নুশেরা-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

দীর্ঘ পোস্ট। অটিজম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতার অংশটি অন্তত পাঠ করার অনুরোধ রইলো।
||১||
আচরণগত অস্বাভাবিকতা থেকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার
আমরা যাদের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিনি, দিনের শুরুতে ঘুম ভাঙা থেকে দিনশেষে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত তাদের সকলের দৈনন্দিন আচরণ কি একইরকম? কখনোই না। কারণ মন-মানসিকতা, চিন্তাশক্তি, সাড়াপ্রবণতা (রিফ্লেক্স), যুক্তিবুদ্ধির স্তর-- ব্যক্তিভেদে এসবের হেরফের ঘটে। তাই আমাদের কাজকর্ম ও আচার-ব্যবহারেও কিছুটা ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক।
খুব সাধারণ কিছু উদাহরণ দিই। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন ছবি তুলতে গেলে অস্বস্তিতে ভোগেন, স্বাভাবিক মুখভঙ্গিটা ধরে রাখতে কষ্ট হয়, যাদেরকে আমরা বলি ক্যামেরা-শাই। অ্যাকাডেমিক ও পেশাগতভাবে অত্যন্ত সফল কারো হয়তো জমায়েতে অনেকের সামনে কথা বলতে বা বক্তৃতা দিতে গলা বুজে আসে, হাত-পা কাঁপে। আমাদের শিক্ষকদেরও কেউ কেউ আছেন বহু বছর শিক্ষকতা করার পরও ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে লেকচার দিতে পারেননা। ভীড়ের মধ্যে পূর্ব-পরিচিত কাউকে দেখলে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করলেও পারেন না কেউ কেউ। অদ্ভুত কিছু ভীতি বা ফোবিয়া আছে কারো কারো। ছোটবেলার স্কুলজীবনের কথা ভাবুন তো। স্পোর্টসের মাঠে হুইসেল শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে ছিটকে বেরুতে পারে না, দৌড়ের শুরুতেই কেউ কেউ দেরী করে ফেলে। ক্লাসে সবার পেন্সিল বা কলম ধরার ভঙ্গি একরকম না; অল্পতেই হাত ব্যথা হয়ে যায় কারো কারো, তরতরিয়ে পাতার পর পাতা লিখতে পারেনা সবাই। দৈনন্দিন জীবনে খুঁটিনাটি সূক্ষ্ম কাজে সবার হাত-আঙ্গুল সমান পারদর্শী না; ছোট সরু স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে স্ক্রু বসানো বা খোলার কাজটি একাধিকবার চেষ্টার পর তবেই ঠিকভাবে করতে পারেন, এমন আছেন অনেকেই। সহজ কোন কথা সহজে প্রকাশ করতে বা বোঝাতে ঠিক স্বচ্ছন্দ নন কেউ কেউ। পরিস্থিতি অনুযায়ী আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খান কেউ কেউ। এইসব ছোটখাট অসঙ্গতি বা স্বল্পমাত্রার অক্ষমতাকে সাধারণ ধারণায় আমরা স্বাভাবিক বলেই ধরেই নিই। অর্থাৎ পরম স্বাভাবিক আচরণ থেকে কিছুটা বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য।
কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এইসব অস্বাভাবিকতার এক বা একাধিক রূপ একই ব্যক্তির মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে প্রকটভাবে দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, আলোচ্যক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম/আচরণ থেকে উচ্চমাত্রার বিচ্যুতির জন্য দায়ী disability বা অক্ষমতাগুলো "প্রকাশ্য" নয়। যেমন, দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও দৃষ্টি-সংযোগ বা আই কন্ট্যাক্টে অক্ষমতা। কিংবা বাকশক্তি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও কোন কথা স্বচ্ছন্দে বুঝিয়ে বলতে না পারা। এই hidden disability কোন সুনির্দিষ্ট অক্ষমতা নয়; এর সীমা বা আওতা (range) বিশাল; যা বোঝাতে ASD (Autism Spectrum Disorder) টার্মটি ব্যবহার করা হয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক ও আচরণগত সীমাবদ্ধতার বিশেষ কিছু লক্ষণের সামষ্টিক নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (ASD)। কথাবার্তায় পিছিয়ে থাকা, আত্মমগ্ন থাকা, অসংলগ্ন আচরণ করা- অটিজমের কিছু সাধারণ লক্ষণ যেগুলো শিশুর ২/৩ বছর বয়স থেকে দেখা দিতে পারে।
সাধারণভাবে তিন ধরণের ডিজঅর্ডারকে ASD বলা হয়, এগুলো হলো--
১. অটিজম (Autism),
২. অ্যাসপারগার সিনড্রোম (Asperger Syndrome),
৩. PDDNOS (Pervasive developmental disorder not otherwise specified; আগের দুটো গ্রুপে পড়ে না এমন বিকাশগত সমস্যা)।
শারীরবৃত্তীয় রোগব্যাধি আর ASD আলাদা বিষয়। ম্যালেরিয়া বা পক্সের মতো রোগের উপসর্গ আমরা জানি; অন্য কোন জটিলতা না থাকলে সাধারণত যেকোন রোগীর দেহে এধরণের কোন রোগের প্রভাব মোটামুটিভাবে একই। কিন্তু ASD'র প্রভাব সম্পর্কে সবার জন্য অভিন্নভাবে প্রযোজ্য কিছু বলা কঠিন। অর্থাৎ অটিজম আছে এমন ব্যক্তি বা শিশুদের সবার বৈশিষ্ট্য বা সমস্যা যে একইরকম হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদেরই অধিকহারে ASD আক্রান্ত হতে দেখা যায়। অটিজমের ক্ষেত্রে মেয়ে ও ছেলে শিশুর অনুপাত ১:৪ এবং অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে ১:৫। খুব অল্পবয়সেই, ধারণা করা হয় জন্মের সময় থেকেই, ASD'র কারণে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় দেড় থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যেই। শিশুর বিকাশের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে, ASD যেগুলোতে প্রভাব ফেলে (প্রভাবের ধরণ সংক্ষেপে ব্র্যাকেটে দেয়া হলো)--
১. সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া বা Social interaction-এর ক্ষেত্রে প্রভাব (অন্য কোন ব্যক্তির প্রতি আগ্রহের অভাব বোধ করা। কে কী করছে তা নিয়ে আগ্রহ বা কৌতূহল না থাকা। অন্যদের আচরণ বুঝতে না পারা। বন্ধু হতে বা পেতে অনিচ্ছুক থাকা।)
২. যোগাযোগ বা Communication-এর ক্ষেত্রে প্রভাব (কথা না শেখা। সীমিত শব্দভান্ডার ব্যবহার করে কোনমতে কথা বলা। কথা বলতে পারলেও আলাপচারিতা বা conversation এ সমর্থ না হওয়া।)
৩. আচরণ বা Behaviour-এর ক্ষেত্রে প্রভাব (পুনরাবৃত্ত আচরণ অর্থাৎ একই কাজ বারবার করা। নিজস্ব রুটিন অনুযায়ী কাজ বা আচরণে অভ্যস্ততা এবং এতে অনমনীয় থাকা।)
এবার দেখা যাক, ASD'র তিন গ্রুপের কোনটিতে শিশুর বিকাশের এই ক্ষেত্রগুলো কীভাবে প্রভাবিত হয়।
অটিজম আক্রান্ত শিশুর বিকাশ উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয়। এদের অনেকে কথা শিখতে পারেনা বা কথা শেখা বিলম্বিত হয় (এখানে কথা শেখা আর কথা বলার মধ্যেকার পার্থক্যটি লক্ষ্যনীয়। বাকযন্ত্রের গঠন বা অনুরূপ কারণে শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য কথা বলতে না পারা ভিন্ন বিষয়। বাকযন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি যেমন কণ্ঠনালী, জিভ বা তালুতে কোন সমস্যা নেই, ধ্বনির উচ্চারণে অসুবিধা নেই, শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা হয়, তারপরও শিশু কথা না বললে বুঝতে হবে তার শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। আবার কোন কোন শিশু অবশ্য কথা বলতে পারলেও খেলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সময় কথা বলতে ইচ্ছুক থাকে না; মুখ বা শরীরের অঙ্গভঙ্গি অর্থাৎ বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে নিজের চাহিদা বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে; এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে না)। বেশীরভাগ অটিস্টিক শিশুর intellectual disability বা বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকে। ২০-৩০% অটিস্টিক শিশুর এই অক্ষমতা থাকেনা; যাদের অটিজমকে high-functioning autism বা অ্যাসপারগার সিনড্রোম বলা হয়।
অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের সাধারণত: বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকেনা। কখনো থাকলেও সেটা খুবই স্বল্পমাত্রার হয়ে থাকে। কথা শেখার বিচারে তারা তেমন পিছিয়ে নেই। তাদের মূল সমস্যা এই কথাগুলোকে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা নিয়ে। যেমন অন্য কারো সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নিতে তাদের সমস্যা হয়। কাউকে প্রশ্ন করা, অন্যের প্রশ্নের উত্তর দেয়া, বা কারও কথায় প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অক্ষমতার জন্য তারা প্রায়ই অমিশুক ও নিভৃতচারী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
PDDNOS আক্রান্ত শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। বিকাশের তিনটি ক্ষেত্রেই তাদের সমস্যা হতে পারে; কিন্তু এই সমস্যার মাত্রা এতটা প্রকট নয় যে অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোমের আওতায় পড়তে পারে।
ASD'র মাত্রা নিরূপণ:
