লেখকের ক‌থা

সদর দরজা

প্রস্তর জালাল : প্রথম পর্ব ও দ্বিতীয় পর্ব এক সঙ্গে

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

প্রথম পর্ব

আমার রুমমেটের নাম মোহাম্মদ জালালউদ্দিন মুন্সী। পরে মুন্সী বাদ। মোহাম্মদ জালালউদ্দিন ওরফে গ্যাব্রিয়েল জালাল। গ্যাব্রিয়েল কি করে হল—সে এক ট্রাজেডি। সে কথা বলতে আমি আগ্রহী না।

জালালের বাড়ি নেত্রকোণা। পূর্বধলা উপজেলার দরগাবাড়ি। সে বাড়িতে একটি কালো পাথর আছে। পাথর না--মহান প্রস্তর যুগের আদি প্রস্তর। প্রস্তরটি দুধ খেত। দুধ দিলে বাসনা পূর্ণ হত। ১০০% হাচা। বাসনা বিনে জীবন কি?

সে জীবনে মাঝে মাঝে মসজিদে ঘুমাতাম। হলে সিট ছিল না। ওটা দলের ভাইবেরাদরদের জন্য। আর আমাদের আল্লার দরবারের ফ্রি ফ্যান। ফ্রি লাইট। ফ্রি ক্লিন। তোফা ব্যবস্থা। সত্যিই সে এক সুখের দিন। মাঝে মাঝে ফ্রি খাওয়া। লগে অশেষ নেকি হাসেল। যাই কই।
একদিন ভোর রাতে কজন শিবির ভাই খুব তমিজসহকারে ঘুম ভাঙাল। তাদের চোখেমুখে দীন-ই নূরের ঝলক। জানতে চাইল, নাম কি ভাইজান?
অকালে ঘুম ভাঙায় মেজাজটা খসে গেল। বললাম, নাম নাই।

ওরা বেশ অবাক হল। নিজেরা কিসব শলা করল। আমার ঠিক পাশটিকে একজন শুয়েছিল। তাকেও টুক টুক করে জিজ্ঞেস করল। তিনি বেশ তাগদওয়ালা ফিগার। বললেন, নাম নাই।
এর পরের জনকে জিজ্ঞেস করার দরকার হল না। তিনি শুধু পাশ ফিরলেন। চোখও খোলার দরকার পড়ল না। ইশারা করে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন—নাম নাই। নাম নাই। নাই নাই। বাই বাই।

এরপরে চারিদিকে রটে গেল তিনজন নাম নাই কমিউনিস্ট এসে গেছে। সাধু সাবধান। সবাই নড়ে চড়ে বসল। একদিন সত্যি সত্যি কতিপয় নামধারী কমিউনিস্টও আমাদের দেখে গেল। মসজিদ থেকে একটু নিরাপদ দূরত্বে তারা দাঁড়ালেন। তাদের চোখে গভীর বিস্ময়। বললাম, বুয়েনোস তারদে।এর অর্থ কি আমিও জানি না। লাইব্রেরীর একটি বিদেশী গ্রন্থে দেখেছি। শুনে ওরা কিন্তু থমকে গেল। তাগুদে লোকটি আপাত গম্ভীর গলায় বলল, ধেড়ে নাগ। কেড়ে নাগ। তৃতীয়জনের ইশারায় কাফি। কমিউনিস্ট ভাইরা কেটে পড়ল ভয়ে আর অজানা আশঙ্কায়। আর কখনো এরা কেউ আসে নাই। কি একটা থিসিসে এরা লিখেছে--শেষে নব্য সংশোধনবাদীরাও এসে পড়ল? যাই কোথায় প্রভু আল মার্কস!

প্রশাসন এলো। মানুষের সমাজে আতংক বজায় রাখা ঠিক নয়। তিনি অতিশয় প্রবীন লোক। মেলা ঘাটের জল ঘোলা দেখেছেন। পাক দেখেই বুঝতে পারেন—কে কোন ঝাঁকের কৈ। বেশ মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, বাবাসগোল, তোমরা আইসুইন কোত্থেইকা?

তৃতীয় জন শুধু ইঙ্গিতে বোঝাল, আমরা আসি নাই। আমরা আস্যা পড়ছি। প্রশাসন বেশ গদগদ চিত্তে বললেন, খাসা। খাসা। এর তুল্য নাই ভাষা।
এই প্রশাসনের নাম হেফাজউদ্দিন শেখ। বেশ লম্বা। হাসি হাসি মুখ। কোনো বিষয়েই অচিন্তিত। পশু চিকিৎসা অনুষদের প্রধান প্রফেসর। তার মত করে গরু ছাগল চেনার ক্ষমতা আর কারো ছিল না। তিনি সবার উপ্রে। খুবই এলেমদার। বাঁহাত দিয়ে লিখতেন পেন্সিল দিয়ে। নো কালি ঝালি।
তিনি দুটি কাজ করলেন। এক. একটি স্পোকেন স্প্যানিস লার্নিং বই এনে দিলেন। বললেন, এইসব বাতচিৎ মাঝে মাঝে কাজ দেবে। ঠিক এই বইটি থেকেই ‘বুয়েনোস তারদেস’টা টুকলি করেছিলাম। প্রেফসর শেখ স্যার ঠিক বুঝে নিয়েছেন। এড়ানোর উপায় নাই। তিনি শান্ত ভঙ্গিতে বলে দিলেন-বুয়েনোস তারদে-এর অর্থ হল শুভ সন্ধ্যা। দ্বিতীয় কাজটি ছিল পৃথিবীতে অষ্টম আশ্চর্য কাজ। তিনি আমাদের এই তিন নাম নেইকে একটি থ্রি বেড রুম ঠিক করে চালান করে দিলেন।

সহি ইনসান হিসাবে প্রফেসর হেফাজউদ্দিন শেখ তেতলার একটি রুম খুলে দিলেন। তালায় জং ধরে গিয়েছিল। বহুদিন তালাটি খোলা হয় নি। ভিতরে মাকড়সার জাল। কিছু তেলাপোকা ছুটে বেড়াচ্ছে। স্যার নাকে রুমাল চাপা দিলেন। বললেন, বাবসগোল, তোমরা ছাড়া আর কাউকে তো দেখিনা এইরুমে থাকবার পারবে। সুখে থাইকো। ভাল থাইকো। গ্রাসিয়াস। মানে ধন্যবাদ।

রুমটির নাম ৩০৩। দেখে অনেকেই ফিসফাস করতে লাগল। উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগল। শোনা গেল—এইবার এই তিনটার মাথা পড়ে যাবে। ধড়টা হাওয়ায় ভাসবে। পলিটিকাল কাগুরা এই নাম নেইদের বসতি প্রাপ্তিকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে ধরে নিল। কারণ হলের সীট হল তাগো বাবা অথবা মামার সম্পত্তি। তাগো সেবাদাস না হলে নো সীট।

এই রুমটির দখল নিয়ে যতদূর শোনা যায়—গুরুরা বেশ কবার ঠাস ঠুস করেছে। চারটি মাথাও পড়ে গিয়েছিল। দেওয়াল লিখন দেখা যায়—শওকত-ওয়ালী-মোহসীন, রক্ত দিয়ে শুধবো ঋণ। আরেকদল লেখে—খালেদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। কোনো কিছুই দেখি বৃথা যেতে দেয় না। তবু কেন এত জীবন বৃথা হয়ে যায় রে ভাই?

