লেখকের ক‌থা

সদর দরজা

চকে আঁকা রাত ( পার্ট ওয়ান )

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

আমি রাস্তায় নেমেই বুঝলাম একটা গভীর সমস্যা আছে । শহরের সব লোক কেমন করে জানি আমাকে দেখছে । আমি সাবধান হয়ে গেলাম । মাথা ঠান্ডা করলাম । আমার মাথা এমনিতে বেশ ঠান্ডা । লোকজন সিগারেট ধরাতে গিয়ে দুটা কাঢি খরচ করলে আমার একটা কাঠিতেই হয়ে যায় ।
শীত লাগছে , বড় ঠান্ডা পড়ল গো এই বছর । আমি বিড়িওয়ালার কাছ থেকে একটা বেনসন কিনে ধরালাম । সিগারেটের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না । তবে কুয়াশার স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে । কুয়াশার স্বাদ অনেকটা পানির মত । পানির চেয়ে একটু বেশী ঘোলা ধরণের স্বাদ । আর তখনই আমি সমস্যাটা কি বুঝতে পারলাম । এরা সবাই আসলে আমাকে মারতে চায় । রিক্সাওয়ালা , টোকাই , দোকানদার ,পুলিশ , চুলে কালি করা বৃদ্ধ আংকেল এরা সবাই আসলে আমাকে পিটিয়ে লাশ করতে চায় । তারা কোন একজনের ইশারার অপেক্ষা কর‍ছে । ইশারা পাওয়া মাত্রই আমার খবর হয়ে যাবে । তাই আমি মাথা ঠান্ডা করলাম । মাথা অতিরিক্ত ঠান্ডা করতে গিয়ে আমার শরীরের কুলিং সিস্টেমে একটা গন্ডোগোল হয়ে গেল । আমি ঘামতে লাগলাম । পৌষের শীতে কোন ভদ্রলোক রাস্তায় দাড়িয়ে ঘামছে এটা ইন্টারেস্টিং দৃশ্য । কোন একটা এংগেল থেকে দেখলে কারও কারও জন্যে লাভজনক দৃশ্যও বলা যায় ।
দৃশ্যে আকর্ষিত হয়ে একজন কুৎসিত যুবক এগিয়ে এল । আমি ভাল করে তাকালাম , যুবক বলশালী । হাতে পাঁচ ছয়টা সেলাইয়ের দাগ আছে । কোমরে কোমরে কিছু আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না । তবে তার একটা হাত চাদেরে নিচে । সুতরাং হাতে থাকতে পারে । কুৎসিত চেহারার হাতে সেলাই খাওয়া একজন যুবক শহরের রাস্তায় চাদর জড়িয়ে ঘোরাটা বেআইনী । অন্তত আমি তাই মনে করি । পুলিশ এরে ধরে না কেন ? শালার পুলিশ ......
যুবক কর্কশ গলায় হেসে হেসে বলল
- ভাই এখানে কি করেন ?
- কুয়াশা দেখি ।
- কুয়াশা দেখেন ? হোয়াই ? কুয়াশা তো সমুদ্র না ।
- ভাল বলেছেন , সমুদ্র শুনলে খুশি হবে ।
তখণ তিনি হাসলেন । আমার অসোয়াস্তি আরও বেড়ে গেল । যুবক বলল
- নাম কি আপনার ?
- কুরু ।
- কি ?
- কুরু ত্রাতিন ।
- টাইমমেশিনে চড়ে আসছেন নাকী ?
- না তো , এটা কেন বললেন ?
- নামটা সায়েন্সফিকশনের নামের মত ...
যুবক আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে । তার কৌতুকে আমি হাসি কিনা এই ধরণের সস্তা আগ্রহ । আমি হাসলাম না । চোয়াল কঠিন করলাম । আমার কঠিন চোয়াল দেখে যুবক হোহোকার করে হাসতে লাগল ।

