লেখকের ক‌থা

সদর দরজা

তারা কি তবে জ্ঞানপাপী

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আমাদের দেশে দিনে দিনে বাড়ছে উচ্চ শিক্ষিতের হার। এটি দেশের জন্য খুব ভালো একটি দিক। কারণ, শুধুমাত্র একটি শিক্ষিত জাতিই পারে দেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছে দিতে। ধীরে ধীরে আমরা সেই উন্নয়নের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। এই খুব সাধারণ কথাগুলোই আজ আমাদের আশাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে উড়ন্ত ফানুসের মত, উঁচু থেকে আরো উঁচুতে।

ছোট বেলা থেকেই মা-বাবাদের আপ্রাণ চেষ্টা শুরু হয় আমাদের মানুষ করার জন্য। প্রথমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধ, একেকটি ধাপ পেড়িয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাট চুকানো। আবার যুদ্ধ শুরু ভালো একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে পারার জন্য। এ যুদ্ধ শেষ হয় জীবণে প্রতিষ্ঠিত হতে পারার মাধ্যমে।

ছোটবেলা থেকেই আমরা সন্তানের মাথায় বুনতে থাকি “পড়া-শোনা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে” এ জাতীয় বুলি। এতে করে তাদের আশার বেলুন বাড়তে থাকে দিনে দিনে। মানুষ হওয়ার পরে কিছু ব্যতীক্রমী গল্পও তৈরী হয়। এমন কিছু ব্যতীক্রমী গল্পই আজ আপনাদের বলছি।

ক) বছর খানেক আগের কথা। সেমিস্টার ব্রেকে বাড়ি গিয়েছিলাম। বিকেলে কাউকে না পেয়ে একাই হাঁটতে বের হলাম। অল্প কিছুদূর যেতেই এলাকার দুই বড়ভাইয়ের সাথে দেখা। ইমন ভাই এবং সজীব ভাই। কথা প্রসঙ্গে আমার পড়াশোনার কথা এলো। সজীব ভাই অনেক পরামর্শ দিচ্ছিলেন যেন ভালো করে পড়াশোনা করি। হঠাৎ করে ইমন ভাই বলতে শুরু করলেন জীবনে পড়াশোনা কোন কাজে দিবেনা। কিছুই হবেনা এই পড়াশোনা দিয়ে। এই কথাগুলো আমার কাছে খুব অদ্ভুত ঠেকলো। কারণ ইমন ভাই ছিলেন ছাত্র হিসেবে খুব ভালো। সেদিন তাদের কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসি। পরে একদিন সজীব ভাইকে একা পেয়ে জানতে চাইলাম ইমন ভাইয়ের কিছু হয়েছে নাকি। সজীব ভাই তখন বলল, “ইমন এখন পর্যন্ত ৯ টি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর জন্য আবেদন করেছে। একটিতেও তার চাকুরী হয়নি। এই নিয়ে তার বাবা ক’দিন আগে বকা-ঝকা করে। বলে, এতোদিনে একটা চাকুরী জুটাতে পারলিনা, ঐ সার্টিফিকেটগুলো দিয়ে কি ধুয়ে-ধুয়ে পানি খাবি? এ কথা শোনার পর ইমন নিজের রূমে গিয়ে একে-একে তার সব সার্টিফিকেটগুলো পুড়িয়ে ফেলে। তারপর থেকেই সে সবার সাথেই অদ্ভুত আচরণ করছে”।

খ) বড়ভাইয়ার সাথে রিক্সায় করে কোথাও যাচ্ছিলাম। রাস্তায় জ্যামে আঁটকে আছি। ভাইয়া আমার সাথে কোন এক বিষয় নিয়ে কথা বলছিলো। হঠাৎ দেখলাম রাস্তার পাশে এক পাগল দৌড়াচ্ছে এদিক থেকে ওদিকে। পাগলটার দিকে তাকিয়েই ভাইয়া কথা বলা বন্ধ করে মাথাটা নিচু করে রইলো। কিছুক্ষণ পরে রিক্সা আবার চলতে শুরু করলে আমি ভাইয়ার কাছে জানতে চাইলাম কি হয়েছে। ভাইয়া যা বললো তা শুনে আমার খুব কষ্ট লাগলো। “যে পাগলকে তুমি দেখলে সে জসীম, আমার বন্ধু ছিলো। তার বাবার অনেক টাকা আছে, দাপটও আছে। কিন্তু বাবার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সে কিছু করতে চায়নি। নিজে কিছু করতে চেয়েছিলো। তার অর্থকষ্ট শুরু হলে তার বউটাও তাকে ছেড়ে চলে যায়। অনেকবারের চেষ্টাতেও কিছু না হওয়ায় এখন সে মানসিক বৈকল্যের শিকার”।

