নুশেরা-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

দুটো পুরনো ব্লগপোস্ট।
উৎসর্গ করছি সামহোয়্যারইনের পুরনো ব্লগারদের,
যারা একদা প্রিয়পোস্ট হিসেবে এদের ঠাঁই দিয়েছিলেন
এবং
সহৃদয় সেই পাঠকদের,
যারা চোখ ভেজাতে মন চাইলে এগুলো পড়তেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।
===========================================================
অন্য অলিম্পিক
আমার শিশুকন্যা অপনা মেলবোর্নে যে স্কুলে পড়ে, তার কর্মকাণ্ড মূলধারার স্কুলের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। বিভিন্ন কাজে সক্রিয় অংশগ্রহনের জন্য অভিভাবকদের হাজিরা দিতে হয়। প্রতিদিনই তার নোটবুকে কোনো না কোনো নোটিস থাকে। ক'দিন আগে জানিয়েছিল, মঙ্গলবার স্কুলের অলিম্পিক। গতকাল খাতায় লিখে দিল স্কুল অলিম্পিকে ওকে নীল রঙের পোশাকে স্কুলে পাঠাতে। ওদের ক্লাস, অর্থাৎ ফোর বি-র রং ঠিক করা হয়েছে নীল। তাই আজ সকালে ওকে স্কুলের জ্যাকেট আর ট্র্যাকপ্যান্টের সঙ্গে নীল জামা, নীল মোজা আর ছোট্ট চুলে নীল রিবন বেঁধে পাঠালাম। আমরা, মানে বাচ্চাদের বাবামায়েরা নির্ধারিত সময়ে স্কুলের বিশাল মাল্টিপারপাস ভবনটাতে গেলাম।
দুদিকে কাঁচের দেয়ালঘেরা বিশাল হলরুমটাতে দেয়াল ঘেঁষে রাখা চেয়ারগুলোতে আমরা বসি। দরজা দিয়ে সারবেঁধে ঢোকে স্কুলের খুদে অলিম্পিয়ানরা। ওই দেড়ঘন্টায় ফোর বি, ফাইভ বি, সিক্স এ, বি-- এই চারটি ক্লাসের খেলা। এখানে বলে রাখি, এরা ক্লাস ফোর-ফাইভ-সিক্স নয়; স্কুলের প্রথম বর্ষের পাঁচবছর বয়সী বাচ্চা সবাই। এদের সবারই কিছু না কিছু বিকাশগত সমস্যা আছে; এই স্কুলটি একটি বিশেষ অটিস্টিক স্কুল। মানসিক বিকাশের ধরণের ওপর নির্ভর করে তাদেরকে ওয়ান এ থেকে সিক্স বি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসে রাখা হয়েছে। প্রতি ক্লাসে ছ'জন করে বাচ্চা, তিনজন করে শিক্ষক। প্রত্যেক শিক্ষকের হাত ধরে আছে দুজন করে শিশু।
এরপর খেলা। হাল্কা মজার ইভেন্ট সব, হারজিতের কিছু নেই। একেক ক্লাস একেক ব্লকে রাখা ক্রীড়াসামগ্রী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তিনধাপ মই বেয়ে বারের ওপর সোজা হেঁটে আবার নেমে ঢালু একটা সারফেইসে গড়াগড়ি দেয়া হলো জিমন্যাস্টিক্স। ছয় ইঞ্চি উচ্চতার ক'খানা হার্ডল একজন একজন করে পেরোলেই হলো। রিলে দৌড়ের পার্টনাররা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে; বন্ধুর হাতে ব্যাটন দিয়ে তার হাতটা ধরেই আবার ফিরতি দৌড়। অক্ষর বা নম্বর লেখা ছোট্ট কুশন ছুঁড়ে বক্সে ফেলার নাম শর্টপুট। স্টাইরোফোমের নুডলটা ছুঁড়লেই জ্যাভলিন থ্রো। ট্র্যাম্পোলিনে এক এক করে ঝাঁপানো। শিক্ষকদের নিখুঁত নজরদারিতে কেউই কোন ইভেন্ট মিস করছেনা, শরীরে কোথাও চোট পাচ্ছে না।