আমি হাটা দিলাম । সে বিস্মিত গলায় বলল
- কই যান ?
- আপনার জানার দরকার আছে ?
- আমারেও সাথে করে লয়ে যান....
আমি তাকালাম । যুবকের “কই যান” প্রশ্নটা হঠাৎ করেই আমার কাছে বেশ গভীর মনে হল । তার কারণ আমি আসলে কই যাব নিজেই ভুলে গেছি । গন্তব্য একটা আছে । সেটা হল ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্ট যেটা গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে । তথ্যবিভ্রাট হতে পারে দেখে রেস্টুরেন্টের নামোল্লেখ করছি না । তবে রেস্টুরেন্ট যাবার আগে অন্য এক জায়গায় যাবার কথা । কুয়াশ ভরা শহর অরণ্যে আমি আর যুবক চিন্তিত চোখে একেঅন্যের দিকে তাকিয়ে থাকলাম ।

আমরা এলাম ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বারে । রিক্সায় বসে আছি । রাস্তায় বিশৃংখল জ্যাম লেগে আছে । লোকজন চিৎকার করছে , হাহাকার করছে । মনে হচ্ছে বিরাট কোন উৎসব । দেখতে ভালই লাগে । নানান চিন্তা ভাবনা করা যায় । একসময় অদূরের কোন একটা বিয়ে বাড়ি থেকে বাজি পোড়ানোর শব্দ শোনা গেল । রাস্তার লোকজন শব্দের উৎসে খোঁজে আগ্রহী চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে । যুবক হাততালি দিয়ে বলল , “ গুলি দেয় গুলি দেয় , বিডিআরে গুলি দেয় ...” । এত আনন্দ পাওয়ার কি হল বুঝলাম না । সে তখন থেকেই আমার সাথে আছে । তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার না । তবে সে বেশ আনন্দিত মানুষ বুঝা যাচ্ছে । এই আনন্দ জন্মগত ,তার রক্তের ভেতরে ক্লান্তির বদলে আনন্দ খেলা করে । এজাতীয় মানুষের সঙ্গ বিরক্তিকর হয় । তবে আমি বিরক্ত না হওয়ার চেষ্টা করছি । আমরা বসে বসে রিক্সায় হাসতে লাগলাম ।
বত্রিশ নাম্বারের বারে প্রচুর লোকজন দেখা যাচ্ছে । এশারের নামাজ শেষ করে অনেকেই এখানে চলে আসেন । শুক্রবারের জুম্মার নামাজ শেষ করে এরাই আবার ফার্মগেটের হোটেলে চলে যান । স্বাভাবিক ভাবেই যান । কোন আরোপিত স্বাভাবিকনেস নয় , শুদ্ধ স্বাভাবিকনেস । লোকগুলা খুব একটা খারাপ হয় না ।
আমার পাশের যুবকের দিকে লোকজন ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে । তার কদর্যতা দেখার মতই । কিছু মানুষের কদর্যতা মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয় ।
বারের এক বেয়াড়া আমাকে দেখে এগিয়ে আসল । তিনি হাসছেন , যেন কোন হারানো প্রিয়জন ফিরে এসেছে । অদ্ভুত সম্পর্কের বন্ধনে থাকা লোকজন মাঝেমাঝেই আমাকে ভালবাসা দিয়েছেন , সেই ভালবাসা কখনই ঠিক ভাবে গ্রহন করা হয় নাই ।