গ) আপুকে দেখতে গিয়েছিলাম তার শ্বশুর বাড়ি। অনেক্ষণ তাদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিলাম। কথা প্রসঙ্গে আমি আপুর চাকুরীর খবর কি জানতে চাইলাম। এই কথাটা চলতে চলতে এক পর্যায়ে দুলাভাই বলে বসলো, তোমার ঐ সার্টিফিকেটেরতো কোন দামই নেই। এই কথাটা শুনেই সে তার মেয়েকে আমার কোলে দিয়ে একটা ফাইল হাতে নিলো। ওখান থেকে সব সার্টিফিকেটগুলো বের করেই ছিড়ে ফেললো, কিছু বুঝতে পারার আগেই। তখন নিজেকে খুব দোষী মনে হচ্ছিলো। চাকুরীর কথাটাতো আমার কারণেই ওঠেছিলো।

ঘ) টিভিতে ক’দিন আগে দেখলাম এক ছাত্রের অসহায় জীবণের গল্প। তার নামটা ঠিক মনে নেই। সে যুক্তিবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেছে। অনেক চাকুরীর চেষ্টা করেও কোন লাভ হয়নি। শেষমেশ এখন একটি ফার্ণিচারের দোকানে ক্লীনারের চাকুরী করছে। এই সামান্য আয়ে ঢাকার মতো একটি ব্যয়বহুল শহরে মা-বোনকে নিয়ে জীবণধারন প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তাই সে সবার কাছে অসহায়ের মতো আবেদন করছিলো কোন সুহৃদয় ব্যক্তি যেনো তার একটি ভালো চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেন।
(সংগত কারণেই ছদ্মনাম ব্যবহার করলাম)

এই মানুষগুলোর মতো নাম নাজানা হাজার হাজার মানুষ হয়তো প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে টিকে থাকার। কেউ হয়তো পারছে কেউ পারছেনা। দিনে দিনে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। কিন্তু এর জন্য দায়ী কে? সরকার, সমাজ, পরিবার না তার মানসিকতা? আমার কাছে এর উত্তর অজানা। মজার ব্যপার হলো আমারাই তাদের শৈশব থেকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শেখায়। অথচ আমরা এর দায় নিতে রাজি নই।

এইসব ঘটনাগুলো দিনের পর দিন বিষবাষ্প হয়ে আমার কষ্টগুলোকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমার তখন খুব কষ্ট লাগে যখন মনে হয়, এই মানুষগুলোও একসময় জীবণে বড় চাকুরী করার স্বপ্ন দেখতো, আশা করতো তার যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ভালো চাকুরীর। এটাকি খুব বেশি চাওয়া? তখন খুব কষ্ট হয়েছিলো যখন দেখছিলাম আমার চোখের সামনেই কারো সারা জীবণের সঞ্চিত স্বপ্নগুলো ছেড়া কাগজ হয়ে হাওয়ায় ভাসছে। ভাসছে তার সারা জীবণ।

জানিনা, হয়তো তারা জ্ঞানার্জন করে পাপ করেছে। হয়তো তারা জ্ঞানপাপী।

0
আপনার মূল্যায়ন: আপনি মূল্যায়ন করেন নি।
শেয়ার করুন » Facebook Twitter Delicious Digg MySpace Google Orkut Blogger Google Buzz Technorati
অথবা এই সংক্ষিপ্ত লিংক শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৩৯১(১)    