এমন কোন সহজ একক "টেস্ট" নেই যা দিয়ে ASD'র প্রভাব বা মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব। এজন্য জন্ম থেকে শিশুর বেড়ে ওঠা পর্যালোচনা করা হয় এবং তার ভাষাগত দক্ষতা ও বুদ্ধিস্তর যাচাই করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেশ-পরিস্থিতি-অবস্থা তৈরি করে তার আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটা আসলে বিভিন্ন সম্পর্কিত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন অনেকগুলো যাচাই-প্রক্রিয়া বা অ্যাসেসমেন্টের সমষ্টি; এবং এই যাচাই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।
||২||
ASD তথা অটিজম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতা
ভ্রান্ত ধারণা ১: ASD একটি মানসিক রোগ; এটা আচরণগত, আবেগঅনুভূতিগত, অথবা মানসিক স্বাস্থ্যঘটিত ডিজঅর্ডার। এখানে শারীরিক কোন সমস্যা সম্পৃক্ত নয়। বাস্তবতা: অটিজমের সঙ্গে বিকাশগত অক্ষমতা ও নিউরো-বায়োলজিকাল ডিজঅর্ডার জড়িত। জন্মের তিন বছরের মধ্যেই এটা প্রকাশ পায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি আজীবন এই অক্ষমতার সমস্যায় ভোগে।
ভ্রান্ত ধারণা ২: অটিস্টিকদের সবার সমস্যাই একরকম। বাস্তবতা: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিদের লক্ষণ ও উপসর্গের মাত্রা বিচিত্র। একজনের সঙ্গে আরেকজনের হুবহু মিল নেই। কেউ সবাক; বাকশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেউ কথা বলেনা। কারও আচরণ অ্যাগ্রেসিভ, কেউ অতিরিক্ত গুটিয়ে-থাকা স্বভাবের। Spectrum Disorder কথাটি অটিজমের বিশাল আওতার বৈশিষ্ট্য বোঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়।
ভ্রান্ত ধারণা ৩: পিতামাতার দুর্বল অভিভাবকত্ব সন্তানের অটিজমের জন্য দায়ী। বাস্তবতা: এই ধারণাটি অজ্ঞতাপ্রসূত এবং সম্পূর্ণ ভুল। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত অজানা; বা সুপ্রমাণিত নয়। অনিরূপিত অটিজমের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ না নেয়া হলে অবস্থার উন্নতি পিছিয়ে যায়; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জন্ম-পরবর্তী সময়কার weak parenting শিশুর অটিজমের জন্য দায়ী ছিল।
ভ্রান্ত ধারণা ৪: অটিজম নিরাময়যোগ্য, চিকিৎসা করালে অটিস্টিক ব্যক্তি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। এই ধারণার পিছনে মূলত: দায়ী হল নন-মেডিকেল সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্বদের প্রচারণা (জেনি ম্যাকার্থি, অপরাহ্ উইনফ্রে প্রমুখ)। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং অতিনিবিড় ইনটারভেনশন ও থেরাপির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্যতার এই প্রচারণার সঙ্গে চিকিৎসক-গবেষকরা এখনও একমত হননি।
ভ্রান্ত ধারণা ৫: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী। বাস্তবতা: অটিস্টিকদের কেউ কেউ হয়তো বিশেষ পরিস্থিতিতে খুব ভাল আইকিউ স্কোর করতে পারে অথবা বিশেষ কোন কাজে দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু এটা নিছকই ব্যতিক্রমী ঘটনা। সাধারণ অটিস্টিক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য মিডিয়ায়, চলচ্চিত্রে বা সাহিত্যে সমাদৃত হবার মতো আকর্ষণীয় কিছু নয়। বিশেষ কোন দক্ষতার অধিকারী অটিস্টিককে নিয়ে লিখিত উপন্যাস পড়ে, কিংবা তাকে নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি বা চলচ্চিত্র দেখে অনেকে ধারণা করে নেন ASD আক্রান্ত সবারই বিশেষ কোন প্রতিভা থাকে (যেমন গণিতে ভাল হওয়া)। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র রেইনম্যানে ডাস্টিন হফম্যানের চরিত্র, অথবা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের অটিজম থাকার গল্প অনেকেই জানেন এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে ভালবাসেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমেরিকায় শিশুদের প্রতি ১৫০ জন একজন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬০ জনে একজন শিশু অটিজম আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই গণিত-প্রতিভা বা অন্য কোন ক্ষেত্রে জিনিয়াস হওয়া দূরে থাক, খুব সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের উপর নির্ভরশীল।
ভ্রান্ত ধারণা ৬: ASD আক্রান্ত শিশুদের সবারই কোনকিছু শিখতে সমস্যা হয়। বাস্তবতা: ASD আক্রান্তদের মধ্যে কারো কারো কোন কিছু বুঝতে পারার ও শেখার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা থাকে। কিন্তু কেউ কেউ, বিশেষত অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্তদের অনেকেই, গণিতের মতো বিষয়ে মূলধারার শিশুদের মতোই দক্ষতা অর্জন করতে পারে। (স্মরণ করা যেতে পারে, অটিস্টিকদের ২০-৩০% অ্যাসপারগার সিন্ড্রোমে ভোগে)।
ভ্রান্ত ধারণা ৭: শিশুবয়সে নেয়া টিকা ASD-এর জন্য দায়ী। বাস্তবতা: '৯০এর দশকে এই ধারণাটি খুব প্রচার পেয়েছিল। টিকার সংরক্ষণে ব্যবহৃত উপাদানে থাকা মার্কারি বা পারদ এজন্য দায়ী-- এমন কিছু গবেষণাও করা হয়। তবে ২০০১-২০০২-এ ব্যাপক আকারে হওয়া গবেষণার ফলাফল এই অনুমানকে নস্যাত করে দেয়।
ভ্রান্ত ধারণা ৮: ASD আক্রান্তদের জন্য বিশেষ ধরণের খাবার প্রয়োজন। বাস্তবতা: এটা সত্য যে অটিস্টিকদের অনেকেই দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার, গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার ইত্যাদির প্রতি অ্যালার্জিক। চিনি ও ফুড এসিডের পরিমাণ বেশী, এমন খাবারও কারও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে (উত্তেজনাবৃদ্ধি, খিটখিটে মেজাজ)। তবে এসব উদাহরণ কোন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নয়।
ভ্রান্ত ধারণা ৯: এটা একটা সাময়িক সমস্যা; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেরে যাবে। কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার দরকার নেই। বাস্তবতা: অটিস্টিক শিশুর সমস্যাগুলো কখনোই পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, যেটা করা যাবে তা হলো নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে তার ঘাটতি কমিয়ে আনা। মৃদু মাত্রার অটিজম, যেমন অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা, সমর্থন ও শিক্ষা পেলে পরিণত বয়সে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব। উচ্চমাত্রার অটিজমের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সেও অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনোই স্বনির্ভর দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্ভব নয়।
ভ্রান্ত ধারণা ১০: একই পরিবারে অটিজম থাকার ঘটনা একবারের বেশী ঘটেনা। বাস্তবতা: যদিও অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ এখনও সুপ্রমাণিত নয়; তারপরও জেনেটিক ডিজঅর্ডার অটিজমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে একই পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে একাধিকজনের এবং যমজ সন্তানদের উভয়ের অটিস্টিক হবার প্রবণতা দেখা গেছে।
ভ্রান্ত ধারণা ১১: অটিস্টিকদের সংখ্যা বাড়ছে না, আগেও একই হারে ছিল; এখন ডায়াগনোসিসের সুযোগ বেশী তাই সংখ্যা বেশী মনে হচ্ছে। বাস্তবতা: ইউএসএ'তে ষাটের দশকে প্রথম অটিস্টিক শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তবে তখন একে অব্যাখ্যায়িত অক্ষমতা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ১৯৯১ সাল থেকে special education exceptionality হিসেবে অটিজমকে অন্যান্য শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার বাইরে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটা fastest-growing developmental disability এবং বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১০-১৭% (অটিজম সোসাইটি অফ অ্যামেরিকা'র ২০০৬ সালের তথ্যানুযায়ী)। পৃথিবীতে মাত্র চারটি দেশে অটিস্টিকদের সংখ্যার হিসাব রাখার ব্যবস্থা আছে (ইউএসএ, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়; তাও সর্বত্র অপেক্ষাকৃত মৃদু মাত্রার অ্যাসপারগার সিনড্রোম ও PDDNOS কে হিসেবের মধ্যে ধরা হয়না। এইসব দেশের হারকে ব্যবহার করে অন্যান্য দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে অটিস্টিকদের অনুমিত সংখ্যা হিসাব করা হয়। এটা নিছক ঐকিক নিয়মে ফেলে অংক করার মতো হিসাব; যেমন ধরা যাক, অমুক দেশে তিন কোটি লোকের মধ্যে এক লাখ অটিস্টিক; কাজেই বাংলাদেশের পনের কোটির মধ্যে পাঁচলাখের অটিজম আছে। বোঝাই যাচ্ছে এ থেকে সঠিক পরিসংখ্যান পাবার নিশ্চয়তা নেই)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশের কোথাও কোথাও অটিস্টিকদের সংখ্যা ৫০০%-১০০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হার নিঃসন্দেহে আতঙ্কজনক। স্থানবিশেষে অটিস্টিকদের সংখ্যাবৃদ্ধির অস্বাভাবিক উচ্চহারের কারণ হিসেবে পরিসংখ্যানিক প্রক্রিয়ার আওতার পুনঃনির্ধারণকে হয়তো দায়ী করা যেতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হল এই হার সত্যিই বাড়ছে।