প্রতিযোগিতার লড়াই নেই, শুধুই অংশগ্রহণ। তারপরও শিশুদের সবার জন্য সেটা খুব উপভোগ্য হচ্ছে না। এরা সেই দুর্ভাগার দল, যাদের মস্তিষ্ক অনুদ্ঘাটিত কোন বিচিত্র কারণে খুব সাধারণ কিছু কিছু বিষয়ও ধারণ করতে অক্ষম। কারও সমস্যা অক্ষর-রঙ-আকৃতি চেনায়। কেউ অচেনা মানুষ সহ্য করতে পারে না। কেউ বা আই কন্ট্যাক্টে অক্ষম; সরাসরি কারো দিকে তাকাতে পারে না। নানান রকম ফোবিয়া আছে কারো কারো। ভয়ার্ত মুখের দেবশিশু ছোট্ট হাতের সবটুকু শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে তার টিচারের হাত, মুখ লুকিয়ে চোখ বুঁজে এগিয়ে চলছে কোনোমতে । দূরত্বের অনুমানে বিভ্রান্ত শিশু ছ'ইঞ্চির হার্ডলটা পেরোতেও ঠেকে যাচ্ছে প্রতিপদে। হাতের ব্যাটন রিলে'র সঙ্গীর দিকে এগিয়ে দিতে হবে, শুধু সেটুকু বুঝতেই বড় কষ্ট হচ্ছে কারো। তবু সবাই ওয়েল ডান; সবার জন্যই হাততালি, ফ্যান্টাস্টিক পারফর্ম্যান্স।
"ওয়ান" লেখা একটাই ভিক্টরি স্ট্যান্ড; একে একে সবাই সেটায় দাঁড়িয়ে "গোল্ড মেডেল" পরে নিল গলায়। হাইপারঅ্যাকটিভ কয়েকজন টিভিতে দেখা অলিম্পিক-বিজয়ীর ভঙ্গিতে মেডেলে চুমু খেল; ধারাভাষ্যকারকে কয়েকজন ইন্টারভিউও দিল। আমার কন্যাকে প্রশ্ন করা হল সে ফার্স্ট হয়ে গোল্ড নাকি সেকেন্ড হয়ে সিলভার মেডেল চায়। সে গম্ভীর মুখে জানালো, সেকেন্ড ওয়ান।
অলিম্পিকের পাট চুকলে যার যার ঘরে ফেরার তোড়জোড়। ড্রাইভওয়েতে আমরা কয়েকজন, কিছুক্ষণ দাঁড়াই। নিকোলাসের সদালাপী ল্যাটিন আমেরিকান বাবামা; ডেভিডের সহজসরল ভিয়েতনামী বাবা; থমাস-জেমস জমজদের অসম্ভব রূপবতী ইটালিয়ান মা; অপনার বাংলাদেশী মা। ওদের সবার শুকনো মুখে বিষণ্ণ হাসি; আয়না ছাড়াই বলে দিতে পারি আমাকে দেখেও ওরা ঠিক তাই ভাবছে।
আমরা আমাদের দেবশিশুদের কথা বলি। কেউ পড়তে শিখলো না এখনও; কেউ সেটা পারে তো কারো সঙ্গে কথা বলতে পারে না; অপ্রকৃতস্থ চাহনি-আচরণে অস্বস্তির যোগান দিচ্ছে কেউ; খুব সাধারণ রেসপন্স-কগনিশন ব্যাপারগুলোই আবার কারো নেই... ... ... ওদের প্রত্যেকের দুটো করে বয়স, দ্বিতীয়টি "বুদ্ধিবৃত্তিক"; কবে দুটো বয়সের ব্যবধান কমে একটু স্বস্তিকর পর্যায়ে আসবে? তিন বছর পর এই স্কুলটা ওদের আর রাখবে না, কোথায় যাবে ওরা? ডে কেয়ারে অচ্ছ্যুত... মূলধারার কোনো স্কুল ওদের নিতে চায় না... কোনোমতে কোথাও একটু ঠাঁই জুটলে বুলিং আর র্যাগিংয়ের নিশ্চিত নিয়মিত শিকার... কোথায় যাব আমরা? আর তারও পরের... আরো অনেক, অনেক পরের জীবনে, যখন আমরা থাকবোনা, ওরা তখন কীভাবে থাকবে? কেমন হবে সে জীবন... ?
