে বলেন, গুলি হইবে ক্যান? মেলিটারিরা পীর কদমের গ্রামে গুলি করে না।
–তাইলে কিসের শব্দ?
–পানির শব্দ। আমি মেনাজ ফকির। আগে কলারণের ঘরজামাই আছিলাম—অখন স্থায়ী বাসিন্দা। আমি নিশ্চিত কইরা কইতেআছি—
বাপো কান্দো মায়ে কান্দে কান্দে বৃক্ষলতা।
সে কান্দনে আসমান ফাইটা ম্যাঘ ফাতা ফাতা।।

–আর কি?
–আর আবার কিগো শেখ দাদা। হ্যার পরে আরও দুইটা শব্দ শোনা যায়। নৌকা টলে ওঠে। লঞ্চের সার্চ লাইট ঘুরে ঘুরে চলে যায়। দূরে ভট ভট শব্দ মিলিয়ে যায়। কলারণ গ্রামে একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার মেলিটারি আহে নাই। একটা গুলিও হ্যারা ছোড়ে নাই। হ্যারা গুলি দিয়ে কোনো মানুষও মারে নাই। কারবালা হয় নাই।

৩.
আচি খাল ছেড়ে শেখ দাদা, মেনাজ ফকির আর নবতারা সংঘের ছেলেটি পানঘুচি নদীর পাড়ে আসে। এইটুকু পথ আসতে আসতে তাদের পা মাঝে মাঝে বালিরর মধ্যে দেবে যায়। আর শোনা যায়, বাতাসে হাহাকার—হায় হায় হায়।
সেখানে দি দি লক্ষণ দাস সার্কাসের পূর্বতন ঘোড়ার সহিস কাশেম মোল্লা পনঘুচির জল থেকে উঠে আসেন। বলেন, আইসেন শেখ দাদা, ঘোড়া রেডি।
–ঘোড়া কই?
–আছে। ঘোড়া আছে। কলারণের মানুষ মিছা কয় না। বলে দুটো হাততালি দেন কাশেম মোল্লা। আর তখন ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি শোনা যায়। বেতবনের ভেতর থেকে সাদা রঙের ঘোড়া বেরিয়ে আসে। তার পেছনে বেতবন। বেতবনে কারবালা বিবি। কপালে পুরনো কাটা দাগ। মাথার ওপরে চৌচালার টিনের বাকা চাঁদ। আলো দিচ্ছে। আলোতে দেখা যায়—ঘোড়ার গায়ে তীর বেঁধা। রক্ত লাল।

কাশেম মোল্লা বলে, এইডার নাম দুল দুল ঘোড়া। আপনেরে হাওয়ার বেগে বাড়ি পৌঁছায় দেবে। চিন্তা নাই। বলেন , সোভানাল্লা।
মেনাজ ফকির দোতারা নাড়ে। বিড়বিড় করে বলে, খুদা হাফিজ। খুদা হাফিজ।

*----------------------------কৃতজ্ঞতা স্বীকার
বিষাদ সিন্ধুর গল্প দিয়েছেন : ডাঃ মনোরমা বিশ্বাস।
শর্মিলা বসুর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে যারা কলম ধরেছেন।
প্রফেসর রত্নেশ্বর কর্মকার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

0
আপনার মূল্যায়ন: আপনি মূল্যায়ন করেন নি।
শেয়ার করুন » Facebook Twitter Delicious Digg MySpace Google Orkut Blogger Google Buzz Technorati
অথবা এই সংক্ষিপ্ত লিংক শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৬৩১১৬(১)    

হায়, হায়! এই পোস্ট দেখা যায় ৪৬ বার পঠিত হয়েছে, অথচ কেউ কোন মন্তব্য করে নি। তা কী করে হয়? এই পঠিত কী ধরণের পঠিত? পড়লে কোন কথা না বলে কেউ এখান থেকে যেতে পারে?
এটা তো নেহাত একটা গল্প নয়। এ যে ইতিহাস! এ যে আমাদের মাটির কথা, আমাদের মনের কথা!!
কুলদা, ভাই, এত সুন্দর একটা গল্পে কেউ কোন মন্তব্য করে নি এ জন্য আপনার দুঃখ পাবার কিছু নেই। আমার মনে হয় কী জানেন? পোস্টের আকার বড় হওয়ায় সবাই এটাকে এড়িয়ে গেছে, পড়ে যে আনন্দ, পড়ে কী যে স্বাদ পাওয়া যাবে তা কেউ চিন্তা করে দেখার প্রয়োজন মনে করে নি।
আরো লিখতে থাকুন এমন, আমরা কেউ যদি নাও পড়ি, আপনার এ সব লেখা অমর হয়ে থাকবে।
ভালো থাকুন।

 

মন্তব্য করুন

এই তথ্যটি সর্বদাই গোপন রাখা হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ছবি যাচাই
আপাতত: শুধু মানুষদের জন্যই আমাদের দুয়ার খোলা। পরে নাহয় রবোট, বায়োবট বা এন্ড্রয়েডদের কথা বিবেচনা করা যাবে।
13 + 1 =
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করুন এবং সঠিক উত্তরটি উপরের ঘরে লিখুন। যেমনঃ ১+৩ এর জন্য লিখুন ৪।