ভ্রান্ত ধারণা ১২: শিশুর কথা বলতে দেরী হলে বুঝতে হবে তার অটিজম আছে। বাস্তবতা: কথা বলার পাশাপাশি আরেকটি ব্যাপার আছে; "আলাপচারিতা"য় অংশ নিতে পারা। কথা বলতে দেরী হলেও এই কাজটা বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়েও অনেক শিশুই করতে পারে। দুই বছর বা তারও কম বয়স থেকেই মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে, হাত নেড়ে, কাঁধ ঝাঁকানোর ভঙ্গিতে অনেক কিছু বোঝাতে পারে মূলধারার শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু যখন সবে কথা বলতে শুরু করে, ততদিনে তার ভান্ডারে অন্তত একশ' শব্দ জমা হয়ে যায়, যেগুলো অন্য কেউ বললে সে একটা সম্পর্কসূত্র পেয়ে যায়। কাজেই শিশু যদি মিশুক হয়, কেউ ডাকলে সাড়া দেয়, অন্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে (আই-কন্ট্যাক্ট করে) কথা শোনে বা প্রতিক্রিয়া দেখায়-- তাহলে দুশ্চিন্তার তেমন কিছূ নেই। তবে যে কোন শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো আর প্রচুর কথা বলা (শিশুকে প্রশ্ন করা, আবার তার উত্তর দিয়ে তাকে বোঝানো কীভাবে উত্তর দিতে হয়) তার মানসিক বিকাশের জন্য খুবই জরুরী।
ভ্রান্ত ধারণা ১৩: অটিজম থাকলে অন্য কোন ধরণের ডিজঅর্ডার থাকেনা। বাস্তবতা: অটিস্টিকদের ক্ষেত্রে ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, অন্ধত্ব, বধিরতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা কিংবা অন্য কোন শারীরিক সমস্যা থাকার ঘটনা অস্বাভাবিক তো নয়ই; বরং সাধারণ।
||৩||
অটিস্টিক শিশুর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য
অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের সবার ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো একরকম হয়না। কেউ কেউ মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতায় ভোগে; কারও হয়তো সেই ক্ষমতা সীমিতভাবে থাকে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুর মধ্যে খুব অল্পবয়স থেকেই (২/৩ বছর) অটিজমের কিছু বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। ২য় পর্বে জেনেছি শিশুবিকাশের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে; সেগুলোর ভিত্তিতেই উদাহরণ দেয়া যাক।
সামাজিক মিথস্ক্রিয়া
* শিশুকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া তো দেয়ই না, এমনকি চোখ ফিরিয়েও তাকায় না। সে হয়তো নামের ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনা, একেবারেই নির্লিপ্ত থাকে। অথবা ডাকের ব্যাপারটা শুনে বুঝতে পেরে যে কাজ বা খেলায় সে ব্যস্ত ছিল সেটা কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেয়; কিন্তু যে ডাকছে তার দিকে ফিরে তাকায়না।
* বাবামা বা নিয়মিতভাবে দেখা হচ্ছে এমন আপনজনদেরও চোখে চোখ রেখে তাকায়না। তার কাছে গিয়ে বা কোলে নিয়ে চেষ্টা করলেও দেখা যায়, খুব দ্রুতই সে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। eye-contact-এর অক্ষমতা অটিস্টিক শিশুর মধ্যে প্রকটভাবে দেখা যায়।
* সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মিশতে বা খেলতে চায় না। অন্য শিশুদের খেলতে দেখলে সে একপাশে সরে যায়। অন্যরা কী করছে, সেটা দেখতে বা তাদের খেলায় অংশ নিতে অনীহা বা বিরক্তি দেখায়। বেশীরভাগ অটিটিস্টিক শিশুকে ডায়াগনোসিসের আগেই পারিবারিক পরিমন্ডলে "অমিশুক" হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখা যায়।
* কোনো ধরণের আনন্দদায়ক বস্তু বা বিষয় সে অন্যদের সাথে শেয়ার করে না। সাধারণতঃ শিশুরা কোনো খেলনা হাতে পেলে সবাইকে সেটা দেখাতে চায়। কথা বলে বা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিন্তু অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এধরণের কোনো খেলনার প্রতি নিজস্ব কিছু আগ্রহ থাকলেও সেটা নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস থাকে না।
* স্বাভাবিক শিশুরা কারো কোলে চড়তে বা আদর পেতে পছন্দ করে। কিন্তু অনেক অটিস্টিক শিশু এই ব্যাপারে নিস্পৃহ থাকে। অন্য কারো সংস্পর্শে যাওয়াটা তারা তেমন পছন্দ করেনা।
যোগাযোগ
** পরিবেশ ও প্রতিবেশ এর সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা শিশুর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠার কথা। অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষমতা কমে যায়- দেখা যায় ২ থেকে ৩ বছর বয়সে স্বাভাবিক শিশুরা যেসমস্ত শব্দ উচ্চারণ করতে পারে সমবয়সী অটিস্টিক শিশুরা তা পারে না। তখন সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করে
বাবামা বিষয়টি বুঝতে পারেন।
** আবার কোনো ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশু হয়ত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে, কিন্তু একটি বাক্য শুরু করতে অস্বাভাবিক রকম দেরি হয় অথবা বাক্য শুরু করার পর তা আর শেষ করতে পারে না। এমনও হতে পারে ৩-৫ বছর বয়সেও দু'তিন শব্দের বেশী শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করতে পারেনা। নিজের প্রয়োজনের বিষয়টা উত্তম পুরুষে (ফার্স্ট পার্সোনে) না বলে নাম পুরুষে (থার্ড পার্সোনে) বলে। যেমন ‘আমি খাব’ না বলে ‘বাবু খাবে’ এভাবে বলে। বহুবার শোনা ছড়া থেকেও অল্প কিছু শব্দের বাইরে আর কিছু বলতে পারেনা। যেমন ‘তাই তাই তাই মামা বাড়ি যাই / মামী দিল দুধভাত পেট ভরে খাই / মামা এলো লাঠি নিয়ে পালাই পালাই’ এ ছড়াটাকে সে হয়তো সংক্ষেপ করে এভাবে বলে ‘তাই তাই মামা যাই দুধ খাই লাঠি পালাই’। কিংবা ‘আয় চাঁদ টিপ যা’ ইত্যাদি।
**শিশু একই শব্দ অথবা বাক্যাংশ বারবার উচ্চারণ করার প্রবণতা দেখাতে পারে। এসব শব্দ অর্থবোধক হতে পারে, নাও পারে। অটিস্টিক শিশুকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘তুমি কি দুধ খাবে?’ এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শিশু হয়তো প্রশ্নের শেষ অংশটিই আবার উচ্চারণ করে, ‘দুধ খাবে?’ শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়েই নয়, কোন আলাপচারিতায়, অথবা হঠাৎ করেই, প্রাসঙ্গিক হোক বা না হোক, একই শব্দ অথবা বাক্যাংশের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে থাকে। কেন একই কথা বার বার বলছে, কিংবা সেসব শব্দের অর্থ কী, এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শিশু একঘেঁয়ে পুনরাবৃত্তি চালিয়ে যায়। বাবা-মা মানা করলেও শোনে না, বরং বিরক্ত হয়, রেগে যায়, অথবা নিজেকে প্রকাশ করার অক্ষমতাজনিত হতাশা থেকে কাঁদতে শুরু করে।
** ৩ বছর বা তারও কম বয়সী শিশুরা তাদের বয়সোপযোগী নানা রকম খেলা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই তৈরি করে খেলে। সেভাবে কথা বলতে না পারলেও ইশারা-ঈঙ্গিত-হৈহল্লার মধ্য দিয়ে তারা লুকোচুরি বা গাড়ীর প্রতিযোগিতা বা প্লেন ওড়ানো বা লড়াই/যুদ্ধ-- এমন কল্পনাভিত্তিক খেলাধূলায় (imaginative play) মত্ত হয়। কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা এরকম করে না। পুতুল, গাড়ী, স্টাফড অ্যানিম্যাল (টেডি বেয়ার, মিকিমাউস, খরগোশ এসব) ইত্যাদি নিয়ে কল্পনাশ্রয়ী কোন খেলা (যেমন পুতুলকে খাওয়ানো, পুতুল কাঁদছে, গাড়ীটা জোরে চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলল এমন ভান করা) এরা খেলতে পারেনা।
আচরণ
*** অটিস্টিক শিশু বিশেষ ধরণের আচরণ বারবার করতে থাকে। হয়ত হাত দোলাতে থাকে বা আঙুল নাড়াতে থাকে। খেলনার বাক্স উপুড় করে খেলনা (ছোট বল বা মার্বেল) বের করে ফেলে; আবার ঢুকিয়ে রাখে। আবার বের করে, আবার ঢোকায়। এভাবে চলতে থাকে। কোন কোন শিশু ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়ে খেলতে চায়। সেক্ষেত্রে দেখা যায় লবণদানি থেকে লবণ ঢেলে বাটিতে রাখছে, আবার সেটা আগের জায়গায় নিচ্ছে। বা দুটো গ্লাস নিয়ে একটা থেকে আরেকটায় পানি ঢালাঢালি করে চলেছে। এই পুনরাবৃত্ত কাজে তারা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেয়; কয়েক ঘন্টাও চলতে পারে। যা দেখে সাধারণতঃ পরিবারের সদস্যরা বাচ্চাটিকে (ভুলবশতঃ) শান্ত স্বভাবের ভেবে স্বস্তি বোধ করেন।
*** অনেক অটিস্টিক শিশু আওয়াজ পছন্দ করে না। জোরে কথা বললে বা টিভি চালালে অস্বস্তি বোধ করে, কান্নাকাটি বা চীৎকার করে।