শীতের বিষণ্ণ আলোয় মুখগুলো ক্লান্ত দেখায়; হাসিগুলো ক্রমশ বিষণ্ণতর হয় । এ দেশেই ওরা অসীম শূন্যে সূক্ষ তারের ওপর হাঁটছে, আমার জন্য নিজদেশে কী অপেক্ষা করে আছে! কুমারের মা, শিখপত্নী কিরণ, গলার পবিত্র লকেটটা কপালে ছোঁয়ায়। তাকে দেখেই হয়তোবা; জেমসের মা গ্যাবি দীর্ঘশ্বাসে টেনে টেনে বলে-- জিইসাআআস... ।
আশা আর প্রার্থনায়, আশাভঙ্গ আর হতাশায়- আমরা আবার বাইরের পৃথিবীতে পা রাখি।
যে পৃথিবী মানেই প্রতিযোগিতা।
যেখানে জয় যোগ্যতমের ।
দেবশিশু এখানে চিরশিশু থাকে না, আঁকড়ে ধরার মতো হাত এখানে কেবলই হারিয়ে যায়। ছয় ইঞ্চি হার্ডলের একক রেইসের অলিম্পিক এই পৃথিবীর নয়।
১৯ শে আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪৩
===========================================================
চকোলেটময় মানুষেরা
১.
অদ্ভুত একটা কোর্সে ততোধিক অদ্ভুত ক্লাসে পড়তে গিয়ে আমাদের পরিচয়। নানান বয়সী শিক্ষার্থী, বিচিত্র অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড। একটাই কমন ফ্যাক্টর; অটিজম ইন্সটিটিউটের এই কোর্সে আসার কথা কারও দূরতম কল্পনাতেও কোনদিন আসেনি। নিয়তির টানে এখানে এসেছে কিছু মা, কয়েকজন বাবা, জনাদুয়েক গ্র্যান্ডপ্যারেন্ট। মহিলারা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
শান্ত নির্জন আবাসিক এলাকার কয়েকটা পুরনো বাড়ীতে গড়ে ওঠা ইন্সটিটিউটের একদম ভেতরের দিকে কোণার বাড়ীটাতে আমরা ক্লাস করি। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে প্রথমে ছোট্ট কিচেন। থরে থরে সাজানো চকোলেট আর কুকির জার; হরেক রকম অনুষঙ্গসহ চা-কফি দুধ-চিনির মিনিপ্যাক সম্ভার। কিচেন পেরিয়ে ক্লাসরুম। দুই সারিতে অর্ধবৃত্তাকারে বসার ব্যবস্থা। দেখে মনে হয় চিত্রকরের ঘর ছিলো একসময়; দেয়ালে প্যাস্টেলের কিছু নমুনাসহ তিনদিকে কাঁচের বিশাল জানালা।
২.
প্রথমদিকের একটা ক্লাসে কিছু তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করানো হচ্ছে; সবার বোধগম্য করে গ্রাফ আঁকার প্রাথমিক ধারণা দিচ্ছেন একজন। হাত গুটিয়ে বসে আছি দেখে এগিয়ে এলেন। স্ট্যাটিসটিকস কিছু পড়েছো বলে মনে হচ্ছে-- বলেই হেসে আগাম কফিব্রেকের অনুমতি দিয়ে দিলেন। কিচেনে গিয়ে ভাবছি কী নেয়া যায়, অমনি দেখি আরেকজন বেরিয়ে এসেছে ক্লাস থেকে। নেইমব্যাজ বলছে, গ্যাবি, জেইমস ও থমাসের মা। এগিয়ে এসে কথা শুরু করে।
-নুশিরা, আপৌনার মা, উচ্চারণ ঠিক হয়েছে?
-যথাযথ। তোমাকেও পাঠিয়ে দিলো?
-আমিই চলে এলাম। এই বোরিং ক্লাস তোমার-আমার না করলেও চলবে। আসলে ব্যাপারটা কী জানো, এখানে যারা এসেছে বেশীরভাগ হাইস্কুল ড্রপআউট। দুটো এক্সিস চিনতেই এদের সমস্যা, গ্রাফ কি বুঝবে!
-তুমি জানলে কেমন করে, সবার ফাইল দেখেছো বুঝি?
গ্যাবি আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে।
-ইন্ডিয়ান? বা ইন্ডিয়ার কাছাকাছি?
-শেষেরটা।
-এখানকার সিটিজেন হলেও নিজের দেশেই বেড়ে উঠেছ, তাই না?