আমার তৃতীয় রুমমেট একটি কাগজ টানিয়ে দিল থ্রি নট থ্রির দরোজায়। ওনার নাম মোবারক হল—মুহাম্মদ জুলহাসউদ্দিন। সাং ঘাটাইল। অতি চমৎকার হস্তাক্ষর। লেখা—থ্রি নট থ্রি। নিচে অং বং করে আঁকা একটি মাথার খুলি। আর আইসক্রিম সদৃশ্য দুটো দেশী মুরগীর হাড়। ৩৩০০০ ভোল্ট। আর রুমের ভিতরে টানানো হল—তিন সতীন।জুলহাস-জালাল-খুকন।একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে—খুকন শব্দটির খ অক্ষরের নিচে জ অক্ষরটি আছে। সাদা চোখে দেখা যাবে না। কিছু এলেম লাগবে। এলেমটা শুধু প্রভু জুলহাসভাইয়েরই আছে। তাই তিনি জালালের সঙ্গে মিলিয়ে প্রভু জুলহাস লিখতে চেয়েছিলেন—জুখন। ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান দেখাতে গিয়ে তিনি ঘষে ঘষে জ অক্ষরটি তুলে ফেলার চেষ্টা করেছেন। এই নিয়ে আমাদের মধ্যে নো ঝামেলা। লারে লাপ্পা লারে লাপ্পা। ওহো বাঘো মামা—তোমার বাল্লক এলো বনে।আমাদের কী দশা কে জানে।।

সমস্যা হয়ে গেল—এই দশার মধ্যেই আমরা টিকে গেলাম। আমাদের মাথা মাথার উপরেই দিব্যি ফিট হয়ে থাকল। এই মাথা বাড়িয়ে অন্ধকার রাতে লোড শেডিংএর মধ্যে হাঁক দিয়ে বলতে হত—
কোয়ালেস তু নমম্রে? কোয়ালেস তু নমম্রে? (অনুঃ তোমার নাম কি? তোমার নাম কি? অনুবাদক: প্র:হে:উ: শে) এর পর জালালউদ্দিনের বুলন্দ আওয়াজ--ঘেড়ে নাগ। কেড়ে নাগ। শেষে জুলহাস ভাই একবার এসে হাতটা ঘুরিয়ে দেখাতেন। এইসবই অন্ধকারের কারুকাজ। অদ্ভুত কাণ্ড হল—রাতবিরেতে এই পথে লোকজন চলাফেরা ছেড়ে দিল। আর আমাদের তিনতলাতে কিরিচ হাতে কাউকে দেখা যায় নি। কেউ কেউ খেয়াল করত—আমাদের দেহের ছায়া পড়ে কি না। ভয়ে ভয়ে কাছে ঘেষতে সাহস পেত না। দূর থেকে দেখত। ফলে তারা আমাদের ছায়াটিকে দেখতেই পেত না। বেশ রটে গেল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন ছায়াহীন তেনারা বাস করে। পাশ দিয়ে কোনো জঙ্গী মিছিল গেলেও তা থেমে যেত। রাস্তা থেকে সরে পাশে সরে দাড়াত।এই সম্ভ্রম পেয়ে বেশ একটা ভাব এসে যাচ্ছিল।

তবে আমাদের তিন সতীনের লেখাপড়া বেশ ভালই চলছিল। বাসনা একবারে ডক্টর ফক্টর হওয়া।জুলহাস ভাই ছিলেন অংকের দিগ্গজ। তিনি আমাদের প্রভু। জালালের পরবু। জালালউদ্দিন সব সাবজেক্টেই স্মার্ট। আমি শুধু মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে চেচিয়ে উঠতাম—ওরে কাল আমার অংক পরীক্ষারে। কী করে নেব শিক্ষারে। ঘেমে টেমে অস্থির। প্রথম বর্ষে ভয়ে অংকের পরীক্ষায় ড্রপ।অংকের প্রফেসর রত্নেশ্বর কর্মকার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন—বাবা মনু। তুমি তো গেইছো।
--মানে কী?
--আউট। ইনভার্সিটি থেইকা পুরো আউট।
--কী করবাম স্যার?
--আমার কাছে পেরাইভেট পড়ো। বিফলে মূল্য ফেরত। মূল্য না থাইকলে যাও। মাত্র একমাস সুমায়।

কর্মকার স্যারের বাড়ি বরিশালের উজিরপুরে। বাজারে ওনার ভাইয়ের একটি ওষুধখানা আছে। বিনা অস্ত্রে কি এক গোপন চিকিৎসাও হয়। কর্মকার স্যার ইশারা করলেন—ডোন্ট ওরি মনু। মূল্য লৈয়া আইসা পইড়ো। একবার আইলেও চইলবে। প্রশ্ন এবং উত্তর একলগে।
শুনে জুলহাসভাই হাসলেন। তার পরামর্শে চাঁদের আলোয় অংক করা শুরু করলাম। নো কাগজ—নো পেন্সিল। বারান্দার পাকা ফ্লোর কাগজ—কর্মকার স্যারের ক্লাশ থেকে কুড়িয়ে আনা নানারঙের চকখড়ি। বারান্দা ছেড়ে সিঁড়ি—ডাইনিংএর দেওয়াল, এমনকি বাগানের সরু রাস্তায় কষা হল অংক। পাহারাদার জালাল। আর জুলহাসভাই টাঙ্গাইলের বিশেষ কাথার ভেতর থেকে মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে বোঝান—চলছে--চলুক।