*** তারা রুটিন মেনে চলতে ভালোবাসে। দৈনন্দিন যে ধরণের জীবনযাপনে সে অভ্যস্ত, তার কোন ব্যতিক্রম হলে অটিস্টিক শিশুরা মন খারাপ করে, কাঁদে বা চিৎকার দিতে থাকে। বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে সে অস্বস্তিতে থাকে। রাতে ঘুমাবার আগে হাত মুখ ধুয়ে, কাপড় বদল করে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস হয়তো প্রায় সব শিশুরই থাকে কিন্তু কখনো এর ব্যত্যয় ঘটলে সাধারণ শিশুরা কিছু মনে না করলেও অটিস্টিকদের বেলায় দেখা যায় তারা কোনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
*** পারিপার্শ্বিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন তারা সহ্য করতে পারে না। ধরা যাক, ঘরে আসবাবপত্রের অবস্থান অদল-বদল করা হলো। এতে তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। গোসল করানোর জন্য তার জামা-কাপড় খুলতে হবে, বা গোসল শেষে আগে পরে থাকা জামাটার বদলে নতুন জামা পরতে হবে, এই সাধারণ পরিবর্তনের ব্যাপারগুলো তারা মানতে পারেনা। গ্রীষ্মের সময় জানালা খোলা রেখে ঘুমানো হলো, এতে অভ্যস্ত হবার পর শীতকালে জানালা বন্ধ করার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রতিক্রিয়া দেখায়। বা রাতে ঘুমানোর সময় শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দেও সে কাঁদে বা চিৎকার করে। এই প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটি অনেকক্ষণ ধরে চলে। এরকম প্রতিক্রিয়ার কারণে অটিস্টিক শিশুদের অনেককেই পরিবারে প্রাথমিকভাবে "জেদি" হিসেবে গণ্য করা হয়।
*** বিশেষ কোন কোন খেলনা বা সাধারণ কোন বস্তুর প্রতি তার অতিরিক্ত আকর্ষণ থাকে। সেটা সঙ্গে রাখতে চায় সবসময়। কিন্তু খেলনা হিসেবে সেটার যে বৈশিষ্ট্য, তা তাকে আকর্ষণ করেনা। যেমন কোন কোন শিশুর খেলনা গাড়ী চালানোতে আগ্রহ না থাকলেও কিন্তু সেটা উল্টে ধরে হাত দিয়ে চাকাগুলো ঘোরাতে দেখা যায়।
*** অধিকাংশ অটিস্টিক শিশু পেন্সিল বা কলম ধরে মুঠোবন্দী করে। দু'আঙ্গুল দিয়ে চিমটি দেয়ার মতো করে বা তিন আঙ্গুলে পেন্সিল ধরার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কিছু ধরতে পারেনা। হাত ধুয়ে মোছার আগে হাত থেকে পানি ঝেড়ে ফেলা বা কুলি করার কায়দাটা শিশুরা বড়দের দেখেই শিখে ফেলে। কিন্তু অটিস্টিক শিশু এই সাধারণ বিষয়গুলো আয়ত্বে আনতে পারেনা। শেখালেও দেখা যায় হাত ধুয়ে ঢেউয়ের মতো দোলাচ্ছে, পানি ঝরবে এমনভাবে ঝাড়তে পারছে না। হাত মুছতে গেলেও তোয়ালেটা এমনভাবে ধরছে যে ঠিকমতো মোছা হচ্ছেনা। Fine motor activityতে তাদের এমন বহু সমস্যা থাকে।
*** কেউ আঙুল দিয়ে কোন কিছু নির্দেশ করলে শিশু নির্দেশিত বস্তুর দিকে না তাকিয়ে বরং আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মোটরস্নায়ুর সমন্বয় ক্ষমতার ঘাটতির জন্য এটা হয়।
*** অটিস্টিক শিশুর মোটরস্নায়ুতে সমস্যা থাকবেই। মোটরস্নায়ু কোন কাজ করার সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করে। এ স্নায়ুর জন্যই ভারসাম্য রেখে একপায়ে দাঁড়াতে পারা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কোন কিছু ছুঁড়তে পারা, ডিগবাজি দিতে পারা ইত্যাদি গ্রস-মোটর ক্রিয়া সম্ভব হয়।
*** কোনো কোনো অটিস্টিক শিশু আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে রেগে ওঠে বা ভয়ার্ত হয়ে যায়।
*** অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে পঁচিশ শতাংশের খিঁচুনি থাকতে পারে।
উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে যে কোন কোনটি সাময়িক সময়ের জন্য স্বাভাবিক শিশুদের মধ্যেও থাকতে পারে। তাই একটি লক্ষণ দেখেই বাবা মায়েদের তাদের শিশুটিকে অটিস্টিক ভেবে নেয়া ঠিক হবেনা। আর একজন অটিটিস্টক শিশুর মধ্যে যে উপরের সবগুলো লক্ষণ একসঙ্গে থাকবে তাও নয়। আবার বাবা মায়েদের এটাও খেয়াল রাখতে হবে; এ ধরণের কয়েকটি লক্ষণ সন্তানের মধ্যে বেশি দিন ধরে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদি তা হয় তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপণ্ণ হতে হবে।
||৪||
চার-এর অধিক বয়সী অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ কিছু আচরণ
স্বাভাবিক বা মূলধারার শিশুরা সাধারণত চার বছর বয়সের মধ্যেই অন্যদের-- বিশেষ করে সমবয়সীদের-- চিন্তাধারা, কথাবার্তা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এসব সম্পর্কে ধারণা করতে শেখে। স্কুলে বা ঘরোয়া খেলার আসরে অন্যকে দেখে সে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে একটা বিশেষ খেলায় অংশগ্রহণের জন্য তার ঠিক কী করতে হবে। সে অনুযায়ী দৌড়াদৌড়ি, লাফঝাঁপ, হৈহল্লায় সে নিজেকে নিয়োজিত করে ফেলে। এই প্রক্রিয়াটি এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে যে কীভাবে ঘটল তা আমাদের নজরে আসেনা। কিন্তু অটিজম থাকলে শিশুরা এ বয়স থেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে যায়। অন্যরা কি করছে- বা ভাবছে এ সংক্রান্ত চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের থাকেনা।
আমাদের দেশে একসময় শিশুরা পাঁচ বা ছ'বছর বয়সের আগে স্কুলে যেতনা। কিন্তু এখন তিন-চারের মধ্যেই প্লে-গ্রুপ বা কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। অটিজম সম্পর্কে বাবা-মায়ের সম্যক জ্ঞানের অভাবে অনেকসময় শিশুর অস্বাভাবিকতা পরিবারে তেমন আমলে আনা হয়না। কিন্তু স্কুলে অভিজ্ঞ ও যত্নশীল শিক্ষকের পক্ষে এধরণের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রথমত শিশুর আচরণ লক্ষ্য করে, দ্বিতীয়ত সমবয়সী অন্য শিশুদের সঙ্গে আচরণের তুলনা করে, তৃতীয়ত গ্রুপ ওয়ার্ক বা দলগত কাজে শিশুর বিসদৃশ পারফর্ম্যান্স দেখে। প্রথম দুটি সহজেই অনুমেয়; শিশুর অন্যমনস্কতা, একটা বিশেষ কাজ বারবার করতে চাওয়া, পাঠক্রমে বা ক্লাসরুমের পরিবেশ সম্পর্কিত কোন রদবদলে তীব্র অস্বস্তি বা প্রতিক্রিয়া, বন্ধুত্ব স্থাপন বা কথাবার্তায় অনীহা বা অক্ষমতা, প্রচন্ড ভীতি-লজ্জা, অন্যকে বা নিজেকে আঘাত করা-- এসব বিষয় শিক্ষকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা না। গ্রুপ ওয়ার্ক বিষয়ক তৃতীয় ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
ধরুন পাঁচজন শিশুকে একটা টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসিয়ে শিক্ষক কোন কাজ করাবেন, যাতে পালা করে কাজ করা (turn-taking), ভাগাভাগি করে নেয়া (sharing), দলগতভাবে কাজ করা (group performance) ইত্যাদি বিষয় জড়িত। হয়তো পাঁচজনের হাতে পাঁচটা রং পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে শিক্ষক কাগজে পাঁচ পাপড়ির একটা ফুল আঁকলেন। তারপর প্রথম শিশুটিকে দিলেন। নির্দেশনা অনুযায়ী সে হাতের রং-পেন্সিল দিয়ে একটা পাপড়ি রং করে কাগজটা এগিয়ে দিল পাশের জনকে। এভাবে শেষ জনকে দিয়ে পুরো ফুলটি রং করার কাজ সম্পন্ন হবার কথা। প্রথম বা দ্বিতীয় শিশুটির পরে আর নির্দেশনার প্রয়োজন হবার কথা না। কারণ স্বাভাবিক আগ্রহ থেকেই অন্য শিশুরা দেখবে কী করতে বলা হচ্ছে, তার "অংশ" বা "part" এখানে ঠিক কতটুকু। আগের জনের কাছ থেকে কাগজটা নিতে হবে, তারপর নিজের কাজটুকু করে পরের জনের কাছে হাতবদল করতে হবে। কিন্তু এদের মধ্যে যদি একজন অটিস্টিক শিশু থাকে, তবে সেক্ষেত্রে এই ঘটনাগুলো ঘটতে পারে--
১. শিক্ষক যখন কাজটি শুরু করছেন, তখন আই কন্ট্যাক্টের অভাবে বা অন্যমনস্কতার কারণে সেটা সে খেয়াল করবেনা।
২. একই ভাবে তার পূর্ববর্তী শিশুরা কী করছে, কেন করছে-- সেদিকেও তার নজর থাকবেনা। বা তাকিয়ে থাকলেও "সিকোয়েন্স"-এর ব্যাপারটা সে ধরতে পারবেনা।
৩. তাকে যখন কাগজটা এগিয়ে দেয়া হবে, তখন সে বুঝতেই পারবেনা কেন এটা তাকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোন প্রশ্ন করে সেটা জানতে চাইবে না। তার তখন চেষ্টা থাকবে এই বিষয়টা থেকে চোখ সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু দেখার, করার বা বলার; অথবা অসংলগ্ন আচরণ করার।
৪. শিক্ষক তার কাছে গিয়ে বারবার বুঝিয়ে হাতে ধরে সাহায্য করলেও সে শুধু রং ঘষে তার "part" শেষ করবে। পরবর্তীজনের কাছে pass করার কাজটি সে করবেনা। কারো দিকে তাকাবেই না।
এখানে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, তাকে একা যদি একটা ছবি আর ক্রেয়ন দিয়ে বসিয়ে দেয়া হতো, সে হয়তো ঠিকই পুরো ছবিটা রং করে ফেলত। কিন্তু গ্রুপে করতে দেয়ায় তার সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতাগুলো প্রকটভাবে ধরা পড়বে। আমাদের দেশে ক্লাসরুমে শিশুদের গ্রুপ-ওয়ার্কের সুযোগ মেলে কম। কিংবা আদৌ মেলেনা। তাই অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের অস্বাভাবিকতা সেভাবে ধরা পড়ে না। তারা বরং অমনোযোগী, অমিশুক প্রকৃতির, মেধাহীন বা স্বল্প বুদ্ধির ব্যাকবেঞ্চার হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে পড়ে।
এ বয়সী অটিস্টিক শিশুদের আরও কয়েকটি সাধারণ আচরণের কথা বলা যেতে পারে, যেগুলো অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।
* হাত নেড়ে টা-টা দেয়ার সময় অনেকে হাতের তালু নিজের দিকে মুখ করিয়ে রাখে। কারণ অন্যদের টাটা দেখার সময় সে দেখে যে হাতের তালুটা তার দিকে মুখ করা।