-তাও না। একেবারেই পরগাছা। বলতে পারো কচুরিপানা, স্রোতে ভেসে এসেছি।
-কচুরিপানাটা আবার কী বস্তু! এনিওয়ে, আই বিলং টু দিস সোসাইটি, দিস ভেরি কমিউনিটি। কাজেই দশপনেরজন লোক থাকলে কার দৌড় কদ্দূর তার একটা আন্দাজ আমার থাকতেই পারে, মাই ডিয়ার! নাও, পানি গরম হয়ে গেছে, আমাকে একমগ দাও দেখি।
অসামান্য রূপবতী, ফূর্তিবাজের ভঙ্গিতে কথা বলা এই মেয়ে(অথবা মহিলা)কে আমার মনে ধরে গেলো। পরদিন থেকে ক্লাসে এর পাশে বসতে হবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।
কফিব্রেক হয়ে গেছে, ক্লাসের সবাই একে একে এগিয়ে আসছে এদিকে, আমরা একপাশে জানালার দিকে সরে যাই। খরাপীড়িত এই দেশে বৃষ্টির দেখা মেলা ভার। যৎসামান্য যা ঝরে শুধু শীতকালেই। ঝমঝম ঝুপঝুপ কিংবা টিপটিপ নয়; আমাদের চেনাজানা বৃষ্টির চেহারার সঙ্গে এর মিল সামান্যই। কনকনে ঠাণ্ডার অনুষঙ্গ ঘন কুয়াশা জমে জমে সূক্ষ ফোঁটায় অবিরাম ঝিরঝিরিয়ে পড়ে। কখনও কখনও আরেকটু জোরালো হিমঠাণ্ডা সূঁচফলা। বাইরে উঠানে অচেনা গাছের ঝাঁকড়া পাতাশাখা হঠাৎ বাতাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। তখন বোঝা যায়, বাষ্পজমা চতুষ্কোণটা আসলে একটা জানালা; ঝাপসা কাঁচে জলরঙের কণায় আঁকা রিভার্স পেইন্টিঙ কিংবা লিথোগ্রাফ নয়!
৩.
পরদিন থেকে ক্লাস শুরুর আগে, শেষে, অথবা ব্রেকে গ্যাবির সঙ্গে ছোটখাট আড্ডায় বসা হয় আমার। ক্লাসের এটাসেটা নিয়ে কথা। এই কোর্সের খুঁটিনাটি বিষয়ে গ্যাবির জ্ঞান আমার চেয়ে অনেক বেশি।
- ক্লাসটা কেমন যেন হলো। ভেবেছিলাম, ভালো কিছু টিপস পাবো...
- মাই ফুট! বিহেভিয়ারাল থেরাপিস্ট হিসেবে এর বাজার ভালো না; তাই সময় দিয়েছে এখানে। আসলে করতে এসেছে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বিজ্ঞাপন।
- বলো কী! ইন্সটিটিউট সরকারী না?
- তো? এই যে স্পিচ থেরাপিস্ট, বিহেভিয়ারাল থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ব্লা ব্লা সব আসছে, এরা কেমন চার্জ করে টের পাওনা? এইখানে গেস্ট স্পিকার হয়ে এসে বাণিজ্যের টোপ ফেলে যায়। আমরা সব বোকা মাছ, টোপ গিলে ফেলি।
- ইয়ে গ্যাবি, আমার কিন্তু মনে হয় এখানে আমরা যা গিলি তা হলো চকোলেট। এই আমাকেই দেখো, মিল্ক চকোলেট ছাড়া কিছু ছুঁতাম না, সেই আমিই এখন এই তিতকুটি ডার্ক চকোলেট মুখে নিয়ে ক্লাস করি।
- হুমম। জানো, এই চকোলেট এখানকার জন্য ফ্রি দেয় কয়েকটা কোম্পানী। ইস্টারের মৌসুম ছাড়া আর কোথাও এই এগ-শেইপ চকোলেট পাবে না তুমি। পাবে শুধু এইখানে। স্বাদ তেমন কিছু না, আর সাইজটা দেখো একবারে মুখে পুরে চুষতে পারার মতো। এরা জানে এখানে কারা আসে, কেন আসে। চকোলেটের প্যাকটাতে কিছু বাড়তি কথাবার্তা লেখা দেখবে। ডিপ্রেশনে ফূর্তি চাইলে চকোলেট খেয়ে দেখতে পারো, এই যে দ্যাখো, এটা, তারপর এটা... ... তোমার নেশা ধরে গেলে শেষ পর্যন্ত ওদেরই লাভ... ...
৪.