আকাশে নির্মল চাঁদ উঠেছে। সরোবরের জল চিকমিক করছে। আর পাড়ে ফর্শা ধবল ইউক্যালিপটাসের চিরল চিরল পাতাগুলো শির শির করে কাপে। দুএকটা রাত্রিচর পাখিও ডাকে। পথে যেতে যেতে ঘাড় উঁচু করে দেখে দার্শনিকসুলভ দুএকটা শিয়াল। এর মধ্যে জন্ম নিচ্ছে একজন অতি ঐতিহাসিক অংকবিদ স্যার জুখন আবজাব। কর্মকার স্যার রেজাল্ট দেখে তাজ্জব। ১০০ তে ১০০। এটা একটা রেকর্ড। কর্মকার স্যার বারবার মাথা নাড়লেন। কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। কিন্তু ভুলটা যে কোথায় তা তিনি ধরতে পারছেন না। রেজাল্ট নিয়ে ছুটে গেলেন কন্ট্রেলার সেকশনে। মিলিয়ে দেখলেন খাতা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—হু রেকর্ড। ছেলেটা পাশ কইরা গেলরে। ঠেকান গেল না। রেকর্ড তৈরিই হয় ভাঙার জন্য। তিন সতীনের রেকর্ড অম্লান। কারো বাপের সাধ্যি নাই ভাঙার। জনসংযোগ বিভাগ থেকে প্রকাশিত চারপাতার বুলেটিনে খবরটি ছাপা হল।সঙ্গে মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের একটি হাসি হাসি মুখ এবং মুখরিত বানী। তিনি এই রেকর্ডসৃষ্টিতে গৌরবান্বিত এবং বিশেষ সাফল্য কামনা করছেন। বাকীটুক পড়ার কোনো দরকার নাই। কারণ আর কোনো রেকর্ড করার বাসনা জাগে নাই।

এই উপলক্ষ্যে কোনো এক রসিক ভাই আমাদের হলের গেটে একটি আবক্ষ নগ্ন নারী মূর্তি রেখে গেল। বুকের মাঝখানে একটি কাগজ ঝুলছে—তিনসতীনের সাফল্য আমাদের অহংকার। পাহারাদার, দয়া করে মূর্তিটি থ্রি নট থ্রিতে পৌঁছি দিও রে ভাই। আমাগোর সাহস নাই।

মূর্তিটি পেয়ে প্রভু জুলহাসভাই খুব খুশী হয়েছিলেন। খুশী হয়ে কাথা মুড়ি দিয়ে একটি নিশ্চিত ঘুম দিলেন। জালাল মূর্তিটিকে তার আর আমার জোড়া টেবিলের মাঝখানে স্থাপন করল। কয়েকটা ফুলের অনুসন্ধান করে ব্যর্থ হল। তবে গলায় কেন্টিন থেকে একটি লম্বা তেজপাতা এনে গলায় ঝুলিয়ে দিল। কানে দুটো টাইগার বামের কৌটো। বিড়বিড় করে বলল,কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারে। জালাল কদিন উসখুস করল একটি বাংলা ডিকশোনারীর জন্য। কুচযুগ শব্দের মানি কি? কৃষিতত্ত্ব বিভাগে গিয়ে একদিন কুচফলও দেখে এল। যে যুগে কুচফল ধরে—তাই হল কুচযুগ। সোজা অর্থ। বুঝতে পেরে জালাল খুশি। এইহেতু সহজেই বোঝা যায়-- মূর্তিটির কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা। এ আমাদের ব্রহ্মচর্যা স্খলন থেকে বাঁচিয়েছিল আমাদের লেডিস হলে ঘোরাঘুরির দরকার হয় নি। দরকার হয় নি কালিদাসের মেঘদূত পড়ে অকাল অশ্রুপাত।তবে জুলহাস ভাই কয়েক লাইন লিখেছিলেন—
ওগো পাথরমুখী মেয়ে,
আমরা সুখি তোমায় কাছে পেয়ে।
যতোই করো রাগ—
পারবে না তো মোদের করতে ত্যাগ।।
তোমার নেইকো ঠ্যাং
ফালদে যাবে নও তুমি সেই ব্যাঙ!

কবি প্রভু জুলহাসউদ্দিনের এই একটি কবিতাই তাকে অমর করেছে। তার আর কোনো কবিতা লেখার দরকার নেই। ময়মনসিংহ কবিতা কোম্পানী প্রাইভেট লিমিটেডে তার নাম এবং কবিতাটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। আমাদের প্রক্টর মহোদয় সরেজমিনে দেখে নিশ্চিত করেছিলেন।


দ্বিতীয় পর্ব

গণিত পর্ব উপলক্ষ্যে প্রভু জুলহাসউদ্দিন একটি হারিকেনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এজন্য জুলহাসউদ্দিনের সঙ্গে ঘাটাইল যেতে হয়েছিল। পথ ঘাট প্রবীণ বলেই খুবই উপভোগ্য। আর বাস ততোধিক প্রবীণ। শোনা যায় ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় এগুলো ব্রহ্ম দেশ থেকে এসেছিল। একটু বয়েস হয়ে যাওয়ায় আর ফিরে যেতে পারে নি। বয়সোচিত কারণে বাসের হাঁপ ধরে গেলে মাঝে মাঝে অসীম বিশ্রাম মেলে। সেই অবসরে নেমে গাছ থেকে কাঠাল পেড়েও খাওয়া যায়। তবে একটা সপ্তম আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল সেদিন। সেদিন বাস থেকে নেমেই জুলহাসউদ্দিনের গলায় যে লোকটি কথা বলল, সে জালাল। আর জালালের গলায় যিনি কথা বললেন, তার দেহটি জুলহাস উদ্দিনের। আর আমি, কি বলব—পুরোই বাসের প্যাপুং। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে বললাম, ও প্রভু, ঘটনা কি? আমি কেডা? আমরা কি মইরা গেইছি। আমি ক্যান মানুষ নাই।
প্রভু গম্ভীর গলায় বললেন, নো। মইরা যাই নাই। তবে মইরা যাইতে দেরী নাই।
--তাইলে?
--তাইলেও নাই,নাইলেও নাই। দেবে আর নেবে—মেলাবে মিলিবে। বাসের ঝাকনিতে আমগো দেহ পাল্টায়া গেছে। জালালের হাড্ডি খইসা লাগছে আমরার গায়ে। আর আমরার হাড্ডি লাগছে—জালালের গায়ে।
--তাইলে আমি কার লগে পাল্টাইছি?
--তুমি মিয়া হাড়গিলার ছাও—হাড্ডি ছাড়া আর কিছু আছে? তোমরার লগে এই মুড়ির টিনের বাসের মিল করে ঝিলমিল। সুতরাং তুমরার লগে বাসের দেহ বদলাইছে। তোমরার পরান পাখি অখন বাসে। আর বাসের প্যাপুং তোমরার বডিতে। দুজনে দুজনার। ধেড়ে নাগ। কেড়ে নাগ।

ভয়ানক অবস্থা। আতংক লেগে গেল। প্রভু অভয় দিয়ে বললেন, নো পরবলেম। ফিরার বাসে আবার যার যার পরান তার তার বডি পাইবাম।