*কিছু দেখার সময় হঠাৎ হঠাৎ বস্তুটি চোখের একেবারে কাছে এনে দেখে যা দেখে মনে হতে পারে তার দৃষ্টিশক্তিতে কোন সমস্যা আছে অথবা সে খুব ক্ষুদ্র কিছু নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করার চেষ্টা করছে।
* অন্য কাউকে ছবি, বই, বা কার্ডজাতীয় কিছু দেখাতে হলে সে ছবিটা তার নিজের দিকে ফিরিয়ে রাখবে, আর উল্টো পিঠটা দেখাবে।
* কয়েকজনকে কিছু খেতে দেয়া হয়েছে; খাওয়া শেষে একটা টিস্যু পেপারের বাক্স এক এক করে সবার কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যার সামনে দেয়া হচ্ছে সে একটা করে টিস্যুপেপার টেনে নিচ্ছে, হাত মুছছে। এদের মধ্যে একজন অটিস্টিক শিশু থাকলে তার জন্য সাধারণ আচরণ হবে একটা টিস্যু টেনে না নিয়ে বাক্সটিই নিয়ে নিতে চাওয়া।
* কারো সঙ্গে দেখা হলো বা বাড়ীতে কেউ এলো, শিশুকে তখন কিছু সাধারণ সহবত শেখানো হয়, যেমন সালাম/আদাব দেয়া বা উইশ করা। অটিস্টিক শিশুর জন্য এই সামান্য কাজটিই অত্যন্ত কঠিন। কারণটি বিস্তৃত করা যাক। এক্ষেত্রে ১.মানুষটিকে চেনা, ২.নাম/পরিচিতিসূত্র মনে করা, ৩.মুখ খুলে কথা বলা আর ৪.পূর্বোক্ত তিনটি কাজ করার সময় মানুষটির সঙ্গে আই-কন্ট্যাক্ট বজায় রাখা-- এই চারটি কাজ একসঙ্গে করার মতো চাপ তার স্নায়ু নিতে পারেনা। তাই দেখা যায়, পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলেও সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে বা মুখ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বারবার বলার পর বা জোর করা হলে হয়তো কোনমতে এক ঝলক চোখাচোখি করেছে তো সঙ্গেসঙ্গে কথা জড়িয়ে ফেলেছে।
* তাকে বিশেষ কোন জায়গায়, যেমন মার্কেটে বা স্কুলে নিয়ে যাওয়া হবে, সেটা সে জানে। রেডি হয়ে দরজা খুলে দেখা গেল একটা পাখী বসে আছে বা খবরের কাগজ এসেছে। বাবা বা মা হয়তো সেটা নিয়ে কোন কথা বললেন। দেখা যাবে, পরবর্তীতে যখনই স্কুলে বা মার্কেটে যাবার কথা আসবে বা তাকে সেখানে যাবার জন্য রেডি করানো হবে, সে বলে উঠবে "পাখী এসেছে" বা "পেপার দিয়েছে" যদিও তার কোনটিই ঘটেনি। আগেরবারের ঘটনাটি তার মাথায় গেঁথে গেছে; সে যেটার পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। এই ব্যাপারটা একই সময়ে ঘটে যাওয়া যে কোন ধরণের একাধিক কাজ/ঘটনার ক্ষেত্রে ঘটতে পারে।
||৫||
অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসা
এখানে প্রথমেই আসে শিশুর অটিজম শনাক্তকরণের বিষয়টি। ৩য় অধ্যায়ে বর্ণিত লক্ষণগুলোর মধ্যে যে কোন কোনটি সাময়িক সময়ের জন্য স্বাভাবিক শিশুদের মধ্যেও থাকতে পারে। তাই একটি লক্ষণ দেখেই বাবা মায়েদের তাদের শিশুটিকে অটিস্টিক ভেবে নেয়া ঠিক হবেনা। আর একজন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে যে সবগুলো লক্ষণই একসঙ্গে থাকবে তাও নয়। আবার বাবা মায়েদের এটাও খেয়াল রাখতে হবে; এ ধরণের কয়েকটি লক্ষণ সন্তানের মধ্যে বেশি দিন ধরে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদি তা হয় তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপণ্ণ হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুকে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ করে দিতে হবে। তখন একই বয়সী অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করে বাচ্চার যেকোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে দেরী না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকদের মতে, নীচের সমস্যগুলো শিশুর মধ্যে দেখা গেলে অবিলম্বে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন:
* শিশু যদি ১ বছরের ভেতর মুখে অনেক আওয়াজ (Babbling) না করে, কিংবা আঙ্গুল দিয়ে বা অঙ্গভঙ্গি করে কোন কিছু না দেখায়।
* ১৬ মাসের ভিতর যদি এক শব্দের বাক্য না বলে।
* ২ বছরের ভিতর যদি দুই শব্দের সংমিশ্রণে বাক্য না বলে।
* একটি শিশুর কথা ও সামাজিক আচরণ যদি হঠাৎ হারিয়ে যায়।
অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসা সাধারণত তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে দেয়া হয়।
১. অস্বাভাবিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য শিশুর বাবা মা এবং/অথবা অনুরূপ অভিভাবককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান। সময় ও যত্নসাপেক্ষ চর্চায় তারা বাড়িতে শিশুর আচরণগত পরিবর্তন আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। এই কাজটি সফলভাবে করা সম্ভব হলে পরিবার ও সমাজে ভবিষ্যতে শিশুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্পিচ থেরাপিস্ট ও মনোবিদের পরামর্শ জরুরী।
২. বিশেষায়িত স্কুলের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুকে একদিকে যেমন প্রথাগত শিক্ষা প্রদান এবং ভবিষ্যতে তার জন্য উপযোগী কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৩. প্রয়োজন ও রোগলক্ষণ অনুযায়ী কিছু ঔষধ ও সাইকোথেরাপি। অবশ্যই সেটা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে।
এমন অবস্থা কতদিন চলবে?
অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে যাদের ইনটেলেকচুয়াল ডিজেবিলিটি নেই, অর্থাৎ অ্যাসপারগার সিনড্রোমে ভুগছে এমন শিশুদের অনেকে নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যায় চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো একটু একটু করে কমিয়ে আনতে পারে, এবং কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও একসময় সাধারণ স্কুলে স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়ালেখা করতে পারে। আরো ১০-২০% শিশু স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়তে পারে না, তারা বাসায় থাকে বা তাদের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত স্কুল ও বিশেষ প্রশিক্ষণের। বিশেষায়িত স্কুলে পড়ে, ভাষা সহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ গ্রহন করে তাদের পক্ষে সমাজে মোটামুটি স্বনির্ভর একটা স্থান করে নেয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বাদবাকি প্রায় ৬০% অটিস্টিক শিশু, সব ধরণের সহায়তা পাওয়ার পরও স্বাধীন, স্বনির্ভর ও এককভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারে না। তাদের নিয়তি বা বাস্তবতা হলো দীর্ঘ দিনের-- এমনকি সারা জীবনের জন্য অন্যের উপর নির্ভরতা। পরিবারে অথবা বিশেষ আবাসনে, বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজন হয় তাদের।
===========================================
প্রকাশিত গ্রন্থ "শিশুর অটিজম: তথ্য ও ব্যবহারিক সহায়তা"র প্রথম অধ্যায় থেকে সংকলিত ও সংক্ষেপিত।
মন্তব্য
লেখাটি অসাধারণ! যাঁদের সন্তান অটিস্টিক, আজ এই দিবসে আমার কামনা তাঁদের শোক, শক্তিতে পরিণত হোক!
লেখকের মন্তব্য
এর পাশাপাশি তাদের প্রতি মানুষের পৃথিবী আরেকটু মানবিক হোক।
দিনটা পার হয়ে যাচ্ছে আর আপনি এ বিষয়ে লিখছেন না - আমি কষ্টে ছিলাম। সামুতে এই বিষয়ে আপনার লেখা গুলো পড়ে (আরো অনেকের কাছে জেনে) আমি মনে মনে একটা লেখা দাঁড়া করছিলাম। কিন্তু পোষ্টে ইনফরমাশন ভুল হতে পারে ভেবে দিচ্ছি না। কারন এ বিষয়ে কোন ভুল তথ্য দেয়া যাবে না। এমনিতেই অনেক ভুল তথ্য আমাদের মাঝে চালু আছে।
গত কিছু দিন আগে আমি ইস্কাটনের বুদ্দিপ্রতিবন্দী স্কুলে গিয়েছিলাম। অনেক অভিজ্ঞতা ও নানান তথ্য জেনেছি।
আজ সকালে টিভিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুরা ভাষন শুনেছি, আপনি তার ভাষনটা লিখে দিলে আমার মনে হয় অনেক ভাল হত। তিনি নিজ থেকে অনেক কিছু যোগ দিতে গিয়ে ভাষন গড়বড় করে ফেলেছেন। এসব বিষয়ে এমন কিছু বলা উচিত নয়, যাতে মানুষের মন বিষিয়ে উঠতে পারে। এদের জন্য অনেক অর্থ বরাদ্দ দেয়া উচিত। মুখে বড় কথা অথচ আমি ইস্কাটনের বুদ্দিপ্রতিবন্দী স্কুলে গিয়ে দেখেছি, ভাল বসার চেয়ার টেবিলও নাই। অন্যকিছুতো দুরের ব্যাপার!
ভাল পোষ্টের জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাছি।
লেখকের মন্তব্য
উদরাজীভাই, আপনার সহৃদয় মন্তব্যটির জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
ইচ্ছে ছিলো সম্পূর্ণ নতুন একটা লেখা লিখবো, কিন্তু অনেকরকম ঝামেলায় পড়ে সময় কুলিয়ে উঠতে পারিনি। তবে এই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েই যেহেতু ব্লগিং শুরু করেছিলাম, সে ধরণের লেখালেখি অব্যাহত থাকবে। দোয়া করবেন।
উদরাজী কাকার মতো আমিও অপেক্ষা ছিলাম।
ভালো লাগলো লেখাটা।অনেক কিছু জানলাম অটিজম নিয়ে।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ রাসেল, ভালো থেকো
আরে কাকা যে! কাকা, মনের দুঃখে আছি। আপনারা কেহ একটু সহমর্মিতাও দেখালেন না! আপনার 'কাকা' ডাক না শুনলে ভাল লাগে না।
১। পোস্ট স্টিকি হতে পারে। মুরাদের পোস্টের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এটা অনেক বেশী ডিটেইল্ড। আমরা যারা তেমন কিছু জানিনা তাদের জন্য সহায়ক।