প্রতিদিন চকোলেটের বাস্কেট প্রায় শেষ হয়ে যায়, র্যাচেল নামের মহিলাটি মুঠো ভরে চকোলেট খায়। তিনটি সন্তানই উচ্চমাত্রার অটিজমে আক্রান্ত; তাদের একজোড়া যমজ। বিশেষজ্ঞ বক্তাকে কোন প্রশ্ন করতে গিয়ে তার গলা কেঁপে ওঠে কান্নায়; মুখ নীচু করে দীর্ঘ সোনালি চুলের আড়ালে চোখ মুছে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে সে। সেই সময়টাতে আমরা গভীর মনোযোগে নোট নিই। ভূতপূর্ব আইনজীবী র্যাচেল এখন চরম ডিপ্রেশনের রোগী। সঙ্গে আসে এক বান্ধবী; দুঃসময়ের বন্ধু বিষয়ক পুরনো প্রবাদটি মনে করিয়ে দেয় তার উপস্থিতি। তার কাছ থেকে জানা হয়, এই দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে র্যাচেলের স্বামী অন্য প্রদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
৫.
কনকনে কুয়াশাভেজা ঠাণ্ডায় বহুদূর থেকে সাইকেল চালিয়ে ক্লাসে আসে চুপচাপ ধরণের অ্যান্ড্রু। রেইনকোটে নিজেদের মুড়ে বাবার সঙ্গে আসে তার ছেলে; সাইকেলের পেছনে বিশেষ সিটে বসে । ক্লাসের একপাশে বসে বসে একটানা গোঙায়, থেকে থেকে দেয়ালে মাথা ঠুকতে চায়। জন্মের পর থেকে স্বাভাবিক ঘুম নেই শিশুটির; দুশ্চিন্তায় মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটায় তার মা এখন পাকাপাকিভাবে অ্যাসাইলামের বাসিন্দা। ক্লাসে আমরা সবাই পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কাজটি মোটামুটি সম্পন্ন করে ফেলেছি; কোর্সের অংশ হিসেবেই। তখন জানা হয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাবামায়ের ছেলে হিসেবে পারিবারিক জীবনের স্বপ্নপূরণের আশা নিয়েই সংসার শুরু করেছিলো অ্যান্ড্রু। ছেলের আর্লি ইন্টারভেনশনের খরচ জোটাতে একে একে চাকরি-বাড়ি-গাড়ি সব খুইয়েও শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে দেখতে চায় সে। অ্যান্ড্রুর মতো চরম অবস্থায় এখানে হয়তো আর কেউ নেই, তবু আমরা সবাই শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই। কী আছে শেষে, কেউ জানি না।
হায়, মানুষ যদি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতো!
৬.
গাইড ডগ বা সাহায্যকারী কুকুর বিষয়ক আলোচনা হয় একদিন। ত্রিশ থেকে ষাট হাজার ডলার খরচ করে বিশেষ জাতের একেকটা কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এদের আছে একবছর মেয়াদী বিশেষ লাইসেন্স, তাতে মাইক্রোচিপ নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ করা থাকে। সাধারণভাবে যেসব জায়গায় পোষ্যপ্রাণীর প্রবেশ নিষিদ্ধ সেখানে এই লাইসেন্সের গুণে এরা প্রবেশাধিকার পায়। এদের প্রশিক্ষণের পদ্ধতি অথবা প্রজনন ক্ষমতা লোপের প্রচলিত ব্যবস্থা পশুক্লেশের পর্যায়ে পড়ে কিনা সেটা ভাবার অবকাশ দেয়না তাদের সেবাকর্ম। চলৎশক্তিহীন নিঃসঙ্গ অতিবৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধকতার শিকার ব্যক্তিকে সঙ্গ বা পাহারা দেয়াসহ নানান কাজে আসে এই কুকুর। জরুরি অবস্থায় ট্রিপল জিরো ডায়াল করা থেকে শুরু করে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার মতো কাজেও সাহায্য করতে পারে। র্যাচেলের মতো কারও জন্য খুবই প্রয়োজনীয় এই কুকুর; বাচ্চাদের একা রেখে বাথরুমে যাওয়াও মুশকিল বেচারির। কিন্তু এর খরচ জোটাবার সঙ্গতি নেই বেশিরভাগের।
৭.
