লেখকের ক‌থা

সদর দরজা

গোলাপ সুন্দরী

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

গোলাপের জন্য অনেক মায়া। কিন্তু গোলাপ সহজে ফোটে না।
মন্দিরের পাশে তুলসীতলা। তার পাশে গাঁদা ফুল গাছ। ফুল ফোটে শীতে-বসন্তে। সেই ফুল ঠাকুরের পায়ে দিয়ে মা বলে, সবার ভাল করো।

স্কুলের পেছনেই একা একটি বাড়ি। ছোট্ট টিনের ঘর। পুরনো। নিকোনো উঠোন। উঠোনের পাশটিতে টগর, হাসনু হেনার ঝাড়। একটি কাঠালি চাঁপা। সবাই বলে চাম্পা ফুল। বর্ষায় কদম ফুটে ওঠে। আর অশোক গাছটিতে মাঝে মাঝে তক্ষক ডেকে ওঠে। তিনটি ছাতিম গাছে ফুল ফুটলে বাতাস আকুল হয়ে যায়। দাদু বলেন, ইহা ছাতিম নহে- সপ্তপর্ণী। একটি বোটায় সাতটি পাতা।

এই বাড়িটির নাম ফুলবাড়ি। এ বাড়ির গোলাপ গাছটিতে পাঁচ রঙের গোলাপ ফোটে। এ বাড়ির যে মেয়েটি ডুরে শাড়ি পড়ে, সে গাছে জল দিতে দিতে বলে, আমার বাবা যাদু জানে।

বাজারে ওর বাবার আলু-পটলের দোকান। যায় ভোরে। ফেরে সন্ধ্যায়।

এই মেয়েটি একদিন আমাকে একটি গোলাপ চারা দিল। তুলসী গাছের পাশে খুব গোপনে লাগালাম। এই গাছের জন্য কিছু যাদু দরকার। কোথায় পাব সে যাদু?
মেয়েটি বলল, ভালবাসা থেকে।

এরপর মেয়েটিকে আর কখনো দেখিনি। শুধু দেখেছি- ফুলবাড়ির উঠোনে ঘাস গজাচ্ছে।মাধুরীলতা ঘরের চাল বেয়ে নিচে নেমেছে। জানালা অবধি পারুল লতা। আর ওর বাবা সারাক্ষণ উঠোনে ছাতিম গাছের তলায় বসে থাকে। বিড়বিড় করে। একদিন লোকটি হয়ে ঊঠল রবীন্দ্রনাথ। শুধু আল্লাখাল্লা নেই। কোমরে গামছা বাঁধা। আর হাসনু হেনার তলায় দুটো সাপ থান গাড়ল। রাতারাতি বাড়িটার নাম পাল্টে গেল- জঙ্গলবাড়ি।

মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে পেরিয়ে যায়। অন্ধকারে মডেল স্কুলের পেছনের জামরুল গাছটিকে অচেনা লাগে। গা ছম ছম করে। মা বলে, ভয় পাবি না। মনে মনে বলবি- তুলসী, তুলসী, তুলসী।

একদিন ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। বৃষ্টি নামছে টিপ টিপ করে। চুল বেয়ে জল নামছে চোখে মুখে। জামরুল গাছের পাতা নড়ছে।
ঠিক এ সময় শুনলাম কে যেন ডাকছে, গোলাপ! গোলাপ!

মাত্র দুই কি তিনবার। কেঁপে কেঁপে। থেমে থেমে। স্নেহ ভরে। ভয়ে ভয়ে।

একবার জোরে বজ্রপাত হল। বিদ্যুৎ চমকাল। একটি ছায়ামুর্তি দ্রুত সরে গেল বৃষ্টি আর অন্ধকারের গভীরে। আঁতকে বলে উঠলাম, মা, মা। মা মনের ভিতর মা বলে দিল, তুলসী। তুলসী। তুলসী।

একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। বাবার সঙ্গে কে একজন লোক কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলছেন। বলছেন, এখন কী করি, শঙ্কর। এখন কী করি।
মনে হল এ গলা একজন বিপন্ন বাবার। একজন ভেঙে পড়া মানুষের। বৃষ্টির মত ভেজা স্বর। অথবা এই এই স্বরে পৃথিবীতে শেষ বৃষ্টিপাত হয়ে যাচ্ছে। তারই শব্দ মর্মরিত হয়ে হাহাকার করে উঠছে।

এর পরদিন মডেল স্কুলের পুকুর পাড়ে অনেক মানুষের ভিড় জমে গেল। কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো নতুন ফুলে সেজেছে। বাতাসে নড়ছে চিরল চিরল পাতা। জলে পড়েছে সবুজ ছায়া। সে ছায়ার মধ্যে একজন মানুষ ঝুলে আছে। শুন্যে দুটি পা। মাথা নিচু। এবং পরাজিত।