প্রভু দয়ালু বটে। এবং তার মুখ মোবারকে খাঁটি কথা ছাড়া দুই নম্বরী নাই। তাই ঘটেছিল। এবং এর সাক্ষ্য পাওয়া যাবে ঘাটাইলের মোল্লা বাড়ির ছোটো মোল্লার শালার বিবাহ সংবাদ। স্থানীয় সংবাদপত্রে তিন নম্বর পৃষ্ঠায় বক্স করে ছাপা হয়েছিল। সেই রাতে বিয়া তো হইল। রাতে কুদ্দস বয়াতির গায়নাও লাগল। রাত্রি কাবার। বরবধুঁ ঘরে ঢুকেছে। আমরা মশার লগে সতী সখিনার কিসসা গান শুনছি। মাঝে মাঝে হাই তুলছি। আর ভাবছি—খাবার কুন সুমায় দেবে? জালাল কিছুটা ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি জালালের পাশে। এক সময় প্রভু জুলহাসউদ্দিন ডেকে তুললেন—বললেন, চল। সুবেহ সাদেকের দেরী নাই। সেগুইর এদেলান্তে। আগে বাড়ো।
বললাম, খাদ্যের কি হইবে প্রভু। পেটে যে গেদেকম্বল?
--চিন্তা নাই। পথে ঘাটাইলের বুইড়া বাস আছে। আর হাপ ধরার ফাঁকে ফাঁকে কাঁঠাল বাগান পাইবাম।

প্রভু বিনা কথা নাই। তখনো বয়াতি সতী সখিনার কিসসা গেয়েই চলেছেন। আর প্রভু নির্দ্বিধায় ভরা আসর থেকে নিভু নিভু তিনটে হারিকেন—হাতি তুলে দিলেন। খাদ্যের বিনিময়ে হারিকেন। তিনটে বাঁশ হলে মন্দ হত না। পথে পেয়েও যেতে পারি। এ রকম আশা আছে। আমরা তিনজন বাস স্টান্ডের দিকে রওনা করেছি। মাঝে মাঝে মোরগ ডাকছে। কতিপয় লোকজন প্রাতঃকৃত্য সারতে মাঠে নেমে যাচ্ছে। বললাম, প্রভু, আমগো রুম একটা। তিনটা হারিকেন দিয়া কী করমু?
প্রভু বললেন,একটা আমরার। আর দুইটা দান করবাম।
--দান কইরা কি ফায়দা?
--চুরির পাপ মুইছা যাইবে একটাতে।
--আরেকটার কী কেস?
--সুয়াব জমাইবাম। কুন সুমায় পাপ করি ঠিক আছে!দ্যাশের যে হাল—সুয়াব কি হগোল সুমায় মেলে?
সমস্যা নাই। এল প্রবলেমা। এল প্রবলেমা। দেসপেদিদা। বাই।

তবে সমস্যা ছিল খাবার নিয়ে। হল কেন্টিন ছাড়া কখনো জালাল হোটেলে খেতে যায় নি। সেটা একটা মহা হ্যাপা। তিনজনকে যেতে হত একসঙ্গে কেন্টিনে। খিদে লাগলেও অপেক্ষা করতে হত কখন সবাই চলে যায়। বয়গুলো বড় একটা ভাতের বোল, ফিস কাপ বা মিট কাপ, গরম ডালের গামলা, এক বাটি পিঁয়াজ, বেশ কিছু কাঁচা মরিচ এইসব রেখে চলে যেত। আমার ছিল পাখির আহার। প্রভু জুলহাসউদ্দিন খেতেন না, অঙ্ক করতেন সেটা ঠিক বোঝা যেত না। জালাল শুরু করত এক প্লেট শুধা ভাত দিয়ে। তারপর ডালের ঝোল দিয়ে দু প্লেট। তলানী দু প্লেট। ফিস দিয়ে ফিসফিস করে এক প্লেট। ঝোলে ডুবে থাকা দুখণ্ড আলু দিয়ে দু প্লেট। কারি দিয়ে দু প্লেট। পিঁয়াজ দিয়ে এক প্লেট। মরিচ দিয়ে এক প্লেট। ততক্ষণে বড় সড়ো বোলটি ফাঁকা হয়ে যেত। ফাঁকা হয়ে গেলেই বিষণ্ন চোখে জালাল এদকি ওদিক তাকিয়ে থাকত। মনে হত ওর মাকে খুঁজছে। সিধে আধপেটা খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। দৌঁড়ে এসে আর দু গামলা ভাত নিয়ে এসে বলবে, খাও বাজান, ধীরে সুস্থে খাও। খাইয়া ওটঠো।

হল কেন্টিনে মা নেই। বয়রা ছিল। ততক্ষণে তারা কেটে পড়েছে। মাঠে দুপুরের রোদ কিঞ্চিৎ ম্লান হয়ে পড়েছে। বাটার ফ্লাই ঘুম ঘুম চোখে কোনো এক পাতার উপর বসেছে। এই দৃশ্য দেখে জালাল বুঝে ফেলেছে উপায় নেই। আমাদের কাঁধে ভর দিয়ে জালালউদ্দিন ঘরে ফিরত। মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরত বলে অনেকেই অবাক হয়ে দেখত, মুন্সী মুহাম্মদ জালালউদ্দির পেটে খিদে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। ভর পেট নাই খেতে পেয়ে মনে তার খেদ রয়ে যাচ্ছে। শরীরটা আরেকটু চাগাতে পারছে না জেনে আমাদের মাননীয় ভিসি স্যার প্রফেসর মুহাম্মদ আসাদুর রহমান ফুরফুরে ছিলেন। একটা মেডেলের অর্ডারও দিয়েছিলেন। বাসনা করেছিলেন তাঁর শালা এরশাদকে দিয়ে জালালের গলায় মেডেলটি ঝোলাবেন। এসব বাসনা তিন সতীনের কখনো ছিল না। বাসনা রেখে কী লাভ? বাসনা বিষ।

এই এরশাদ ছিলেন অতিশয় রসিক এক স্নেহ প্রবণও বটে। শোনা যায় তার পূর্ব পুরুষ কোহেকাফ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তারা ছিল রূপবান। রূপবতী ছাড়া তাদের দিন কাটে না। রাত আরও সম্ভাবনাময়। কোহেকাফ থেকে আসার সময় লগে যন্ত্র আনতে তারা ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ষড় নামক রিপুটিকে কিন্তু আনতে ভোলে নি। যন্ত্র ছাড়াই তাদের বংশগতি রক্ষা হত। বায়োলজির ভাষায় এটাকে বলা হয়—পার্থজেনেসিস। ছাও পোনার দরকার নাই, তোফাসে ঝই ঝঞ্ঝাট ছাড়া জীবন কাটাও। কে ঠেকায়। ছাও পোনা লাগলে যে কোনো সময়ই পাওয়া যাবে। লাগাটাই হল কথা। কোহেকাফ ছাড়া বিদ্যা আর কোথাও নাই। দুনিয়াকো মজা লেলে, দুনিয়া তোমারি হ্যায়।