আমরা বসলাম । বেয়াড়া , নাম হল গিয়ে সাজু আমাকে বলল , “ বন্ধু লয়ে আসছেন , ভাল ভাল ..” । আমি ভাল হবার কিছু দেখলাম না । এখানে টিভিতে একটা হিন্দি গান হচ্ছে । গানে কোন এক পরমা সুন্দরী কোমর ঝাকিয়ে নাচছে । আমার সংগীটি সেই দৃশ্য দেখে মুখ দিয়ে হই হই শব্দ করে তালি দিচ্ছে । বিষয়টা অশ্লীল , রুচিবোধ সম্পন্ন মানুষরা দেখলে কষ্ট অনুভব করবেন । এই কষ্টের আরেক নাম “পেইন” । এখানে কাউকে সেরকম পেইন অনুভব করতে দেখলাম । সবাইকে আনন্দিত মনে হচ্ছে । মানুষের আনন্দ দেখতে বড় ভাল লাগে ।
মদ আসতে টাইম লাগবে । এই ছোট একটা দুই কামরার ঘরের ভিত্রেও নানান ঝামেলা বা পলিতিক্স আছে । আমাদের দেশের মানুষ ঝামেলা ভালবাসে ।
আমার সংগী বলল , “ কুরু ভাই , মাল কয় পেগ খাইবেন ?” । আমি বিরক্ত গলায় বললাম
- মাল বলবেন না । বলবেন এলকোহল । কষ্ট হলে মদও বলতে পারেন ... রুচিবোধ গ্রো করেন নিজের ভিত্রে ....
কথাটা বলে বেশ ভাল লাগল । কেমন প্রগাঢ় কথা । বলার সময় মুখে ভিত্রে জড়ানো অনুভুতি হয় । সংগিটা কি বুঝল কে জানে , তবে আমার সামনের টেবিলে বসা সুফী চেহারার লোকটা অনেক বেশী বুঝে ফেলল । তিনি টেবিলে থাবড় মেরে বললেন
- এই কথাটা , মানে যেই কথাটা বললেন না ..সেটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা । শুনে খুশি হলাম ।
ভদ্রলোক যেরকম গা ঝারা দিয়ে উঠলেন তাতে মনে হল তিনি আধাঘন্টা আমার সাথে আড্ডা দিতে চান । এই আড্ডার সময় তিনি আমার নাম পরিচয় ঠিকানা জিগেস করবেন । আড্ডা শেষ হওয়া মাত্রই সেইসব তথ্য ভুলে যান । মানুষের মস্তিষ্ক সামান্যতম অপ্রয়োজনীয় তথ্যও সংরক্ষণ করে না ।সুতরাং যারা কিছুই মনে রাখতে পারেন না , তাদের কাছে আসলে পৃথিবী তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা না । নাহ্ , ভদ্রলোকের সাথে এখনই আড্ডা শুরু করতে ইচ্ছে করছে না । দুই পেগ মেরে দেই , তারপরে শুরু করব । তবে আমার সংগী থেমে নেই । সে ঝাপিয়ে পড়েছে কথায় , দুজনে হড়বড় করে কি যেন বলছে ।
মদ্যপান শুরু করার আগে আপনাদের অন্য একটা বিষয় বলি । কেন গভীর রাতের রেস্টুরেন্টে যাব সেই বিষয়ে কথা । কথাটায় সামান্য তরুণীযোগ আছে । এতক্ষণে গল্পটা শীতল আর বোরিং লাগা শুরু করেছে নিশ্চই । বিরক্ত মুখে “ বাআআল...” বলেছেন কয়েকবার । তরুণী প্রসংগ এনে উষ্ণতা দেয়ার একটা সস্তা চেষ্টা করা যাক ।