কোর্সে অটিজম আক্রান্ত সন্তানের বাবার মেয়েবন্ধু বা মায়ের পুরুষবন্ধুরও প্রবেশাধিকার আছে; কিন্তু তেমন কাউকে কখনো পাওয়া যায়নি এখানে। এটা নিয়ে কোর্স সমন্বয়কদের সঙ্গে গ্যাবি ঠাট্টা করে একদিন। অ্যান্ড্রুর মুখ যথারীতি ভাবলেশহীন; তবে অন্যদের হাসিতে র্যাচেল যোগ দেয়।
এই ব্যাপারটা অদ্ভুত; এখানে এলেই যেন রাজ্যের অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর বিষণ্ণতা জেঁকে বসে সবার মাঝে; কোন ক্লাসেই বক্তা ছাড়া আর কেউ কখনো হাসে না! দিন দিন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। কোর্স কোঅর্ডিনেটররা মাঝেমধ্যে হাসিঠাট্টার চেষ্টা করেন, সেই চেষ্টা সফল হয় না। জেনেল আর মার্গারেট, সংক্ষেপে জেইন আর মার্গি, যথাক্রমে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও আমলা, একদিন গল্পে গল্পে বললেন, খুব চিকেন পক্স হচ্ছে চারদিকে, গর্ভবতী কেউ আছেন কিনা। বলেই বছর পঁয়ষট্টির একজনকে সমবয়সী আরেকজনের প্রশ্ন: আর ইউ প্রেগন্যান্ট, সুইটি? খুব আশা নিয়ে সবার দিকে তাকালেন, একজনও হাসলো না! পরের সপ্তাহে দু'জন মনোবিদের আগমন ঘটে; উৎফুল্ল থাকার প্রয়োজনীয়তা আর কলাকৌশল নিয়ে কথা বলবেন তাঁরা। দু'জনই পুরুষ। এবার সোয়াইন ফ্লুর প্রাদুর্ভাব দিয়ে আলাপ শুরু, সেই একই সংলাপ এখানেও অভিনীত হয়; আর ইউ প্রেগন্যান্ট, অ্যাডাম? বোঝা গেলো, ভারাক্রান্ত মনের মানুষকে হাসাতে গৎবাঁধা কিছু ঠাট্টার চল এই লাইনে আছে। এইবার গ্যাবি একেবারে বানান করে হাসে, হা, হা, হা।
তার হাসিটি সংক্রমিত করে সবাইকে, চিকেন পক্স অথবা সোয়াইন ফ্লুর মতোই।
৮.
ক্লাসে মাঝে মাঝে বিভিন্ন কেইস স্টাডির ভিডিও দেখানো হয়। কেউ একজন টিভি প্রোগ্রামের ক্লিপ এনে দেখান একদিন। দৈনন্দিন ঘটনাবলীর প্রতিবেদনমূলক অনুষ্ঠান; তাতে এক পর্বে ক্যামেরার সামনে শহরতলীর জীর্ণ ঘরে বৃদ্ধা জেনিফারের আকুতি দেখা যায়। গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত ছোটভাইয়ের বাকশক্তিহীন ছেলেকে লালনপালন করছেন ছাব্বিশ বছর ধরে; অটিজম ছাড়াও হাঁপানি ও মৃগীরোগ আছে ত্রিশোর্ধ ডেভিডের। অশীতিপর জেনিফার বুঝতে পারছেন তার নিজের সময় শেষ হয়ে এসেছে। কেউ যদি ডেভিডের দায়িত্ব নেয়, তিনি শান্তিতে চোখ বুজতে পারতেন। করজোড়ে মিনতিরত বৃদ্ধার স্টিলশটে প্রতিবেদন শেষ হয়।
দর্শকের সারিতে বসা সবার চোখ জ্বালা করে, অজান্তেই পরস্পরের হাত আঁকড়ে ধরে সবাই। নিজেদের সংগঠিত করার গুরুত্বটা আবার বোঝা যায়। ভুক্তভোগীদের সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্র তৈরি করতে কাজ করে কিছু প্রতিষ্ঠান। সতীর্থ জুলি সেরকম একটি সংগঠনের হয়ে কাজ করে, সেখানে আমরা কয়েকজন যাতায়াত করি। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে আসা অভিবাসী যৌথ পরিবারগুলোর কল্যাণে বেশ বড়সড় আকার নিয়েছে সেটি। প্রতিবন্ধকতা-কল্যাণ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির এক কর্তাব্যক্তিও একদিন কিছু সময় দিলেন, সমস্যা আর প্রয়োজনগুলো বোঝার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজেও এমন এক অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন। খুবই আন্তরিক তার ব্যবহার, সবাইকে বললেন ডাকনামে ডাকলে তিনি খুশি হবেন।
৯.