এই এরশাদের লিগাল বহুবিবির বাড়ি ছিল আমাদের ইউনিভার্সিটির পাশের গ্রামে। বয়রা বাজার ছাড়িয়ে আরেকটু এগিয়ে যাবেন। তারপর পাবেন সুতিয়াখালি। এনার শ্বশুর আলা হুজুর রেলগাড়ির তফিলধারী ছিলেন। সে অর্থে তিনি আমগো শালাজ্ঞানে ভাল পুছতেন। তিনি বলতেন, আব্বে শালা,তুমহারা কিয়া কাম।
লেখাপড়া করে যে,
নারী চাপা পড়ে সে।।
নারীরা রাড়ি হবে।
তবে তার গাড়ি হবে।।
একহাতে লালপানি।
আন হাতে হুজুরানি।।

শরাব পিও। মাল লিও। ঠাস ঠাস ঠাস। আর যারা এই পথে যেতে নারাজ—তাগো জন্য এরশাদের দিল উথলে উঠত। বলত, যাও, শালা—বাড়ি যাও। বাপের হোটেলে আরও কিছুদিন খাইয়া আইস। কষ্ট কইরা লাভ নাই। এরপর এরশাদের চেলাচামুণ্ডারা তমিজসহকারে ট্রেনের বিনা টিকেট আমাদের হাতে ধরিয়ে দিত। কারো বাপের সাধ্যি ছিল না এরশাদের শালাদের কাছে টিকিট ফিকিট চাওয়ার। তিনি ছিলেন মহান। অনেকেই তার দীর্ঘায়ূ কামনা করত। খাস দিলে দোআ করত, হে পরওয়ারদিগার, এই এরশাদ হারামজাদারে শকুনের হায়াত কবুল কর। আমিন। তিনি বিরাশি বছর বয়সেও যন্ত্র ছাড়াই যন্ত্রণা সৃষ্টির দোকান দিয়ে বসে আছেন। তাঁর একদিকে লুলা গুজুর বাহিনী। আরেকদিকে মূলা হুজুর বাহিনী। এই ধারণায় তিনি অদ্ভুদভাবে একটি থিউরী খাড়া করলেন। বললেন, পর্ন এবং ধর্ম এক লগে চলতে পারে। এইরূপে পর্নবাজরা আর ধর্মবাজরা তার হুকুমতে এক লগে খুশি। এর বাইরে কিছু নাই। হুউম।

এইরূপে ইউনিভার্সিটিতে এসেই আবার বাড়ি চলে যেতে যেতে আমাদের তিনসতীনের মেজাজ ছ্যারাবেরা হয়ে গেল। আর্মি ভাইরা তখন হলের দখল নিয়েছেন। কোনো পোলাপান নাই সারা ইউনিভার্সিটিতে। রাতে হালকা করে চাঁদ উঠেছে। সুতিয়াখালিতে ফুল ফুটেছে। এরপরে নিলক্ষ্যার চরে আমাদের তিনজনের দেখা। বোঝা গেল বাড়ি ফিরতে কারো মন নাই। বাগী হয়েছি মোরা তিন সতীন। নীলক্ষার চলে তখন ভয়াবহ কুয়াশা। ব্রহ্মপুত্র ওপাশে। এখানে শরীফ ডাকাইত বংশের বাস। এদের নেতা রমজান আলী ডাকুয়া এন্ড কোং সেই রাতে চরের উদ্দেশ্যেই আসছিল। হালকা আলোর পরে আকাশে মেঘ জমেছে। চেনা যায় না। ওরা কি ভেবে বালি চরে শুয়ে পড়ল। চেঁচিয়ে বলে, এখানে কে জাগে?

আমাদের তো আর ভয় পাওয়ার কিছু নাই। মহান আর্মি ভাইদের শত শত উঁচানো আগ্নেয় অস্ত্রের তাড়ায় ইঁদুর দৌঁড় দৌঁড়ে বেড়াচ্ছি। আর এই কটা ডাকাত! প্রভু জুলহাসউদ্দিন একবার আকাশ পানে তাকালেন। জালাল বলল, কী করাম। আর এর ভেতর থেকেই আমাদের কে একজন চেঁচিয়ে বলল, বুয়েনোস নোচে। কে বলল বোঝা গেল না।
শুয়েপড়া ডাকাত দল জবাব দিল, জোরে কন।
--থ্রি নট থ্রি।
জালালউদ্দিন জনান্তিকে বলল, ধেড়ে নাগ। কেড়ে নাগ। আর জুলহাসউদ্দিন ইশারায় জালালকে দেখিয়ে দিল। অন্ধকারে বোঝা না গেলেও সেটা বেশ একটা রহস্যময় দৃশ্য হয়ে উঠেছে। আর দূরে কোথাও এক ঝাঁক শিয়াল কঠিন স্বরে হেঁকে উঠছে, হুক্কা হুয়া। হুক্কা হুয়া।
ওরা,রমজান আলী ডাকুয়ার ডাকাতবৃন্দ হাত তুলে লাফিয়ে উঠল। পালের গোদা হাক দিল, কাগু আইছুইন। আমি নছর। আপনের বাথিজা। গুলি করুইন না যেন।
নছর উদ্দিন ডাকাত এন্ড কোং আমাদের তিন সতীনকে খুবই শরমিন্দা করে হাতে পায়ে নখে পড়ল। ওরা আমাদের মাথায় করে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে এল। আর্মি কমান্ডারকে ডেকে বলল, বস, এনারা খুবই এলেমদার মানু। হ্যাগো থাকনের ব্যবস্থা করুইন।
নছরউদ্দিন ডাকুয়ার সঙ্গে ব্রিগেডিয়ার সাহেবের খাই খাতির খুবই উচ্চস্তরের। তিনি তমিজ সহকারে বললেন, ওকে, পাস। তবে, আমরা ওনাগো দেইখাও দেখুম না। ওনারা সিধে গেট দিয়া ঢুকতে পারবেন না। চক্ষুর আড়াল দিয়া ওনাগো ঢোকন লাগব। কি কইরা ঢুকবেন সেইটা উনারা আবিষ্কার কইরা নেবেন।

এত কথা শোনার সময় ছিল না ডাকুয়া ভাইদের। ফাতিমানগরে ওদের রাত্রিকালীন প্রজেক্ট আছে। ব্রিগেডিয়ার সাহেবের ওকে শুনেই লম্বা সালাম দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
আমরা তিনজন আমাদের হলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গেটে বড় তালা। ভিতরে গার্ড ইঙ্গিতে বলল, স্যার পালান, পালান। আর্মি আইতাছে।
--গেট খোলো।
--গেট খোলা যাইত না। চাবি নাই।
--চাবি লইছে কেডায়?
--ভিসি স্যারে।

ভিসি স্যার তখন ক্যাম্পাসে নাই। ব্রিগ্রেডিয়ার সাহেবের খানাপিনার জন্য সাহেব কোয়ার্টারে গেছেন। ওখানে বিখ্যাত চাইনিজ চাইনিজ রেস্তোরা আছে। ওদের উপরে ভরসা করা যায়।