২। সেদিন রেডিওতে বলছিলো, অটিস্টিক বাচ্চাদের নাকি ক্যামেরা/ছবি দিয়ে দ্রুত শেখানো যায়। জানিনা সত্যি না কেবলই ক্যামেরা বিক্রির ধানদা।
৩। অন্যদেশের কথা জানিনা, এ্যামেরিকায় নাকি অন্যান্য দম্পতির তুলনায় অটিস্টিক বাচ্চাদের বাবামার ডিভোর্সের হার বেশী (উইদাউট এ ট্রেইস নামে একটা সিরিয়ালে দেখেছিলাম)।
৪। অটিজমের যে সিম্পটমগুলার কথা বলা আছে, তার অনেককিছুই অনেক স্লো লারনিং বাচ্চার মাঝে থাকে। আমার মেয়েরও আছে। আরো অনেক বাচ্চারই আছে। কিন্তু সেটা অটিজম না। সুতরাং শুধু কয়েকটা সিম্পটম দেখে ডিসিশন নেবেন না কেউ। (পোস্টেও সেটা বলা আছে)
৫। টিকার সাথে যে অটিজমের কোন সম্পর্ক নাই- সে ব্যাপারে বোধ হয় এখন আর কারো দ্বিমত নাই।
৬। এদেশে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনলাইন মেডিক্যাল সাইট হলো ওয়েবএমডি। অটিজমের লিংক দিলাম-
http://www.webmd.com/brain/autism/mental-health-autism
আমিও ২ নং প্রশ্নের উত্তর জানতে আগ্রহী। আমাদের ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী অটিস্টিক শিশুদের বিকাশের জন্য ছবির মাধ্যমে শিক্ষা-খেলাধূলা এই ধরণের কিছু সফটওয়ারের উপর কাজ করছে।
লেখকের মন্তব্য
@ রোবোট
১। আমার তো প্রায় তৈরি লেখা ছিলো, শুধু পোস্ট করে দিয়েছি। মুরাদ যে দিনটিকে মনে রেখে, বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকা কিছু মানুষের প্রতি সহানুভূতি থেকে পোস্টটি লিখেছেন, তার সেই অনুভূতি অতুলনীয়।
২। ছবি দিয়ে দ্রুত শেখানো যায়-- (যৎসামান্য বিতর্ক থাকলেও) কথাটি প্রবলভাবে সত্য। অটিস্টিক শিশুদের কথা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজ শেখানোর একটি কার্যকরী ব্যবস্থার নাম PECC (Picture Exchange Communication System)। তবে ধান্দা ব্যাপারটা সেখানেই সবচেয়ে বেশি কাজ দেয়, যেখানে প্রয়োজনের পাশাপাশি মানুষের আবেগঅনুভূতিও জড়িত থাকে
৩। ভুরি ভুরি বাস্তব উদাহরণ স্বচোক্ষে দেখা। "চকোলেটময় মানুষেরা" রিপোস্ট করবো দেখি, সঙ্গে দেবো বাংলাদেশের কিছু অভিজ্ঞতা।
৪। একমত। অস্ট্রেলিয়ায় দেখেছি অটিস্টিক নয়, অথচ মনোযোগের সমস্যা, শেখার সমস্যা ইত্যাদি আছে এমন 'মেইনস্ট্রিম' বাচ্চাদেরকেও স্পিচ/অকুপেশনাল/বিহেভিয়ারাল থেরাপিস্টের কাছে স্বল্পমেয়াদী থেরাপির জন্য পাঠানো হয় অথবা সেরকম খেলনা/শিক্ষাউপকরণ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়।
৫। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, সরাসরি টিকার উপাদানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকলেও প্রিজার্ভেশনের মানের কোনো প্রভাব থাকতে পারে, অন্তত আমাদের দেশে বিদ্যুৎব্যবস্থা ইত্যাদি বিবেচনা করলে। দেড় বছরের সময় এমএমআরের টিকা দেয়া হয়, ঠিক কাছাকাছি সময়ে শিশুর স্বাভাবিক আচরণ এবং অর্জিত বয়সোপযোগী বাকশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছে-- এমন উদাহরণ প্রচুর।
৬। অশেষ ধন্যবাদ। সাইটটি দেখেছি, অপরাহ্ উইনফ্রের শোতেও এর কথা বলা হয়েছিলো একবার।
@ ভাঙ্গা পেন্সিল
ছবিটা শেখানোর ভালো মাধ্যম কেন, তার ব্যাখ্যা আছে। অটিজমের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো মৌখিক-অমৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমে কার্যকর মিথষ্ক্রিয়ায় অক্ষমতা; যার জন্য ছবির মাধ্যমে শেখানোর প্রক্রিয়ায় অন্তত একজন ব্যক্তিমানুষকে সক্রিয় থাকতে হয়। শুধুমাত্র কম্পিউটার গেমসের মতো শিক্ষা-উপকরণের উপর নির্ভরতা শিশুর অভিভাবকের জন্য কিছু আপাতস্বস্তিকর সময় তৈরি করলেও চূড়ান্তভাবে এতে অটিস্টিক শিশুর সমস্যা বাড়বে।
এটা নিয়ে আলাদা একটা পোস্ট দেয়ার আশা রাখি।
তথ্য নির্ভর এবং প্রয়োজনীয় একটি পোস্ট।
ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।
লেখকের মন্তব্য
আপনাকেও ধন্যবাদ, সকাল
সামুতে এ বিষয়ে তোমার পোস্ট পড়েই তোমার ভক্ত হয়েছিলাম।
আমিও মনে করি পোস্টটি স্টিকি হওয়া উচিত।
লেখকের মন্তব্য
তোমরা পাশে ছিলে বলেই পোস্টগুলো লেখা সম্ভব হয়েছিলো আপা
পোস্ট স্টিকি হোক।
Tmr kachh theke 1 ta post asha korechhilam. Valo theko.
লেখকের মন্তব্য
সুন্দর পোস্টের জন্য অভিনন্দন, আপু।
আমি এখানে কিছু কথা যোগ করতে চাই। অটিজম আরও ছোট বয়সে সন্দেহ করতে হবে যদি
নিচের সাধারন আচরনগুলো ১/২ মাসের বেশি বিলম্বিত হয়:
১: ১ মাসের শিশু মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
২: ২ মাসের শিশু অন্যের কথা বা হাসির উত্তরে পাল্টা হাসে।
৩: ৩ মাসের শিশু মা কে চিনতে পারে অথবা মায়ের কাছে থাকতে প্রেফারেন্স দেখায়।
@ হাসজারু ভাই - আপনার বর্ণিত আচরনগুলা যদি একটা বাচ্চা করে তাহলে বুঝতে হবে সে বাচ্চা স্বভাবিক - রাইট?? আর যদি এই আচরনে কোন বিলম্ব হচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে সে বাচ্ছার অটিজম সমস্যা থাকার চান্স আছে, রাইট??
প্লিজ কাইন্ডলি একটু বলবেন - আমি যেটা বুঝেছি সেটা সঠিক কিনা
নুশেরা আপুর কমেন্টে উত্তর দিলাম।
লেখকের মন্তব্য
অনেক ধন্যবাদ হাসজারু। আপনার মন্তব্যটি শিশুর একেবারে প্রথম দিককার developmental milestoneগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরছে। তবে কবির প্রতিমন্তব্য থেকে বুঝতে পারছি অতিসরল একটা পাল্টাপাল্টি সিদ্ধান্তের ভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
মেলবোর্নে অটিজম ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ৫০%-এর বেশি অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে দেড় বছর বয়স পর্যন্ত এদের বয়সানুপাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশে কোনো সমস্যা দেখা যায় নি। ২/৩টি শব্দবিশিষ্ট বাক্যও বলতে পেরেছে, মিথষ্ক্রিয়া ও সাড়াপ্রবণতা স্বাভাবিক ছিলো। হঠাৎ করেই যেন পিছিয়ে পড়ে পরবর্তী কয়েক বছরে নির্বাক, মিথষ্ক্রিয়াহীন, ভীতি/জড়তাযুক্ত হয়ে গুটিয়ে গেছে। বাংলাদেশে আমার নিজের অভিজ্ঞতায় শতাধিক নমুনার মধ্যে ৭০% অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটেছে।
কাজেই ১-৩ মাস বয়সে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ দেখে একেবারে শতভাগ নিশ্চিন্ত হবার উপায় নেই।
ধন্যবাদ, নুশেরা আপু, এতো সুন্দর উত্তরের জন্য।
অটিস্টিক শিশুরা দেড় থেকে দুই বছর ব্য়সে অর্জিত অগ্রগতিগুলো হারিয়ে আরো পিছিয়ে যেতে থাকে। তাই এসময়েই এটা সকলের নজরে পড়ে এবং অসুখ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু আরও কিছু গবেষনায় দেখা গেছে যে, এধরনের শিশুরা আসলে সোশাল ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোনে আরও অনেক আগে থেকেই পিছিয়ে থাকে। যেটা মায়েরা অস্বাভাবিক বলে মনে নাও করতে পারেন।
অটিজম রোগ অনেক ভাবে প্রকাশ হতে পারে। এই সিনড্রমের প্রতিটি শিশুই ইউনিক।
লেখকের মন্তব্য
যথার্থ বলেছেন! আসলে হয় কী, সমবয়সী অন্যান্য বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করেই তো বাবামা প্রথম টের পান, সেই পর্যায়টা আসতে আসতে দেড়দুই বছর পার হয়ে যায়। পরে হয়তো দেখা যায়, হাঁটাচলা-বসা-মোটরঅ্যাকটিভিটি--- কোথাও না কোথাও লক্ষণ মিলে গিয়েছিলো।
আপনার জানাশোনা আছে বোঝাই যাচ্ছে, এ বিষয়ে লেখার অনুরোধ রইলো।
এই লেখাটা কি আজকের আজাদীতে ছিল?
আপনার লেখা আমি দেখেছি কিন্তু পড়া হয়নি।
আমার মা পড়ছিল।
লেখকের মন্তব্য
খালামণিকে অনেক ধন্যবাদ
আজাদীতে আমার বইটা থেকে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক পর্ব উদ্ধৃত করে ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হয়, আসলে কী ছাপা হবে ঠিক করেন সোনালি আপা (ফাহমিদা মালেক)। প্রথমে একটু অস্বস্তি লেগেছিলো, পরে এতো মানুষের সাড়া পেয়েছি যে মনে হয়েছে আপার সিদ্ধান্তটা খুব ভালো ছিলো। ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করেছেন এতোজন ভুক্তভোগী, এদের সঙ্গে পরিচিতিটা জীবনের অনেক বড় অভিজ্ঞতা।
জানলাম, আপা!
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ, কেউ!
চরম উপকারি একটা পোস্ট -
mental retardation আর অটিজম কে গুলিয়ে ফেলতাম - এখন বুঝলাম দুইটা টোটালি আলাদা ব্যাপার
আমার এক ছাত্র ছিল - খুব ই টেলেন্ট বাট তার আচরন স্বাভাবিক বাচ্চাদের মত ছিল না । কিছু উদহারন দেই
- আই কন্টাকটের ব্যাপারটা তার মাঝে প্রখর ছিল - সে কখনও কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলত না - এমন কি তাকে বলেও করানো যেত না
- অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশত না
- সে কথার শেষ অংশ রিপিট করত - যেমন তাকে আপনি যদি জিগ্গেস করতেন- তুমি কি আজ ভাত খেয়েছ - সে বলত ভাত খেয়েছ ।
- আরো কিছু জেদি ব্যাপার তার মাঝে ছিল - যে ব্যাপারগুলা তার মা আমাকে বলেছিলেন।
এই বাচ্চাটা কি অটিজম আক্রান্ত??