কিছুদিনের মধ্যেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সেই সাংসদ, বব তার নাম, অপ্রত্যাশিতভাবে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে যান। ম্যারাথন, পাহাড়ী বনপথের ট্রেইলে দীর্ঘ পদযাত্রা এসবে অংশ নিয়ে প্রচুর ফান্ডের ব্যবস্থা করেন। অর্থাভাবে থমকে যাওয়া আরেকটি অটিস্টিক স্কুলের নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয় এই প্রদেশে। ডিটেকশন আর আর্লি ইন্টারভেনশনের দীর্ঘ কিউ সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বলাবাহুল্য, ক্ষুদ্র সংগঠনটিতে যথেষ্ট প্রাণের সঞ্চার ঘটে এসব ঘটনায়।
১০.
দিন চলে যায়। কোর্স শেষের পথে। হঠাৎ একদিন খেয়াল করি, সেই সংগঠনের কোন আয়োজনেই আমার প্রিয় কোর্সমেইট গ্যাবিকে দেখা যায় না। পরদিনই ক্লাসে তাকে বলি ব্যাপারটা। সে জানায়, আগ্রহী নয়। কিন্তু কেন? একটু রাগতস্বরেই জিজ্ঞেস করে ফেলি। গ্যাবির কাণ্ডকীর্তির কিছুটা এতোদিনে আমার জানা হয়ে গেছে। তার স্প্যানিয়ার্ড শ্বশুরশাশুড়ি জেইমস আর থমাসের অটিজমের বিষয়টি জানেন না। তাদেরকে খুশি করার জন্য সে এক অভিনব অভিনয় শুরু করেছে। লাঞ্চব্রেকের পর ছেলেদেরকে অটিস্টিক স্কুল থেকে নিয়ে মূলধারার স্কুলে দিয়ে আসছে, বুড়োবুড়ি ওখান থেকে নাতিদের ফেরত আনতে যাচ্ছেন। এই ক্যামেরাবিহীন শুটিংএর জন্য চার্চ-পরিচালিত ওই স্কুলকে নাকি বছরে ছত্রিশ হাজার ডলার গুণে দিতে হবে তাকে। এদিকে দিব্যি ফূর্তিবাজের ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, লম্বা চুলগুলো ছেঁটে গোলাপী রং লাগিয়েছে, সবকিছু করার তার সময় হচ্ছে, শুধু প্রতি দু'সপ্তাহে একঘন্টা বরাদ্দ করা যাচ্ছেনা? মন্ত্রী বব পর্যন্ত দু'মাসে একবার করে আসে সেখানে!
গ্যাবি জানালার দিকে এগিয়ে যায়। বাইরের ঝড়বৃষ্টি দেখতে দেখতে বলে, সত্যিই জানতে চাও? তাহলে বলি, বব আসে বলেই আমি যাই না সেখানে।
- তুমি কি কট্টর অ্যান্টিলেবার? নাকি চেনো ওকে?
- বব আমার সঙ্গে একই স্কুলকলেজে পড়তো। ইন ফ্যাক্ট উই ওয়্যার ইন লাভ ফর আ কাপল অফ ইয়ার্স ওয়ান্স আপন আ টাইম। আমরা দুজনেই মেডিটেরানিয়ান কমিউনিটির, ভালো যোগাযোগ ছিলো।
- তারপর? এমন অপ্রত্যাশিত গল্পের সম্ভাবনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
- তারপর আর কী, আমার বাবার ক্যান্সার হলো, ব্রেস্ট ক্যান্সার, পুরুষদের মধ্যে খুব রেয়ার ঘটনা বুঝতেই পারছো। সেই সময় সে খুব নিষ্ঠুর কিছু ঠাট্টা করেছিলো এটা নিয়ে। আমি খুব শকড হই, সরে আসি তার কাছ থেকে। তখন খেয়াল করলাম, শারীরিক বা মানসিক সমস্যায় থাকা মানুষদের নিয়ে সে খুব সহজে হৃদয়হীন কথাবার্তা বলে ফেলতে পারে। এই এখনও, তার পোর্টফোলিও নিয়ে সে মোটেই খুশি না। ফান্ডরেইজিংএর জন্য যা করেছে, বলতে পারো তার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের জন্য এক ধরণের বিনিয়োগ। সেটা সে কাছের মানুষদের মধ্যে বড় গলা করেই বলে। আমাদের এখনও কিছু কমন আত্মীয়বন্ধু আছে, আমাকে এসব জানিয়ে দেয় সবাই। আমি জানি, আমাকে ওখানে দেখলে সে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে আনবে না। ঝানু রাজনীতিবিদের মতো বক্তৃতা দিয়ে যাবে, অনেক আশার আলো দেখিয়ে কথা বলবে, সবার দিকে ঘুরে ঘুরে... ... এক ফাঁকে আমার দিকে একসেকেন্ড বাড়তি তাকিয়ে করুণার একটা দৃষ্টি দেবে... ওহ্ গড, আমি সেটা সহ্য করতে পারবো না, কিছুতেই না... ...