কাহিনী কালকের । এখান থেকে গতকাল বাসায় ফিরে ফেসবুকে বসলাম । দেখলাম জনৈক তরুনী একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন , “ পাত্র চাই : আঠারোর উর্ধ এবং একুশ নিম্ন পাত্র চাই , সঙ্গী চাই ...” এজাতীয় একটা ব্যাপার । স্পষ্টতঃই একটা ফাজলামি । আজকাল মানুষ প্রচুর ফাজিল হয়েছে । লোকজন্‌ও দেখলাম ফাজলামো হিসেবেই নিয়েছে । ইনফো থেকে জানলাম তরুনীর বয়স আটাশ । তার বন্ধুবান্ধবদের একটা অংশ হল মধ্যবয়স্ক বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর লোকজন । তারা মেয়েটার প্রত্যেক ছবির নীচে “ ইউ আর সো প্রিটি , ইউ আর এন এন্জেল” এসব লিখে রেখেছেন । মধ্যবয়স্ক বুদ্ধিজীবি শ্রেনীর লোকজনের সংখ্যা এদেশে দ্রুত বাড়ছে । এই লোকগুলা নানা দিক থেকে অসুখী । তার মাঝে প্রধান বিষয় হল যৌনতা । মাথায় টাক পড়া ভুড়িওয়ালা আংকেলদেরকে কেউ পাত্তা দেবে না ,এই সহজ সত্যটা এরা মানতে পারে না । আবার স্বাভাবিক যৌনতার বিষয়টাও ইনাদের ঠিক ভাল লাগে না । যেকারণে ফেসবুকে তরুণীদের ছবি হিট , ক্যাটরিনা কাইফের সিনেমাও আশাতীত ভাবে সফল । যাউগ্গা সে কথা । এখন আমি যেহেতু টাল ছিলাম ,করলাম কি মেয়েটাকে ইনবক্সে মেসেজ পাঠালাম । কইলাম যে আমি আগ্রহী । সে দিল আমাকে আনফ্রেন্ড করে ।
আমার একটু খারাপই লাগল । আমি কখনও মেয়েদের ডিস্টার্ব করি না । মেয়েদের সামনে আমি কখনও ঠিক সহজও হতে পারি না । বিষয়টা হয়েছে এলকোহলের কারণে । এলকোহলের কারণে এর থেকেও জটিল বিষয় হয়েছে । একবার ইদের আগের রাতে আগুন দিয়ে নতুন পান্জাবী পুড়িয়ে ফেলেছিলাম । তারপর হাতেমুখে ছাই মেখে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করলাম । মানুষের জীবনে কত ঘটনা থাকে ......... ।
এরপর আমি ঘুমাতে গেলাম । রাত আনুমানিক তিনটার দিকে মোবাইল ঝিনঝিন করতে লাগল । ধরলাম । ধরতে হয় ।
- কে ?
- আপনি কুরু ত্রাতিন ?
- হুঁ , আপনে কে ?
- আপনি আমাকে ফেসবুকে ইনবক্সে মেসেজ পাঠাইসেন একটু আগে ?
- হুঁ , আপনার নাম কি ফাহমিদা যুথী ? তাইলে মনে হয় পাঠাইসি ....আপনার পাত্র চাই বিজ্ঞাপনের একটা রেসপোন্স দিসিলাম ..
- হঁমমমম , বয়স কত ভাই আপনার ?
- একুশের কম .....
- বয়স তো বেশি হয় নাই , এত ফাজলামি শিখে গেস এই বয়সে ??... রেসপোন্স দাও হারামজাদা ... থাবড়ায়ে তোমার ...
- গালাগালি করছেন কেন ? আমার মাথায় বুদ্ধি কম , আমি সিরিয়াসলি নিসিলাম ....
- কথা এরকম জড়ায়ে যায় কেন তোমার ? আর ইউ ড্রাংক .......??
- রাত তিনটার সময় ঘুম থেকে উঠাইসেন কথা জড়াইব না ? গুরুত্বপূর্ন কিছু বলার থাকলে বলেন ......
- তুমি দেখা যায় বয়সের তুলনায় বেশি ফাজিল , এখনও একবার সরি বল নাই ..... তোমাকে সামনাসামনি সাইজ করা প্রয়োজন , কালকে তুমি দেখা করবা আমার সাথে .....