আমার মনে হয়, ছোটবেলায় শেখানো ঐ প্রবাদটাই গলদ।

লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে

এর অর্থ হল, গাড়ি ঘোড়া চড়ার জন্যই লেখাপড়া শেখার দরকার। অর্থাৎ টার্গেট হল অর্থবিত্ত, আর লেখাপড়া সেটা অর্জনের মাধ্যম মাত্র। ছোটবেলায় শেখানো সেই কথাটা মনের মধ্যে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, অষ্টম-নবম শ্রেণীতে ভাব সম্প্রসারনে পড়া

আত্মশক্তি অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য

এই কথাটা আমাদের অনেকের মনের ত্রিসীমানাতেও ঠাঁই পায় না। আর আজকাল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তো জ্ঞানের চেয়ে সার্টিফিকেটমুখীতাই বেশী। আপনার অনেক হতাশার পাশে আমি আমার একটি ইতিবাচক ঘটনা শেয়ার করছি।

গত ৯ই নভেম্বর আমাদের স্কুলের ৯৯ ব্যাচের (মানে যারা ১৯৯৯ সনে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিল) পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হয়। আমাদের এক বন্ধু ছিল, যার বুদ্ধির স্বল্পতার জন্য সে "কাউয়া" নামে আমাদের কাছে খ্যাতি পেয়েছিল। তবে সে ছবি আঁকতো অসাধারণ। এস এস সি তে একবার, এইচ এস সি তে দু'বার ফেল করে, শেষ পর্যন্ত ফটোগ্রাফীর ওপর একটা শর্ট কোর্স করে, এখন পুরোদস্তুর পেশাদার ফটোগ্রাফার; তার মাসিক আয় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সর্বোচ্চ! অর্থাৎ, আমাদের সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা মেধার সঠিক মূল্যায়নে অক্ষম। আসলে, সবগুলো ফ্যাক্টর নিয়ে আলাপ করতে গেলে পুরো আলাদা একটা পোস্ট হয়ে যাবে। তাই সংক্ষেপে বললাম, জানিনা বোঝাতে পেরেছি কিনা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৩৯৯(২)    
লেখকের মন্তব্য

সহমত।
সত্যি বলতে কি, এর ভাল দিক খারাপ দিক দুটো নিয়েই বলা যায়। এটি আসলে আমার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা মাত্র।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৩৯৮(৩)    
লেখকের মন্তব্য

সহমত।
সত্যি বলতে কি, এর ভাল দিক খারাপ দিক দুটো নিয়েই বলা যায়। এটি আসলে আমার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা মাত্র।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৫৯৮(৪)    

শিক্ষিতের হার বাড়ছে না বলে সার্টিফিকেটধারীর হার বাড়ছে বললে যথার্থ হয় বেশি; আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়।

খন্ড চিত্রগুলোর দুর্বিসহ বাস্তবতাগুলো নিয়ত তাড়িয়ে ফিরছে আমাদের। এবং দিন দিন তার বাড়ছে সংখ্যা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৬২৭(৫)    
লেখকের মন্তব্য

ধন্যবাদ।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৯৩৭(৬)    

হুম, আসলেই কেনো যে এমন হয়!
সোনার হরিনের পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনে যা শিখেছে সবই ভুলে যেতে হয়।
কেউ ভাল রেজাল্ট করলো, কিন্তু তার ভাল একটা ব্যবস্হা হবে, কোন গ্যারান্টি নেই।
---কষ্ট!

আপনার লেখাটা ভাল লাগল।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#১৯১৯৮৬(৭)    
লেখকের মন্তব্য

অসংখ্য ধন্যবাদ।

 

মন্তব্য করুন

এই তথ্যটি সর্বদাই গোপন রাখা হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ছবি যাচাই
আপাতত: শুধু মানুষদের জন্যই আমাদের দুয়ার খোলা। পরে নাহয় রবোট, বায়োবট বা এন্ড্রয়েডদের কথা বিবেচনা করা যাবে।
7 + 7 =
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করুন এবং সঠিক উত্তরটি উপরের ঘরে লিখুন। যেমনঃ ১+৩ এর জন্য লিখুন ৪।