আমাদের ক্লান্তির উপর ভরসা নাই। তাই ঘুরে ঘুরে হলের পিছনে চলে এলাম। তিনতলায় আমাদের রুম—থ্রি নট থ্রি। জানালার পাশ দিয়ে চলে গেছে পানির পাইপ। প্রভু জুলহাসদ্দিন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। পাইপের উপরে একটি চড়ুই পাখি চিড়িক চিড়িক করে ডাকছে। প্রভু লাফ দিয়ে পাইপ বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তার পিছনে আমি। বেশ তেলেতেলে। দুই কদম আগাই তো এক কদম পিছাই। জুলহাস ভাইয়ের মধ্যে সেই পুরনো গণিত চেগে উঠছে। তৈলাক্ত বাঁশে বানরের উর্দ্ধে আরোহন শীর্ষক অঙ্কটি তার কাছে স্কুল থেকেই জলবৎ তরলং। তিনি বাঁশ বেয়ে উঠছেন। আর আমি মনে মনে অঙ্কের বদলে জালালদের বাড়ির দুধপাথরের উদ্দেশ্যে বলছি—কালো গরুর দুধ দেব, উড়কি ধানের মুড়কি দেব, হুগলি ধানের চিড়কে দেব—দোহাই দুধপাথর হে, আমাকে ফেইল করাইও না বাবা। যেন প্রভুর লগে উপরে উঠতে পারি। পিছলাইয়া পড়িলে ফুস।

প্রভু জুলহাসউদ্দিন উঠলেন বানরের অঙ্ক কষে। আর আমি দুধ পাথরের দোআ নিয়ে। জুলহাস ভাই বললেন, জয় বাবা তৈলাক্ত বাশেঁর বানর, আর আমি জয় বাবা দুধপাথর বলে হুঙ্কার ছেড়ে জানালা গলিয়ে তিরতলায় তিন শ তিন রুমের ভিতরে ঢুকে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে মালুম হল, আমাদের লগে জালাল আসে নাই। নীচে দাঁড়িয়ে আছে—হা করে উর্ধ্বপানে চেয়ে আছে। বললাম, দোস্তো,দেরী করতাছ ক্যান। উইঠা পড়ো। শালা আর্মি ভাইরা আইয়া পড়বে।

গায়ে পায়ে জালাল একটু ভারী। তার ওঠার সাহস নাই। তার ভারে পাইপ ভেঙে পড়তে পারে। অকারণে পাইপ রিপেয়ারের খরচ ভিসি স্যারের উপরে উপরে চাপাতে তার বিবেকে বাঁধছে। ভিসি স্যারের বিবেক নাও থাকতে পারে—কিন্তু আমাদের জালাল—পূর্বধলার মুন্সী জালালউদ্দিনতো দুধপাথরের বাড়ির মানুষ। তারতো বিবেক অমনি অমনি চলে যেতে পারে না। তখন বললাম, ওরে, তাইলে তুই তোর দুধপাথরের দোহাই নিয়া উইঠা পড়।
--নো। জালাল আরও গম্ভীর হয়ে পড়ল। দুধ পাথররে কেন কারণে অকারণে টানবাম? আমি কি এলা এরশাদদ্যার লাহান পাঁঠা নাকি যে, রাইতে পরমাইয়াগো লগে ফস্টি নষ্টি কইরা সক্কাল বেলা মসজিদে খোয়াবনামা হাসেল করতে যাইয়াম? একদিন সাইকেল চালাইয়া দ্যাশের কুটি কুটি ট্যাগা মারাম? টিক্যা থাকনের লাইগা ছাত্রগো উপরে গুলি চালায়াম? একদিনের মইধ্যে বাজা বিবিরে গর্ভ কইরা ঐ দিনেই ডেলিভারি কইরা আলা আব্বা হুজুর হয়াম?

আরও কি সব কথাবার্তা জালাল বলতে বলতে হলের পূবপাশে রাস্তা পেরিয়ে—ছোট্ট নালা খালটি ফাল দিয়ে পার দিয়ে পার হয়ে কাউ শেডে চলে চলে গেল। আমগো আজকের বিদ্রোহী জালালের অইটা মন পসন্দ-- নির্ঝঞ্ঝাট জায়গা।

এরপর জানা যায় জালালউদ্দিন কাউশেডের বাইরে কখনো আর আসে নাই। ওখানেই থাকা শুরু করেছে। মশাগণ ভ্যানভ্যান করে তার দেখভাল করত। কাউশেডের মরাধরা গরুগরু তাকে আপন ভাই জ্ঞানে সম্মান করত। বাহাদুর নামে একটা ল্যাংড়া ঘোড়া ছিল। তার মারফত কিছু সংবাদাদি পাওয়া যেত। কয়েকজন স্যার কাউশেডে জালালকে তাদের সিন্দুক থেকে বের করে আনা অতি পুরাতন এবং অতি মূল্যবান ক্লাশনোট পড়ে পড়ে পাঠদান করলেন এবং নিয়মমাফিক ক্লাশটেস্টও সাফল্যের সঙ্গে সমাধা করতে সক্ষম হলেন। এর মধ্যে ল্যাবওয়ার্কও বাদ যাচ্ছে না। টার্ম পেপার হচ্ছে। মস্ত থিসিস হচ্ছে। সবাই খুশি। শিক্ষকবৃন্দ খুব খুশি। এত শান্তশিষ্ট লেজবিমিষ্ট অনুগত ছাত্র তাদের জীবনে কখনো আসে নাই। নো মিছিল। নো মিটিং। নো ভাংচুর। নো হরতাল।

আমাদের ভিসি স্যার একদিন কাউশেডের সামনে এলেন। গাড়ি থেকে স্যার বেশ সম্ব্রমের সঙ্গে নেমে দাঁড়ালেন। গলা খাকড়ি দিয়ে বললেন, মুহাম্মদ জালালউদ্দিন মুন্সী—আছেন বাবাজি?
জালাল তখন তার চুলে চিরুনি দিচ্ছিল। কিঞ্চিৎ টাক পড়েছে। একটু যত্ন করা দরকার। ছেলে বলে কি চেহারা সুরত থাকতে নেই?
ভিসি স্যার তমিজ সহকারে বললেন, আপনার কুনো অসুবিদা আছে?
--কোনো অসুবিধা নাই।
--কুনো ডিগ্রি ফিগ্রী পাইছেন?
--পাইবাম। বুঝছি আপনে না দিয়া ছাড়বেন না—ভরসা আছে।
--গুড। আপনের জন্যই ডিগ্রি খাড়া আছে। মনে আর কুনো বাসনা আছে?
--বাসনা মানে কি?