- জ্বি আচ্ছা ...
তারপর তিনি আমাকে গভীর রাতের সেই রেস্টুরেন্টের কথা বললেন । আরও বললেন যে আমার খবর আছে । আমি দার্শনিক ভাব নিয়ে হাসলাম । তারপর সকালে উঠে ভয় লাগা শুরু করল । কেন যে ফেসবুকে ফোন নাম্বার দিতে গেলাম এই বিষয়ে গভির চিন্তাভাবনা করলাম । এই মহিলা গুন্ডার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কোন দরকার আছে বলে মনে হয় না । কেন সে আমাকে এরকম অড একটা টাইমে দেখা করতে বলল সেটাও পরিষ্কার না । পৃথিবীর অধিকাংশ বিষয়ই আসলে পরিষ্কার না ।
দুপুর দুটার দিকে হালকা একটা রোদ উঠার পর আমার মাথা একটু ক্লিয়ার হল । যেহেতু মেয়েটার বয়স আটাশ আর ধারালো শিক্ষিতভাবে কথাবার্তা বলে , মনে হয় কর্পোরেট চাকরী বাকরী করে ।
দিনে টাইম পায় না দেখে রাতে ঠিক করসে । তাছাড়া আমাকে মারার জন্য পোলাপান জোগাড় করতেও হয়ত একটা প্রস্তুতি দরকার । আমাকে মারার জন্যে সেরকম প্রস্তুতি নেয়ার কোন দরকার দেখি না । একা যাব । দুতিনটা লোক যোগাড় করলেই চলে । তবে এখন মনে হচ্ছে আর একা যাওয়া হবে না । আমার সাথে কুৎসিতর দর্শন এক বলশালি যুবক বন্ধু আছে । যার হাতে সেলাই , গায়ে চাদর । সেকি যাবে আমার সাথে ? জানি না । চলেন দেখি সে কি করছে ।
যুবক বন্ধু প্রায় পাচ পেগ খেয়ে ফেলেছেন ইতিমধ্যে । কেরু , বাংলার আগুন । বঙ্গঅগ্নি । আমারও চলতেসে । সামনের ভদ্রলোক , সুফী সুফী যার চেহারা তিনি ঝিমাচ্ছেন । তার সাথে আড্ডাটা দেয়া হল না । তিনি আমার দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিলেন , নিলাম । নিতে হয় । তিনি আন্তরিক গলায় বললেন
- করেন কি ?
- কিছু না ...
- স্টুডেন্ট ? কিছু না করার ভিত্রে কিন্তু স্টুডেন্ট , কবি ,লেখক , মাস্তানী সবই অন্তর্ভুক্ত ... আপনে কোনটা ?
বাহ ! বেশ ভাল বললেন তো । আমি গ্লাস উচিয়ে বললাম , “ ওয়েল সেড ,ম্যান ভেরি ওয়েল সেইড ..........” । আমার বেশ আনন্দ হল , গভীর আনন্দ । বঙ্গঅগ্নির এই এক মজা , দুঃখের ডালপালা পুড়ে যায় , হায় হায় । হা হা ....। আমি এমনি এমনি হাসছি । আমার সাথে গলা মিলিয়ে চেয়ার টেবিল , যুবক , ভদ্রলোক সবাই হাসতে লাগল । একসময় মনে হল কোথায় যেন ঘোড়া ডাকছে । অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকালাম । নাহ , ঘোড়া ডাকছে না । পাশের টেবিলে থাকা এক ভদ্রলোক আসলে কাশছেন । তার হাতে সিগারেটের ধুয়াগুলা মনে হচ্ছে কোন একজন ভৌতিক নর্তকীর মত ঘুরে ঘুরে নাচছে । আমি হা করে তাকায়ে আছি । নর্তকী একসময় ক্লান্ত হয়ে নাচ থামিয়ে ফেলল । ক্লান্ত হয়ে নর্তকীদেরকে একসময় নাচ থামাতেই হয় , অথচ তারা যখন নাচ শুরু করে তখন এই কথাটা একদম্‌ই মনে হয় না । মনে হলে হয়তো নর্তকীদের প্রতি অন্ধ আকর্ষনটা থাকত না .....।