আর পুকুর পাড় থেকে একটু দূরে সেই ফুলবাড়িটা অথবা জঙ্গলবাড়িতে দুদল মানুষ হৈ চৈ করছে। একদল ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। সোনা দানা খুঁজছে। বলছে, এটা আমাদের বংশের ছেলে সোলেমানের বউয়ের বাড়ি।

আরেকদর মানুষ গোলাপ গাছটার গোড়ায় দিয়েছে কুড়ালের কোঁপ। এইখানে মন্দির গড়বে। এটা তাদের বংশের লোকের বাড়ি। কে যেন গঙ্গাজল ছিটিয়ে পবিত্র করছে বাড়িটার ভূমি।

এই জঙ্গলবাড়িটা একদা ছিল ফুলবাড়ি। হাসনুহেনা ফুটলে গন্ধে আকুল হত বাতাস। চাম্পা ফুল ফুটলে পরী নেমে পড়ত।

বেলা গড়িয়ে গেলেও কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। লোকগুলো নেই। পুকুরের ছায়ার ভিতরে শূন্য মানুষটি কেবল পশ্চিম থেকে পূবমুখী হয়েছে। এই জল ছায়াটি মুছে ফেলার কেউ নেই। যারা এসেছিল, তারা একটি মানুষের ভিতরের গোপন মানুষটিকে দেখে ফিরে গেছে নিজস্ব ঘরে।
সেদিন সন্ধ্যার গভীরে আবার বৃষ্টি নেমেছে। বাতাস হালকা- শীতল। জামরুল গাছের নিচে এসে বললাম, গোলাপ! গোলাপ!
ঠিক সামনেই একটি পোড়ো বাড়ি। জঙ্গলে ঢেকে আছে। বিদ্যুৎ চমকানোর মধ্যে দিয়ে একটি ছায়া এসে দাঁড়াল। ফ্যাকাসে মুখ। শরীরটা খুব শীর্ণ। শিউরে শিউরে উঠছে। বলল, বাবা, ভাত এনেছ? তিন দিন আসোনি। আমার খাওয়া হয়নি।

এই গলাটি কাঁপা কাঁপা। রিনরিনে। গোলাপের পাপড়ির মত মৃদু। যাদুকরি। এবং
মৃতপ্রায়।

7
আপনার মূল্যায়ন: আপনি মূল্যায়ন করেন নি। গড় রেটিং: 7 (৩ জন মূল্যায়ন করেছেন)
শেয়ার করুন » Facebook Twitter Delicious Digg MySpace Google Orkut Blogger Google Buzz Technorati
অথবা এই সংক্ষিপ্ত লিংক শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২২৯৯১২(১)    

পড়ে ভাল লাগলো কুলদা রায় :)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২২৯৯১৪(২)    

এই গলাটি কাঁপা কাঁপা। রিনরিনে। গোলাপের পাপড়ির মত মৃদু। যাদুকরি। এবং
মৃতপ্রায়।

ভালো লিখেছেন । অভিনন্দন ।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২২৯৯১৫(৩)    

এই গলাটি কাঁপা কাঁপা। রিনরিনে। গোলাপের পাপড়ির মত মৃদু। যাদুকরি। এবং
মৃতপ্রায়।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২২৯৯৯৩(৪)    

ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২৩০০০৪(৫)    

এই গলাটি কাঁপা কাঁপা। রিনরিনে। গোলাপের পাপড়ির মত মৃদু। যাদুকরি। এবং
মৃতপ্রায়।
:( :( :(

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২৩০০২৯(৬)    

আপনার লেখাগুলো সব সময়ই ভালো লাগে
যদিও তেমন গুছিয়ে বলতে পারিনা বলে অনেক সময়ই বলা হয়না কিছু

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২৩০২৬৭(৭)    

জলরঙএর সঙ্গে একমত।
তোমার লেখাগুলো এমন ভাবে ভালোলাগায় আচ্ছন্ন করে আমায় যে মন্তব্যের ভাষা ভুলে যাই!

ভালো থেকো খোকন!

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২৩০৯৯২(৮)    

আপনার লেখা ভালো লাগে। শুভরাত্রি।

 

মন্তব্য করুন

এই তথ্যটি সর্বদাই গোপন রাখা হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ছবি যাচাই
আপাতত: শুধু মানুষদের জন্যই আমাদের দুয়ার খোলা। পরে নাহয় রবোট, বায়োবট বা এন্ড্রয়েডদের কথা বিবেচনা করা যাবে।
3 + 14 =
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করুন এবং সঠিক উত্তরটি উপরের ঘরে লিখুন। যেমনঃ ১+৩ এর জন্য লিখুন ৪।