কুলদা রায়-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আমার এক বন্ধু আসাদুল আমিন যাদেরকে চেনা দরকার এই শিরোণামে একটি সিরিজ লিখেছিল। সেটা শেয়ার করছি--
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে ঢাকা শহরে পাক বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। আক্রমণ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে। হত্যা করা অসংখ্য ছাত্রকে- হত্যা করা হয় শিক্ষকদের। এ সময় ডঃ সাজ্জাদ সাজ্জাদ হোসাইন ছিলেন রাজশাহী বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ১.হামিদুল হক চৌধুরী : মালিক অবজারভার গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স ২.মাহমুদ আলী : ৪.বিচারপতি নুরুল ইসলাম : বাংলাদেশের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি, ৫. ডঃ কাজি দীন মুহাম্মদ : অধ্যাপক বাংলাবিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
জুন মাসে তাকে পাঠানো হয় লন্ডনে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালাতে। তিনি লন্ডনে প্রচারণা চালান – পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা সর্ম্পর্ণ স্বাভাবিক। কোথাও কোনো গোলমাল নেই। যে সব শিক্ষকদের হত্যা করা হয়েছে বলা হচ্ছে- তা ডাহা মিথ্যে কথা। তারা জীবিত। তিনি বলেন, পাক আর্মি ভারতীয় ব্রাহ্মন্যবাদি চক্রান্তকে রুখে দিয়েছে মাত্র। ইয়াহিয়া খান আসলে একজন ত্রাতা। তিনি ভাল লোকদের পরিত্রাণ করতে এসেছেন। আর দুষ্কৃতি কাফেরদের বিনাস ও ধর্ম সংস্থাপনির জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। আল্লাহর দোয়ায় ইয়াহিয়ার তৎপরতায় পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে।
তিনি লন্ডন টাইমস পত্রিকায় পাকিস্তানের দালালি করে একটি পত্রও লেখেন। সাজ্জাদ হোসেন লন্ডন থেকে পাকিস্তানী দূতাবাসকে একটি বিল ধরিয়ে দেন। তাতে দাবী করেন, ২৪ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত এই যে এক সপ্তাহ পর্যন্ত পাকিস্তানের পক্ষে এত সব প্রচার করলেন এর জন্য হোটেলের বিল বাবদ তাকে দৈনিক প্রাপ্য ৩ পাউন্ড ৭৫ পেনি করে ডিএ এবং ১৫০ পাউন্ড যেন নগদ দেওয়া হয়। টিক্কা খান কতৃক গঠিত প্রাদেশিক শিক্ষা সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ সাজ্জাদ হোসাইন। উদ্দেশ্য সিলেবাসকে ইসলামীকরণ করা।
১৯ জুলাই তিনি পাকিস্তান আর্মির কনভয়ে করে রাজশাহী থেকে ঢাকা আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। তাকে সহায়তা করেন ড. হাসান জামান, ড. মেহের আলি। স্বাধীনতার পর তিনজনই গ্রেফতার হন।
এ সময়ে তিনি বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম নেতৃত্ব দেন।
বুদ্ধিজীবীদের তখন হুশিয়ার করে চিঠি পাঠানো হত-
শয়তান
ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের পা-চাটা কুকুর আর ভারতীয়রা ইন্দিরার দালাল নানা ছুতো-নাতায় মুসলমানদের বৃহত্তম আবাসভূমি পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে তুমি তাদের অন্যতম। তোমার মনোভাব, চালচলন ও কাজকর্ম কোনোটাই আমাদের অজানা নেই। তুসি অবিলম্বে হুঁশিয়ার হও এবং ভারতের পদলেহন থেকে বিরত হও। না হলে তোমার নিঁস্তার নেই। এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে নির্মূল হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।
-শনি
আরেক সুবিধাবাদি বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আলী আহসান তার একই সঙ্গে খালাতো ও চাচাতো ভাই। মাগুরার আলোকদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালে। তিনি ছিলেন পাকিস্তানী আদর্শের খাদেম। তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি এই আদর্শ লালন করতেন। তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত মনে করতেন, আবার পাকিস্তান ফিরে আসবে। বাংলাদেশ টিকে থাকবে না। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে দুঃখ করে বলেছিলেন, দেশের মানুষদের ভারতের দালালদের থাবার মুখে রেখে মরছেন। হায়!
যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. ক্লাসের ছাত্র তখনই ঢাকায় গঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠিত হয় এবং তিনি এর চেয়্যারম্যান-এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দে ইংরেজীতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এম.এ. ডিগ্রী করেন। অতপর কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে কর্মজীবনে পদার্পণ করেন। এ সময় তিনি কলকাতার ইংরেজী কমরেড পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখতেন। "কমরেড" ছিল মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের ইংরেজী ভাষার মুখপত্র স্বরূপ। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি গঠিত হয় এবং সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইনকে চেয়্যারম্যান নির্বাচন করা হয়।
১৯৭১ সালে পাক আর্মি আত্ম সমর্পন করলে গণপিটুনির শিকার হন। তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৪ সালে সৈয়দ আলী আহসান তাকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে অনুমতি যোগাড় করে। এরপর এ সৌদী আরবে শিক্ষকতা শুরু করেন। । মক্কার উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজীর অধ্যাপকের চাকুরী করতেন। আর বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করতেন গোলাম আযমের সঙ্গে। আর চাঁদা তুলতেন। সেসব টাকা পয়সা কিছু মেরে দিতেন আর বাংলাদেশ পাঠাতেন ৭১'এর পরাজিত শক্তিকে মদদ যোগাতে। বিদেশী পত্র-পত্রিকায় স্বনামে বেনামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লিখতেন। তার পাঁচটি ছদ্ম নাম ছিল।
মৃত্যুর আগে একটি অতি সাম্প্রদায়িক ইংরেজি-বাংলা ডিকশোনারীও রচনা ও সম্পাদনা করে যান। ১৯৮৫ খ্রীস্টাব্দেতখন তিনি শারীরিক অসুস্থতার জন্য মক্কা থেকে পূর্ণ অবসর নিয়ে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন এরশাদের সহায়তায়। ১৯৯৫ সালের ১২ই জানুয়ারী তিনি অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৭৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
মন্তব্য
এরা সবাই ছিলেন নামী, দামী, গুনী মানুষ! অথচ এঁদের মানসিকতা কেন যে এত নীচু ছিল? তাঁদের অনেক গুণ, তাই বলে তাদের মত গুণ যাদের ছিলনা তাদেরকে মানুষই মনে করবে না? এর চেয়ে বড় দোষ আর কীইবা হতে পারে? অহঙ্কার এদের পতন ঘটিয়েছে, এরা নিজেরাই নিজেদের জাতির কাছে ঘৃণ্য করে তুলেছে।
এই রকম আরো অনেক চোরা চোহারার লোক এখনো আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। এদেরও বিচার দরকার।
৯ মাস সরকারী চাকুরী করে গেছে আরামসে, এখন বলে সে নাকি মুক্তিযোদ্বা, সার্টিফিকেটো যোগাড় করে ফেলেছে।
লজ্জার কথা।
সৈয়দ আলী আহসান সাহেব বলেছেন ,"শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে দুঃখ করে বলেছিলেন, দেশের মানুষদের ভারতের দালালদের থাবার মুখে রেখে মরছেন। হায়!"
আমার মনে হয় তিনি একটুও ভুল অনুমান করে এমন কথা বলেন নি । তার প্রমাণ আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি ।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী,স্বরাষ্টমন্ত্রী, পররাষ্টমন্ত্রীরা যখন আমাদেরকে ভারতের চাপোষা কুকুর বানাতে মত্ত ! যেখানে আমাদের মৃত্যু'টা হয় সমাজপতিদের হাসির উপকরণ ! যখন আমার বোনদের ঝুলন্ত লাশ দেখে আমার বুক ফাটা আর্তনাদ তখন আমার আর্তনাদে হায়নার উল্লাসে সুর বাজে ! যখন আমার ভাইয়ের লাশ সামনে নিয়ে পতাকা হাতে দ্বিপক্ষীয় হাসির মহড়া চলে !
সেখানে কুৎসিত হায়নার সামনে আমাদের রেখে যাওয়ার যে আফসোসের কথা আহসান সাহেব বলে গেছেন, তা কি একটুও বেমানান??
আমরা ৪০ বছর আগের ইতিহাস পড়ছি , বিকৃত অথবা স্বিকৃত, সত্যায়িত ইতিহাসের ঝুড়ি হাতড়ে বেড়াচ্ছি । এখানে শাসক বদলায় তো ইতিহাস বদলায় । আমরা সেই বদলাবদলির ইতিহাসের বাহক হচ্ছি !! তবে আসলে বলতে গেলে কি আজকে যা ঘটছে তা আগামিতে ইতিহাসের খাতায় লিখা হবে । এটাই সত্য ।আর সেটাও আমাদের আগামী ৪০ বছর পরের ইতিহাস রচনা করবে । হয়তো আরেকটা যুদ্ব হবে । হয়তো আমরা আরেকটা ইতিহাসের রচনা করব !! তখন আপনার কাছে কি মনে হয় ? আমাদের আরও ৪০ বছর পরে আজকের এই সময় ইতিহাসে কি সাক্ষ্য দিবে ?? তখনকার "এদেরকে ছিনে রাখুন" বা " যাদেরকে চেনা দরকার " লেখাগুলো কাদেরকে নিয়ে হবে ?
তখন হয়তো পরম আফসোসের সাথে আমারাও নিজেদেরকে অভিশাপ দেব । মরতে মরতে হয়তো নিজেই নিজেকে জিগ্যেস করব,,,,,,
আমার এই বাংলামায়ের মাতৃত্ব ভুল ছিল, না আমাদের জম্ন ভুল ছিল ? নাকি এই আলী আহসানেরা ভুল ছিল ???
আপনার বেশ কিছু বানান ভুল ছিল
মন্তব্য করুন