সুফী সাহেব টেবিলে টোকা দিয়ে বললেন
- হ্যালো হ্যালো , হারায়ে গেলেন নাকী ??
- আরেহ না ,নাচ দেখছিলাম ...
- কোন ব্যাপার না । আমরাও দেখি , আর তোমরা পোলাপান । বাই দা ওয়ে আমি কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ...
- তাই নাকি ? নাইস টু মিট ইউ স্যার ... আপনে শিক্ষক মানুষ , আপনের সামনে বসে মদ খাওয়া ঠিক হল না ।
- তাতো ঠিক হল না অবশ্যই
আমি বিরক্ত হলাম । বলদ নাকি হালায় ? বললাম
- আপনার বলা উচিৎ ছিল যে এসব বিষয়ে কোন প্রেজুডিস নাই বা এই টাইপের কিছু .... রুচিবোধ গ্রো করেন নিজের ভিত্রে , এংগেল চেন্জ করেন ...
রুচিবোধ আর এংগেলের অবতারণা করলাম দেখেই ভদ্রলোক উদাস হয়ে গেলেন । ঔদাসীন্য কতক্ষণ স্থায়ী হয় কে জানে , এই টাইমে একটা সিগ্রেট খাওয়া যায় । সিগারেট ধরালাম । সিগারেটের অর্ধেক যাওয়া মাত্রই সুফী সাহেবের ঔদাসীন্য কেটে গেল । তিনি গ্লাস হাতে তুলে বললেন
- কথাটা খারাপ বল নাই ..
- থ্যাংকিউ ...
- তুমরা আজকের পোলাপান কম বয়সেই নেশা ফেশার পিছে টাকা খরচ করতেস , মেয়েমানুয নিয়ে ফুর্তি করতেস এগুলার ঠিক না ...মাইন্ড কইরও না , বাট আমার কাছে বিষয় ভাল মনে হয় না । শিক্ষক মানুষ তো ....
- এর পেছনে একটা প্রগাঢ় কারণ আছে ...
তিনি আগ্রহ নিয়ে তাকালেন । বললাম
- আসলে আমাদের হাতে সময় কম .....
- বুঝি নাই ...
- মনে করেন যে আপনাদের জেনারেশন অনেকদিন বাঁচত । কমপক্ষে গড়ে ষাট ...... আমাদের জেনারেশন এতদিন পাইব না , চল্লিশ পার করে কিনা কে জানে ।
- চল্লিশ পার করতে পারব না ? কি কও এইটা?
- কারণ আছে , পলুশন আর কেমিকাল তো আছেই । তারুপ্রে মনে করেন ভুমিকম্প হবে , যুদ্ধ লেগে যাবে ..আমাদের সামনের দিনগুলি খুব খারাপ । মানুষ খারাপ । আমাদের হাতে সময় কম , যা পারা যায় এখনই করে নিতে হবে ......
ভদ্রলোক গা দুলিয়ে হাসতে লাগলেন । বললেন
- তোমরা চোদা খাইবা , তোমাগো খবর আছে ..... হা হা হা ...
আমি অন্যদিকে তাকালাম । আমার যুবক বন্ধু টেবিলে মাথা রেখে ঝিমাচ্ছে । আমি পা দিয়ে লাথ্থি দিয়ে তাকে উঠাব কি না বুজতেসি না । সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে তাকে এখানে রেখে চলে যাওয়া ...। সেটা কি করব ? না , করা যায় না , করতে হয় না ।
...
( চলবে.....)

