কুলদা রায়-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আমার পুরো শিক্ষাজীবনটাই ছিল মস্ত একটা অপব্যয়। আমি কিছুই শিখিনি। শুধু পণ্ডিত স্যার ছিলেন--কিছু শব্দের মানে শেখাতেন। এটা কাজে লেগেছে। কলেজে প্রাণীবিদ্যার এক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়িনি বলে প্রাকটিক্যালে সর্বনিম্ন নম্বর দিয়েছিলেন। ইউনিতে আব্দুল হক স্যার বলেছিলেন তুমি কোগাইড আব্দুল হালিমকে নিয়েছ, সুতরাং তুমি পাশ নম্বর কিভাবে পাও দেখে নিচ্ছি।
আমি শিখেছিলাম স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণা করতে করতে। সারাদিন পড়ে থাকতাম ট্রায়ালে, ল্যাবে আর লাইব্রেরীতে। শিখেছিলাম সুবোধ সরকার স্যারের কাছ থেকে। তিনিই আমার সত্যিকারের শিক্ষক।
আবম নূরুল আনোয়ার স্যারের কাছ থেকে শিখেছিলাম কিভাবে গান শুনতে হয়। মাঝে মাঝে জ্যোৎস্না উঠলে তিনি ময়মনসিংহ শহর থেকে চলে আসতেন। আমার জানালার নিচ থেকে ডাক দিতেন, খুকন। আমি জানতাম তিনি আসবেন। এসে দেখি ব্রহ্মপুত্রে নৌকা রেডি। মাঝির নাম ঈশ্বরচন্দ্র মল্ল। ঘোর লাগা রাতে বসে আছেন আনিসুজ্জামান বাবুল, জিয়াউর রহমান সেলিম, টিপু ভাই। ঈশ্বরের নৌকা চলছে নদীর মধ্যে। খোকা ভাই একটু একটু করে হাওয়ায় সুর খেলছেন-- আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে । একটা লাইন গাইছেন খোকা ভাই--আর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারবার সেই লাইনটি নূরুল আনোয়ার স্যার শোনাচ্ছেন নতুন করে নতুন ভাবে। শুনতে শুনতে আমরা তারি ছায়াতলে চেয়ে থাকতাম।
আমাদের পাড়ার মন্টু স্যার বলেছিলেন প্রাইভেট না পড়লে অংক বুঝবা না। তার কাছেই অংক শিখতে গিয়েছিলাম। তিনি দুমাসের অগ্রিম পেলে শেখাবেন না। আমার আর অংক শেখা হয়নি। টাকা ছিল না। কর্মকার স্যারের কারণে আমি ভয়েই অংক পরীক্ষা দেইনি। পরে রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে অংক শিখে শিখে পাশ করেছিলাম। সেই অংকের ভুত এখনও মাঝে দুঃস্বপ্নে হানা দেয়।
আর মোদক স্যারের কাছে পরিসংখ্যান বিষয়ে পাশ নম্বর নেওয়ার জন্য বড় ভাইদের পরামর্শে রোগী সেজে যেতে হয়েছে। ২০০ টাকা ভিজিট দিয়েছিলাম। হলে ফিরতে ফিরতে অষুধের বোতলটি লেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। সে সময় এই দুশো টাকার জন্য পাশ করেছিলাম। কিন্তু আমাকে একমাস মাছ মাংশ খাওয়া বাদ দিতে হয়েছিল পয়সার অভাবে।
এর মধ্যে মুহসী স্যার জানতেন আর কেউ না এলেও ক্লাশে আমি আসব। তখন টিএসসির পাশ দিয়ে কুয়াশা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে। তারে দুএকটা কালো কাক লেজ ঝাড়তে শুরু করেছে। আমি চোখ মুছতে মুছতে শুনছি--মুহসী স্যারের ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে। তিনি পড়াচ্ছেন ডেভলপমেন্টাল মিনারালজি। ফাঁকা বেঞ্চি। আমি প্রথম এসে বেঞ্চিতে বসেছি। স্যারের সামনে রক্তকরবী খুলে বসেছি। স্যার ক্লাশ নেওয়া শেষ করে আমার কাছে বিশু পাগলের পাঠ শুনছেন। আর আহা আহা করছেন।
আমার এই রক্তকরবীকে নিয়ে কুদ্দুস স্যার শুরু করলেন নাটকের মহড়া। নাইব চাচা অডিটরিয়ামে বাইরে সিন আঁকছেন। ঝুমা রেগে বসে রইল—সে শাড়ী পরবে না। সালোয়ার কামিজ পরেই নন্দিনী হবে। আমরা যেদিন টাঙ্গাইল থেকে ধানী রং শাড়ি নিয়ে এসেছি—সেদিন সবার আগে হাসতে হাসতে নন্দিনী শাড়ি পড়ে ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার সনে। আমি তখন পড়ছি কুরপালা। আমার কোটালীপাড়ার এলাকার উপন্যাস। নন্দিনী রাজার সঙ্গে আঁচল তুলে চলে গেল। তাদের কিছু কথা আছে।
মন্তব্য
টুকরা টাকরা। অসাধারণ! ভাই কুলদা!!! পড়ে ভালো লেগেছে ছাড়া আর কিছুই মনে আসছে না।
[টাইপোগুলো একটু ঠিক করে দিন না রে ভাই!]
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ।
আপনার এ ধরণের লেখাগুলো বরাবরই স্পেলবাইন্ডিং কথকতা।ৎ
কিন্তু শেষ করে দেন হঠাৎ করে।
লেখকের মন্তব্য
আমি জানি না লেখালেখির কায়দাটা। আমার এক শিক্ষক আছেন নৃপেন্দ্র সরকার। ।এখন পড়ান টেক্সাসে এক ইউনিতে। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে চ্যাট করেছি এগুলো লিখে। সেটাই এখানে তুলে দিলাম।
এরকম টুকরো টাকরা মাঝে মাঝে এলে এখানে তুলে দেব।
ধন্যবাদ নুশেরা।
পড়লাম দাদা। শেষ হয়ে গেলো টুপ করে।
খোকন, তোমার লেখাগুলো যখন পড়ি তখন আমি যেন কেমন এক ঘোরের মাঝে থাকি। কিন্তু তুমি ঠিক পানকৌ্রীর মত টুপ করে হঠাৎ ডুব দাও। আমার ঘোর ভেঙ্গে যায়!
অফুরন্ত আশীর্বাদ নিরন্তর!
লেখকের মন্তব্য
এইটা আমি আরও কিছুটা লিখেছি। সেটা দেব এখানে দিদিভাই।
ভালো লাগে সোজা সরল জটিল কথা
দাদার লেখায় অনেক কিছুই পাওয়া যায়।
মন্তব্য করুন