ভিসি স্যার একটু সমস্যায় পড়ে গেলেন। বাসনা শব্দটার মানে তিনি বোঝেন। কিন্তু অর্থ বলতে পারছেন না। অর্থ বলার মত একমাত্র উপযুক্ত প্রভু জুলহাসভাই কাছে নাই। আর অর্থের তো নানা অনর্থক ঝামেলাও আছে। তার বুৎপত্তি, তার সন্ধি-সমাস, উপসর্গ, বিসর্গ…বাংলা ভাষা মহা প্যাচাইল্যা। এর চেয়ে উর্দুই ভাল। তেরে ভিজে বদন কি খুশবু। বাসনা কি বাঁশ শব্দ থেকে এসেছে? বাসনা মানে কি বাঁশ দেওয়া? তিনি ঘেমে উঠলেন। বাঁশ থাকায় বাসনা শব্দে সেক্স জাগে। শালা ভগ্নিপতির এক লগে সেক্স নিয়ে টানাটানি করা ঠিক নয়।

জালাল চিরুনি খানার দিকে চোখ রেখে বলল, না স্যার। বাসনা নাই। তবে একখান কথা আছে।
--ভেরি গুড। প্রাণে আরাম পাইলাম। বলেন মুহাম্মদ জালালউদ্দিন। আপনের কথা শিরোধার্য।
--আমার বাড়ি নেত্রকোণার পূর্বধ্বলা। দরগা বাড়িতে এখখানা কালো পাত্থর আছে। পাত্থরে দুধ ঢাইল্যা দিলে বাসনা পূর্ণ হয়। হেই দুধপাত্থরডা পাইবার মঞ্চায়।
--পাত্থর দিয়া কী করবেন?
---পাত্থর দিয়া বাসনা পূরাইবাম। এই পাত্থররে কইবাম--আমরারে পিওর গরু বানায়া দাও। গরু বিনা গতি নাই।
--ডোন্ট অরি। আমরা লোকজনরে গরুই বানাইতে চাই। মানুষ দিয়া কাম নাই। আপনার বাসনা পূর্ণ হবে বাবাজি।

পূর্বধলার দর্গাবাড়ি থেকে ট্রেনে করে দুধপাথরটি আনা হল। পশুপালন অনুষদের পারমানেন্ট আর্টিস্ট প্রদীপদা গজল গাইতে গাইতে কেটে ছেটে একটি ছোটো বাছুরের আকার দিলেন। তারপর পাথরের গরুটিকে কাউশেডে স্থাপন করা হল। উদ্বোধন করতে এলেন স্বয়ং পর্ণ থেকে ধর্মষাড় হোমো এরশাদ। লালসালু কাপড় ধীরে ধীরে টেনে দুধপাথর গরুটিকে অবমুক্ত করলেন। ভিসি স্যার একটি ঝকঝকে পাত্র থেকে গরুটির মুখে সদ্য দোয়ানো ফেনাযুক্ত দুধ ঢেলে দিলেন। আমরা গভীর বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম, দুধপাথর গরুটি দুধটুকু চুকচুক করে পান করছে। আর সত্যি সত্যি কাউশেডের গরুগুলি হাম্বা হাম্বা করে উল্লাস করছে। গরুদের জন্য এটা ছিল পরম সম্মানের। ব্রিগেডিয়ার সাহেব এই উপলক্ষ্যে দুটো ফাঁকা আওয়াজ করলেন।

দুধপাথর গরুটির লম্বা লেজ। ঘাড়ে গর্দানে মোটা সোটা। চোখ দেখে চেনা যায়—ইনি পূর্বে মনুষ্য ছিলেন।
ভিসি স্যারের সঙ্গে টেলিভিশনের শাইখ সিরাজ এসেছিলেন। ক্যামেরা অন করে কৌতুহল ভরে ধ্যাড়ধ্যাড়ে গলায় জানতে চাইলেন, ও গরু তোমার নাম কি?
--গাভী হল জালালুদ্দিন।
--গ্যাব্রিয়েল জালালুদ্দিন?
--হ্যাও কইতে পারেন—অসুবিধা নাই। আম্রিকার খ্রীস্টান খ্রীস্টান লাগছে।

শাইখ সিরাজের ক্যামেরা প্যান করে এরশাদের হাসি হাসি মুখের দিকে ধরা হয়েছে। পর্ণরাজ এরশাদ তখন ফুলের বনে একদল মেয়েদের সঙ্গে ড্যান্সো করছেন। আসে পাশে ছাত্ররা নাই। তাদের বহুদিন আগেই ক্যাম্পাস থেকে বিদায় করা হয়েছে। চারিদিকে কড়া আর্মি পাহারা । গান হচ্ছে—হাওয়ামে উড়তা যায়ে,মেরে লাল দুপাট্টা মল মল…। গানটির সঙ্গে সঙ্গে একুশটি মেয়ে তাদের অঙ্গ থেকে একুশটি লাল দুপাট্টা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। ভাসতে ভাসতে লাল দুপাট্টাগুলো ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে শ্যামগঞ্জের দিকে চলে গেল।

শাইখ সিরাজ বলছেন, আপনে মুহাম্মদ জালালউদ্দিন থেইকা গ্যাব্রিয়েল জালাল হলেন কি প্রকারে?
গ্যাব্রিয়েল জালাল লম্বা একটা হাই ছাড়ল। তার ঘুম পাচ্ছে। বলল, দেখখেন, এই লুলা পর্নরাজ এরশাইদদ্যা যখন আর্মি শাসন দিছে তখন কিছু কই নাই। ছাত্র মারছে কখনো কিছু কই নাই। দ্যাশটারে লুইটা পাইট্যা খাইছে আমি তখনো কিছু কই নাই। মাইয়া লইয়া লুলাগিরি করছে তখনো কিছু কই নাই। সংবিধান বদলাইছে কখনো কিছু নাই। রাজাকার মন্ত্রী বানাইছে তখনো কিছু কই নাই। ইচ্ছা করলে সবই ফেরত আনন যাইবে। কিন্তু যখন থেইক্যা এই বদের বদ ভণ্ড লুল পুরুষ রাষ্ট্রে একটা ধর্ম দিল তখন থেইকা আর মানুষ থাকবার মঞ্চাইল না। সত্যি সত্যি গাইগরু হৈয়া গেছি। নাম দিছি—গাভি-হল-জালালুদ্দিন। মাইনসে কইতে কইতে গ্যাভি-হলকে বানাইছে গ্যাব্রিয়েল। কনতো দেখি—আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া রহমান, এরশাদদ্যা—মায় এইসব উত্তর পাড়ার হারামজাদারা কি আমগো কুনোকালে গরুগাভী ছাড়া মানুষ মনে করছে?