7
আপনার মূল্যায়ন: আপনি মূল্যায়ন করেন নি। গড় রেটিং: 7 (২ জন মূল্যায়ন করেছেন)
শেয়ার করুন » Facebook Twitter Delicious Digg MySpace Google Orkut Blogger Google Buzz Technorati
অথবা এই সংক্ষিপ্ত লিংক শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০২৫৬৪(১)    

আপনার গল্প বলার স্টাইলটা বেশ লাগছে।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০২৫৬৭(২)    
লেখকের মন্তব্য

ধন্যবাদ :)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০২৬১৯(৩)    

ভালো লাগলো। চলুক ভালোভাবে।
চলতে পথে শুভকামনা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০২৬৫০(৪)    

আমার সংগী বলল , “কুরু ভাই, মাল কয় পেগ খাইবেন ?” আমি বিরক্ত গলায় বললাম
- মাল বলবেন না । বলবেন এলকোহল । কষ্ট হলে মদও বলতে পারেন ... রুচিবোধ গ্রো করেন নিজের ভিত্রে ....
কথাটা বলে বেশ ভাল লাগল । কেমন প্রগাঢ় কথা । বলার সময় মুখে ভিত্রে জড়ানো অনুভুতি হয় । সংগিটা কি বুঝল কে জানে , তবে আমার সামনের টেবিলে বসা সুফী চেহারার লোকটা অনেক বেশী বুঝে ফেলল । তিনি টেবিলে থাবড় মেরে বললেন
- এই কথাটা , মানে যেই কথাটা বললেন না ..সেটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা । শুনে খুশি হলাম ।

ভাল লেগেছে।।।।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০২৮৮৪(৫)    

গল্প যথারীতি বেশ ভালো। সবচে ভালো লাগল ট্যাগটা। ;)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০৪১৪৪(৬)    
লেখকের মন্তব্য

ধন্যবাদ নিলয় ভাই .... :) :) :)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০২৯১৩(৭)    

সব মিলিয়ে ভাল লাগল।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০৩০১৩(৮)    

কিছু না করার ভিত্রে কিন্তু স্টুডেন্ট , কবি ,লেখক , মাস্তানী সবই অন্তর্ভুক্ত ... আপনে কোনটা ?

হইবেক নাই, খেলমু না, আপনে বাদ ব্লগের এই অপমান মানুম না মানবো না ।।।।
ব্লগ লেখক ঝান্ডা তোলো হুশিয়ার সাবধান।:দ:

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০৩১৫৭(৯)    

ভাল লাগ্লো। মনে হচ্ছিল হুমায়ুন পড়ছি।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২০৪১৪৮(১০)    
লেখকের মন্তব্য

পড়ার জন্যে ধন্যবাদ আপনাকে পলাশমিতা বুকে আয় বাভুল , তবে হুমায়ুন শুনলে কষ্ট পাবেন :( :(

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২২৪৮৩২(১১)    

মাই গাড!
কি বলব!
সাত দিয়ে পরের টায় যাচ্ছি!

বলার মতন কিছুই পাইতেছি না!
মুখ দিয়া বাইর হইয়া যাইতাছে!
মাশাল্লাআআআআআআআআআআ!

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#২৬৪৩৮৯(১২)    

আবারও বলি- অ-সা-ধা-র-ণ......
হুমায়ূনের সাথে অনেক মিল , কিন্তু তার থেকে ভালো ;)
একদম ঘোরের মাঝে চলে গেলাম......
তবে, আপনার ২টা লেখা পড়লাম- একই রকম......

আবার ৭ দিলাম......

 

মন্তব্য করুন

এই তথ্যটি সর্বদাই গোপন রাখা হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ছবি যাচাই
আপাতত: শুধু মানুষদের জন্যই আমাদের দুয়ার খোলা। পরে নাহয় রবোট, বায়োবট বা এন্ড্রয়েডদের কথা বিবেচনা করা যাবে।
2 + 7 =
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করুন এবং সঠিক উত্তরটি উপরের ঘরে লিখুন। যেমনঃ ১+৩ এর জন্য লিখুন ৪।