।
।
আমার বোনের মেয়ে প্রিমিচিউর জন্মেছে । তার সব কিছু স্বভাবিক বাচ্চাদের মত এক্সসেপ্ট কিছু ব্যাপার
- তার কথা বলতে দেরি হচ্ছে ও কথা অস্পষ্ট -লিমিটেড কিছু শব্দের মাঝে তার কথাবার্তা সীমাবদ্ধ - তবে ইদানিং কথা বেশ স্পষ্ট হচ্ছে এবং অনেক কথা বলতে পারে
- সে কিছু মনে রাখতে পারে না - আবার অনেক পুরানো জিনিস বলে দেয়
- আপনে যদি তাকে কিছু করতে বলেন - সে এক দৃষ্টিতে আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে - এটা সে সবসময় করে না
- একরুখা টাইপ জেদি কিছু স্বভাব আছে
- আর সবকিছুই স্বাভাবিক বাচ্চাদের মত
ভ্রান্ত ধারণা ১২ এর সাথে অনেকটা মিলে যাচ্ছে - সুতারাং বলা যায় আমার বোনের মেয়ের অটিজম না
চমৎকার একটা পোস্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে
লেখকের মন্তব্য
প্রথম বাচ্চাটি সম্ভবত মৃদু মাত্রার অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোমে আক্রান্ত। এদের বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা নেই তবে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ায় অনেক পিছিয়ে থাকার দরুণ অ্যাকাডেমিক সাফল্য মেধানুপাতে হয় না। তার জন্য বিশেষ ধরণের শিক্ষামূলক খেলা ও স্পিচ থেরাপির প্রয়োজন ছিলো। ৩-৬ বছর বয়সের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতো সেটা।
দ্বিতীয় শিশুটির সমস্যা সম্ভবত ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder)। এটা অটিজম না, তবে স্পিচ থেরাপির আওতায় কিছু স্ট্রাকচার্ড প্লে এবং অকুপেশনাল থেরাপি এদের ক্ষেত্রে ভালো কাজ করে।
আপু জিনিষগুলো জানা ছিল। আবার ঝালাই হলো। অনেক ধন্যবাদ,পোস্ট টি দেয়ার জন্য
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ আরিশ। আপনাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের বাসনাদি (শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ বাসনা মুহুরি) নিজের সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘ ভোগান্তির অভিজ্ঞতা থেকে অসামান্য কাজ করছেন। আমার অত্যন্ত আপন একজন প্রণম্য মানুষ।
খুব কাজের পোস্ট নুশেরা আপু - অনেকেরই উপকার হবে।
ধন্যবাদ সময় খুজে শেয়ার করার জন্য ।
লেখকের মন্তব্য
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ এমন একটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার জন্য, যেখানে ভুক্তভোগীদের কাজে লাগার মতো যথাসাধ্য সঞ্চয় রাখা যায়।
লেখাটি পড়লাম। অনেককিছু জানা হলো। আপনাকে ধন্যবাদ।
লেখকের মন্তব্য
পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ, পদ্ম।
এই পোস্টটার জন্য তোমাকে শুধু ধন্যবাদ দিয়ে কিছু বলা হবে না বরং চুপ থাকি।
-------------
ওরা আমাদেরই সন্তান।।
লেখকের মন্তব্য
কিছুই জানতাম না। প্রিয় সিন্দুকে।
লেখকের মন্তব্য
অনেক ধন্যবাদ হালিম ভাই!
গুরুত্বপূর্ণ
ধন্যবাদ নুশেরা আপু
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ আকাশ অম্বর
খুবই গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট। বাংলা ভাষায় অটিজম নিয়ে লেখালিখির পথিকৃত নুশেরা'পু। সচেতনতা ছড়িয়ে যাক দেশ জুড়ে।
মুকুল ভায়ার সাথে সহমত। নেটে/ব্লগে বাংলায় এ বিষয়ে খুজতে গেলে নুশেরাবু'র নামটাই চলে আসে। সচেতনতা ছড়িয়ে যাক দেশ জুড়ে।
লেখকের মন্তব্য
তোমার মতো পাঠক তৈরি হোক দেশজুড়ে!
অনেক অজানা তথ্য জানলাম। আতঙ্কিতও হলাম ক্রমবর্দ্ধমান অটিজমের কথা জেনে ।
এমন একটা পোস্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ নুশেরা । আশা করি এ ধরনের সচেতনামূলক পোস্ট অচিরেই আরও পাবো ।
প্রকৃতি কেন যে কারো কারো ব্যাপারে এমন অনুদার হয় ? আর মানুষ নামের আমরা যে কেন বোকার মত তা নিয়ে মজা করি ?
যার বা যাদের যুদ্ধ করতে হয় এমন একটা শিশুকে নিয়ে তারাই জানে এটা কত বড় যুদ্ধ । সকলের সচেতনতা, ধৈর্্যশীলতা আর মানবিক স্বাভাবিক আচরন দিয়ে ভালোবাসে এদেরকে আপন করে নেবার প্রবনতা ছাড়া এসব শিশু চির বঞ্চিত থেকে যাবে ।
প্রকৃতি এদের যা দিতে কার্পণ্য করেছে, আসুন আমরা তা দিতে চেষ্টা করি ।
লেখকের মন্তব্য
হুদাভাই, খুব কাছ থেকে অনেক বেশি বিপর্যস্ততা দেখেছেন আপনি। আপনার সংবেদনশীলতা এবং সচেতনতার শুভ বোধ সবাইকে প্রভাবিত করুক।
নুশেরা আপাকে বারবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি এরকম জরুরী বিষয়টি তুলে ধরার জন্য। অবাক হচ্ছিলাম পোস্টটা পড়তে পড়তে। কত কিছু আমরা এখনও জানি না, না জেনেই রিঅ্যাক্ট করি কিংবা জানলেও ভুল জানি। এই পোস্টটার মাধ্যমে আমাদের সবার বোধোদয় হোক।
লেখকের মন্তব্য
অনেক ধন্যবাদ ভেবু।
লেখাটি পড়ে অনেককিছু জানতে পারলাম। আপু, ধন্যবাদ।
লেখকের মন্তব্য
ব্লগে স্বাগতম সাগরিকা। ধন্যবাদ পড়ার জন্য।
অটিজম নিয়ে ধারণা খুব কম ছিলো।আপনার লেখাতে আরো ভালোভাবে জানলাম আপু।সরাসরি প্রিয়তে।
লেখকের মন্তব্য
অশেষ ধন্যবাদ তানভীর
গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট। প্রিয়তে রাখলাম। ধন্যবাদ ও শুভকামনা
লেখকের মন্তব্য
অশেষ ধন্যবাদ রাজিন
শুভকামনা।
লেখকের মন্তব্য
মাথা পেতে নিলাম
গুরুত্বপূর্ণ একটা পোস্ট। অনেক কিছু জানা গেল।
লেখকের মন্তব্য
পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ দূরদ্বীপবাসিনী
অসাধারন পোস্ট।কালকে অটিজম নিয়ে পোস্টারিং করলাম ভার্সিটিতে।সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার।আমার মনে হয় মা দিবস বাবা দিবসের চেয়ে অটিজম সচেতনতা দিবস ঠিকমত পালন করা আমাদের উচিত। পোস্ট প্রিয়তে।
লেখকের মন্তব্য
অশেষ ধন্যবাদ মুরাদ। আপনার সচেতনতা-প্রয়াসে সর্বতো শুভকামনা জানাই। লিফলেট ধরণের কিছু করতে চাইলে আমার পোস্টটি থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারেন, বিশেষ করে ভ্রান্ত ধারণার অংশটির প্রচার জরুরি বলে মনে হয়।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাবা মা বুঝতেই পারেন না তাদের বাচ্চা অটিস্টিক। আপনার এই লেখা কিংবা প্রকাশিত বইটা এইসব ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয়। পরিশ্রমী এই কাজটার জন্য আপনাকে আবারো অশেষ ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।
লেখকের মন্তব্য
অশেষ ধন্যবাদ নীড়দা, চট্টগ্রামে বইটির প্রথম সংগ্রাহক আপনিই।
নতুন লেখার অপেক্ষায় আছি
এই বিষয়ক পোষ্ট নিয়ে কিছু বলার নাই আপু। আমরা শুধু আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে পারি, আর সবাই আপনার মত সচেতন হোক এই কামনা।
লেখকের মন্তব্য
থ্যাঙ্কু শাওন
৫: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী------- অনেককেই দেখেছি এটা খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করে
---------
চমৎকার পোষ্ট
লেখকের মন্তব্য
কথা ঠিক, আমি নিজে কতোজনের কাছ থেকে সান্ত্বনাবাণী পাই এমন! অনেক ধন্যবাদ মম।
এই পোষ্টটা পড়ে মনে হল ১০০% খাঁটি ও মন থেনে নিংরানো একটা পোষ্ট আপুনি।
২০০৮সালে আমি যখন ম,পুরে এক বান্ধুবীর বাসায় যেতাম তখন অটিজমের একটা স্কুল দেখতাম।অনেক বাচ্চাদের কে দেখতাম।অনেক অদ্ভুত লাগল।তারপর হেনস নামের অটিজম নিয়ে করা একটা সংস্থার কিছু সম্মোলন এ গিয়ে অটিস্টিক বাচ্চাদের অনেক কিছু দেখেছি।অনুভূতিটা বলে বুঝাতে পারব না।অনেক অনেক ভালবাসা রইল সব শিশুদের প্রতি।
লেখকের মন্তব্য
একটা সময়ে কিছু না জেনে, না বুঝে আমি যে দিশেহারা ছোটাছুটির মধ্যে ছিলাম, আমাদের দেশে আমার অবস্থায় পড়া মানুষজন যেন সেখানে একটুখানি নির্দেশনা পায়, সেটুকুই প্রত্যাশা ছিলো। দেশে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় টের পেয়েছি, প্রত্যাশার খানিকটা হয়তো পূরণ হয়েছে। কেউ যদি পরামর্শ পেতে বা দিতে চান, অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চান, আমার সাইটটি ছিলো (আপাতত বন্ধ সেটি)। এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাভাষাভাষী ভুক্তভোগীরা মেইল করেন অনেকে, তুমি চাইলে তোমার প্রোগ্রামে জানিয়ে দিতে পারো সেটা-- bdautism@gmail.com
অনেক দিন কোন খবর জানিনা হেনসের।
আমি জেনে নিয়ে অবশ্যই শেয়ার করবো আপুনি।
ভালবাসা নিও।
আপনার লেখার ভক্ত আমি অনেক আগে থেকেই। অটিজম সঙ্ক্রান্ত আপনার বইটিও পড়েছি। এখানে আপনাকে পাবো ভাবিনি। আমি নিজেও ডিজেবিলিটি এওয়ারনেস নিয়ে কাজ করি। আপনার পরামর্শ আমাদের কাজের পরিধিকে বিস্তৃত করবে আশা করছি। আপনাকে অনুরোধ করবো আমাদের এই ছোট্ট প্রচেষ্টাটি দেখে আসার।
ভালো থাকুন। অনেক ভালো।
কলমের ছোঁয়ায় আলোকিত হোক সমাজ।
লেখকের মন্তব্য
সাবরিনা, ব্লগে অনেক জায়গায় দেখেছি আপনার নাম, আলাপ হলো এই প্রথম। নিশ্চয়ই যোগাযোগ হবে, নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে শুভ কোনো প্রচেষ্টায় যথাসাধ্য সম্পৃক্ততার আশা রাখি। লিঙ্কের জন্য অনেক ধন্যবাদ, এখনই দেখছি।
শুভেচ্ছা নিরন্তর।
সামুতে পোস্টগুলো পড়েছিলাম। এখানে কমপ্যাক্ট আকারে দেওয়াতে ভাল হয়েছে, কারো দরকার হলে রেফারেন্স হিসেবে খুবি কাজে লাগবে সেজন্য প্রিয়তে রাখলাম। অটিসটিক শিশুদের জন্য এফারমেটিভ একশান মনে হয় জরুরী। সবচেয়ে বেশি সমস্যা আমাদের মত দেশে, সেখানে হয়ত অটিস্টিক শিশুকে মা-বাবা ফাইজলামি ভেবে নির্যাতন করেন অথবা হুজুররা জ্বিনের আসর বলে বিভিন্ন ঝাড়-ফুঁক করে আরো সমস্যার বারটা বাজান। একটি ভন্ডামিহীন, সরলরৈখিক, সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তোলা যেত!