আমাদের থ্রি নট থ্রি আর টেকে নাই। প্রভু জুলহাস উদ্দিন মন খারাপ করে হারিকেনটি রেখে কি এক এনজিওতে ঢুকে গেলেন। আমি বরিশালের এক গ্রামে। শুধু শুনতে পাই—কাউশেডের প্রকৃত বাসিন্দা গ্যাব্রিয়েল জালাল এমএস করেছে। প্রভু জুলহাস ভাইয়ের হারিকেনটি জ্বালিয়ে সফলভাবে পিএইচডিও করছে। ভিসি স্যার তার জন্য একটা সোনার মেডেল বানিয়েছেন। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল জালালউদ্দিন কাউশেডের মরাধরা গরুদলের সঙ্গে গভীরভাবে ঘুমিয়ে থাকায় মেডেলটি গলায় পড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন না।

মশাগণ ভ্যান ভ্যান করে তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। কয়েকটা শিয়াল লেজ উঁচিয়ে পাহারা দিচ্ছে। কাউশেডের গরুগুলো তারপাশে শুয়ে শুয়ে চক্ষুমুদে জাবর কাটছে। খোড়া ল্যাংড়া ঘোড়া বাহাদুর আরেকটু বুড়ো হয়ে পড়েছে। থুতনি মাঝে মাঝে নিচের দিকে ঝুলে যায়। কেশর ঝরে গেছে। টাকু টাকু দেখায়। গ্যাব্রিয়েল জালালুদ্দিন ঘুমিয়ে আছে বলে তার আর কোনো খবর জানা যায় না।
পাশে সরোবর। পাড়ে ইউক্যালিপটাস। পাতা শিরশির করে নড়ে। কয়েকটা পাখি বসে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা যায় দুধপাথরের বাছুরটি পূর্ণ গরুর আকার নিচ্ছে। গলায় ঝুলছে সোনার মেডেল। সেখানে বড়ো করে লেখা—বাসনা পূরণে দুগ্ধ ঢালুন। খুব জাগ্রত গরু। হাম্বা।

গ্রেসিয়াস। গ্রেসিয়াস। ধন্যবাদ। ধন্যবাদ হে ভাই সগোল।

7
আপনার মূল্যায়ন: আপনি মূল্যায়ন করেন নি। গড় রেটিং: 7 (২ জন মূল্যায়ন করেছেন)
শেয়ার করুন » Facebook Twitter Delicious Digg MySpace Google Orkut Blogger Google Buzz Technorati
অথবা এই সংক্ষিপ্ত লিংক শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০১৫৬(১)    

শেষটাও অনেক ধারালো, অনেক অনেক ধারালো লেখা। শুভেচ্ছা জানবেন :)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০১৭৩(২)    

অনেক সুন্দর।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০১৭৭(৩)    

অনেক সময় নিয়ে পড়লাম। কুলদা রায়ের এই অমূল্য রচনায় কোন মন্তব্য করার মত ভাষা আমার জানা নেই।
আবারও পড়বো সময় পেলেই, কিছু বলবার মত কথা যদি জোটে এই আশা নিয়ে।
শুভেচ্ছা ভাই কুলদা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০১৮২(৪)    

মুগ্ধ বিশ্ময়ে এক নিশ্বাসে লেখাটা পড়ে ফেললাম। কামে লাগলো না। কোন স্যার পড়া ধরলেন না। তারা আজকে ভারতীয় সিনেমার আগ্রাসন ঠ্যাকাইতে মিছিল নিয়া পল্টনে গ্যাছেন।আর পল্টনের সৈন্যসগল পকেটের এলেম বুঝে কেউ লাল রং কেউ নীল রং কিনে নিজেরাই সেই লালনীল রঙে নিজেদের রাঙ্গাইছেন। তারপর আপোষে যুদ্ধ করতে আছেন। আমারে পড়া ধরবো এতো সময় কই? তাই মন খারাপ করে এই অদ্ভুত ভুতুড়ে রচনাখানা আবার পড়লাম। এই অবসরে বাসনা চাগিয়ে উঠলো। বাসনা দেহমন না রাঙ্গাইয়া বসন রাঙাইলো। ভালোই হইলো, বিপদ দেখলে রাঙা বসনখানা খুইলা বিপদগ্রস্থ ট্রাফিকরে পথ দেখানো যাইবে। আর ঢাকা শহরের ট্রাফিকের যে অবস্থা- অচলঅনড়- দুধপাথরটির চেয়েও। তাহাদিগের জন্যে একটা পথ প্রদর্শক বিশেষ প্রয়োজন...(
কুলদা'দা, অনুকরণের ধৃষ্টতায় কুপিত হইবেন না- আশা আছে।)

কুলদা রায়, প্রভূ কৃপায় আপনার স্যাটায়ারের ক্ষমতা, হিউমার নিয়ে অধিক বলা বাতুলতা। শুধু এইটুকু বলি, বাংলা ভাষায় রস রচনার নামে বহু কাগজ ও কালির অপব্যায় হইছে, যা পোলাপাইনের অংক কষার কামে লাগলে এতোদিনে কবেই আরো দুইচারদশটা আর্যভট্ট এই বঙ্গে হইয়া উঠিত আর কাগজের অভাবে প্রভু জুলহাসউদ্দিনরে মনে মনে আক কষতে হতো না। সৈয়দ (মুজতবা) সাহেবের পরে রস রচনায় সুক্ষতা ও পরিমিতি বোধের দেখা মেলে না। আর ভাড়ামো ও রস রচনার পার্থক্য এই সময়ে রচিত যে কোন লেখা কে আপনার এই লেখার পাশে দাড় করিয়ে দিলে বেশ মোটা দাগেই বোঝা যাবে। এইটা আপনার উপরে বর্ষিত প্রভুর এই অসীম কৃপা।

(পাঠক, আমার উচ্ছাসরে ছ্যাবলামো মনে হইলে ক্ষমা করবেন।)

শুভকামনা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০২২৪(৫)    

অসাধারণ ভাল লেখা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০২৮২(৬)    

অসাধারণ।
এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেলাম।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০০৮০৫(৭)    
লেখকের মন্তব্য

ধন্যবাদ সকলকে পড়ার জন্য।
আমার বন্ধু জালালুদ্দিনের সন্ধান ২০ বছর পরে পাওয়া গেছে। এখনো সেই একই ভাবে আছে। নো চাকরী। নো বিয়ে। জালালের বড় ভাইটিও বিয়ে করেনি জালালকে দেখে। ওদের ধারণা বিয়ে করে পাথরের জন্ম দিয়ে লাভ কি।

 

মন্তব্য করুন

এই তথ্যটি সর্বদাই গোপন রাখা হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ছবি যাচাই
আপাতত: শুধু মানুষদের জন্যই আমাদের দুয়ার খোলা। পরে নাহয় রবোট, বায়োবট বা এন্ড্রয়েডদের কথা বিবেচনা করা যাবে।
7 + 4 =
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করুন এবং সঠিক উত্তরটি উপরের ঘরে লিখুন। যেমনঃ ১+৩ এর জন্য লিখুন ৪।