গ্যাবির কণ্ঠ বুজে আসে। তার মাথা নীচু, তর্জনী আঁকিবুকি কাটছে কুয়াশাজমা জানালার ঘষা কাঁচে। হিজিবিজি ছবি তৈরি হচ্ছে, বিন্দু বিন্দু কুয়াশায় সেই ছবি ঝাপসা হয়ে একসময় আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
১১.
পরের ক্লাসটা ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। গ্যাবিকে কিছু একটা বলা দরকার বুঝতে পারছি, ঠিক কী বলা যায়, বুঝে উঠতে পারছি না। ক্লাস শেষে দেখি সেও দাঁড়িয়ে আছে কিচেনে, চকোলেটের স্তূপের পাশে, হয়তো আমার অপেক্ষায়। সবাই বেরিয়ে গেলে আমরা বারান্দায় দাঁড়াই।
- গ্যাবি আমি স্যরি, আমার ওভাবে বলা ঠিক হয়নি, তুমি হয়তো ভুলেই ছিলে, আমি খুঁচিয়ে তুললাম...
- এগুলো ভোলা যায়, বলো? তুমি হলে ভুলতে পারতে?
- কঠিন প্রশ্ন। তবে মনে রেখেও বা কী হয়! আমাদের এক লেখক বলেছেন, "ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই"।
- দেখি সেই ক্ষমতা তোমার আছে কিনা। তোমাকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কুৎসিত গালিটা কে দিয়েছে বলতে পারবে? অথবা গালিটা কী ছিল?
এ কী অদ্ভুত প্রশ্ন! আমার কিছু বলতে হয় না, তার আগেই গ্যাবি আবারও মুখ খোলে।
- ঠিক আছে, স্ল্যাং বাদ। তোমাকে সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে নিষ্ঠুর কথাটা কে বলেছিলো, কী বলেছিলো? মনে করতে পারবে?
- কেউ সেলফ সেন্টার্ড বলেছিলো...
- আমি জানতাম এটা তুমি মনে করতে পারবে। ভুলে যাবার বা ভুলে থাকার ক্ষমতা যাই হোক না কেন, সাফার করার ক্ষমতা আমাদের ঠিকই দেয়া হয়েছে। পর্বতসমান ক্ষমতা... ... ও আচ্ছা, চুলে গোলাপী ডাই করিয়েছিলাম কেন শোনো। ব্রেস্ট ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের একটা অনুষ্ঠান ছিলো। আমার চুল দিয়ে দিলাম, দুজন রোগীর জন্য উইগ বানানো যাবে... ... এই, জানো, আমার দুই ছেলেই কিন্তু তোমার মেয়েকে খুব পছন্দ করে, এখন তুমি ভেবে বলো কাকে তোমার মেয়ে পছন্দ করবে, ওরা জমজ হলেও তেমন মিল নেই, একজন ফুটি খেলতে চায় আরেকজন চায় রকস্টার হতে... ...
দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টাতে পাল্টাতে মুখের অভ্যস্ত হাসিটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে গ্যাবি।
১২.
কার জন্য মাটি কাঁপাই কার তরে আকাশ
কার জন্য গায়ে মাখি হাজার পরিহাস...
আমি তোমার জন্য কাব্য কুড়াই তোমার জন্য গান
লিখি তোমার আমার বান ভাসানি ভীষণ অভিমান
পাহাড় থেকে পাথর কুড়াই সাগর থেকে হাওয়া
আমার সন্তান সে তো তোমার কাছে পাওয়া...
গানটা শুনবেন? এখানে আছে।
১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:২৮
মন্তব্য