লেখকের মন্তব্য
অশেষ ধন্যবাদ নারুদা। ঠিক বলেছেন, অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন বড় জরুরি। দোয়া করবেন যেন সাধ্যমতো কাজ করতে পারি।
স্যালুট!
লেখকের মন্তব্য
পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ নস্টালজিক
খুব সময়োপযোগী পোস্ট। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, নুশেরা।
লেখকের মন্তব্য
আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ নীলাকাশ
খুবই দরকারী পোস্ট। এধরনের লেখা জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়াটা খুব জরুরী। সবাইকে অনুরোধ করব যেখানেই সম্ভব সেখানেই এই লেখাটির লিঙ্ক শেয়ার করতে। অটিজম নিয়ে কাজ করছেন বা কাজ করতে আগ্রহী, কিংবা অটিজম মোকাবেলা করছেন- এমন সকলকেই লেখাটি সাহায্য করবে।
নুশেরার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
লেখকের মন্তব্য
প্রিয় রিপনভাই, আপনার সমর্থন পেয়ে আমি ধন্য। ভালো থাকুন সব সময়, আপনার আরো অনেক অনেক অসাধারণ লেখা পড়ার সুযোগ দিন আমাদেরকে।
কেন্দ্রীয় চরিত্রে অটিস্টিক বেবীর আছে এমন একটা গল্প পড়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের একটা উপন্যাসে এর পরে নেতে অনেক পড়েছি তবে কিছু কিছু ব্যাপারে তেমন পরিস্কার ধারণা ছিল না। এমন এক্তা লেখা পেয়ে অনেক ভালো একটা ধারণা হলো। ৩০ এ এসে আর মাথা কাজ করে না , প্রবল আগ্রহ এ যাত্রায় সব বুঝিয়ে দিল, আগ্রহ কেবল নয় লেখার সরলতা আর গুরুত্ব আমাকে আঁকড়ে রেখেছিল।
অটিজম নিয়ে সরকারী আর বেসরকারী পর্যায়ে কি ধরণের কাজ হচ্ছে তা জানতে চাই।
লেখকের মন্তব্য
দুঃখজনক হলো গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্র অজ্ঞানতা অথবা অনবধানতাবশত খুব মিসলিডিং জ্ঞান দিয়ে আসছে, অথবা পাঠক-দর্শক খুব সংকীর্ণ একটা ধারণা পেয়ে আসছেন। এদিকে ডকুমেন্টারি বা সচেতনতামূলক স্ক্রিপ্ট অনাকর্ষণীয় বলে দায়ে না পড়লে এগুলো পারতপক্ষে সবাই এড়িয়ে যায়।
অটিজম নিয়ে কাগজে-কলমে-মাইক্রোফোনে প্রচুর কাজের কথা দেখা/শোনা গেলেও কাজের কাজ আসলে কতোটুকু হচ্ছে বলা মুশকিল। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কিছু তথ্য দিচ্ছি।
দেশের ১১টি সরকারি মেডিকেল কলেজে চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার বা শিশুবিকাশ কেন্দ্র খোলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন। কয়েকটি মেডিকেল কলেজে কাজ শুরু হয়েছে। এখানে শিশু বিশেষজ্ঞ, শিশু মনোবিজ্ঞানী, বিহেভিয়ারাল থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ প্যাথলজিস্টসহ একটি বিশেষজ্ঞ দল শিশুর আচরণগত অস্বাভাবিকতা যাচাই করে অটিজম আছে কিনা এবং সেক্ষেত্রে কী করণীয় সে বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার জন্য নিয়োজিত থাকার কথা। বাস্তবে দেখা যায়, মেডিকেল কলেজে শিশু বিভাগে দায়িত্বরত বিশেষজ্ঞ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এখানে কাজ করেন। বাকীদের পদ শূন্য। [বলা বাহুল্য; বিহেভিয়ারাল, অকুপেশনাল, স্পিচ থেরাপি ইত্যাদির বিশেষজ্ঞ আমাদের দেশে নেই। এই ফিল্ডে বিশেষজ্ঞ বলে নিজেদের দাবী করেন এমন কয়েকজনের কথা জানি, যাদের সম্বল বলতে ভারতের কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েকদিন-কয়েকসপ্তাহের প্রশিক্ষণ। তাদের কেউ কেউ শুরুতে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও পরবর্তীতে 'স্ট্রেস বেশি' বলে শুধু ধনী পরিবারে "প্রাইভেট প্র্যাকটিস" করেন, বাকী সময় অন্য পেশায় (ট্যুরিজম কোম্পানির ট্যুর গাইড পর্যন্ত আছেন) কাজ করেন।]
সরকারি "শিশু হাসপাতাল"গুলোতে শনাক্তকরণের কাজ হচ্ছে, পরামর্শও দেয়া হচ্ছে। মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু মনোবিজ্ঞানী বলেছেন, তাঁর চেম্বারে আসা শিশুদের মধ্যে ৮০ শতাংশই অটিজম সমস্যা নিয়ে আসে।
সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল মনে হয়েছে সেনাবাহিনীর "প্রয়াস"কে, যেহেতু তাদের অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা অনেক বেশি। তবে সেই বিশেষজ্ঞ-সঙ্কট এখানেও প্রকট।
কলাবাগানে হোপ অটিজম সেন্টার বছর দুয়েক আগে থেকে ১০ জন বাচ্চা এবং ১০ জন শিক্ষককে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বলা হচ্ছে গবেষণাধর্মী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি কাজ করছে। গবেষণার ফলাফল আমার অজানা। বাংলাদেশ এবিএ সেন্টার ফর অটিজমও বছর দুয়েক আগে কার্যক্রম শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, এতে কারিগরি কাজের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
সোয়াকসহ (সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অফ অটিস্টিক চিল্ড্রেন), অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে মূলত ভুক্তভোগী স্বচ্ছল/প্রভাবশালী অভিভাবকদের উদ্যোগে। এগুলোতে ২৪-২৫ বছর বয়স পর্যন্ত একেকজন অটিস্টিক ব্যক্তিকে রাখা হচ্ছে, তবে এরপর কী হবে তা কেউ জানে না। সোয়াক অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য টঙ্গীতে জমি কিনেছে। ডা. রওনাক প্রতিষ্ঠানের (অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন) জন্য একটি স্থায়ী জমি কিনতে চাইছেন, এবি ব্যাঙ্ক থেকে অনুদান হিসেবে গাড়ি পেয়েছেন। সোয়াকের সভাপতির কাছে শুনেছি, সোয়াক ২০১০ সালে নাকি আশি লক্ষ টাকা খরচ করেছে, সরকার দিয়েছে ৯৬ হাজার মাত্র।
কিছু কিছু স্কুল আছে, ভুক্তভোগী কোনো অভিভাবক খুলেছেন, পরে তাঁর নিজ জেলাতেও স্কুলের শাখা খুলেছেন। ঢাকা-রাজশাহীতে স্কুল আছে তরী ফাউন্ডেশনের, অভিভাবক মারুফা হোসেন পরিচালনা করেন। ঢাকা-বগুড়ায় স্কুল আছে আরেকজনের, এই মুহূর্তে নামটা মনে পড়ছে না। লিডি হকের লেখা হয়তো পড়েছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়েই মূলত, তিনি অভিভাবকদের মধ্যে অগ্রগণ্য।
কিছু আছে রীতিমতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বরিশালের এক এনজিওকর্মকর্তা, এক ভুক্তভোগী অভিভাবক আমাকে জানিয়েছেন, ঢাকায় পনেরো হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে চার দিনের এক কোর্সে গিয়ে দেখেন আমার বই (শিশুর অটিজম: তথ্য ও ব্যবহারিক সহায়তা) থেকে ফটোকপি করা চোথা বিলি করে রিডিং পড়ে কোর্স শেষ করে দেয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম অ্যান্ড বিহেভিয়ারাল ম্যানেজমেন্ট নামের একটি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেয় মাঝেমধ্যে, অংশগ্রহণকারী অভিভাবক কিছুটা উপকৃত হন। ঢাবির ক্লিনিকাল সাইকোলজির থিসিস পার্টের কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমার, তাদের খুব সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। এদেরকে প্রণোদনা দিতে হবে যেন বিশেষায়িত স্কুলগুলোতে কাজ করে তারা। নইলে কৃষি কলেজের বিএসসি, সিটি কলেজের বিকম পরীক্ষার্থী-- এরকম শিক্ষক কালেভদ্রে বিশেষায়িত স্কুলে পড়ানোর যোগ্যতা অথবা উদ্যম ধরে রাখতে পারবেন।
আপনার "সেই পুরাতন" লেখাটি ভীষনভাবে মন ছুঁয়ে গেল। প্রিয়তে রেখেছি।
ভাল থাকুন।
আপনার 'সেই পুরাতনে' মন্তব্য করা যাচ্ছে না। কারন বুঝতে পারছি না।
লেখকের মন্তব্য
নীলাকাশ-- অশেষ ধন্যবাদ, ভালো থাকুন আপনিও।
উদরাজী-- মন্তব্যের অপশনটা বন্ধ রেখেছি। এমনিই।
আপু, কাল রাতে ডেইলি টেলিগ্রাফের সাথে দেয়া দেয়া ইউকএন্ড ম্যাগ বডি এ্যান্ড সউলে ছোট্ট একটা তথ্য জানলাম, ব্রিসবেন ব্রেইন ইনসটিটিউট সম্প্রতি মৌমাছির মগজ নিয়ে একটি গবেষনাপত্র মজা দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, মৌমাছির মগজ একটি সিসেম সিডের মত হল্ওে এর গঠনপ্রণালী এবং কার্যপ্রণালী অটিজম এবং সিজোফ্রেনিয়ার মত মানসিক প্রতিবন্ধকতায় সহায়ক হতে পারে। আরো জানার আগ্রহ হলে আপনি গুগলে সার্চ দিয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ প্রলয়। দেখে নেবো। আশা করি মৌমাছির মগজ খেতে বলবে না