মামুন-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বর্তমানে বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসা মোটামুটি একটা আতঙ্কের নাম হয়ে দাড়িয়েছে। শতশত মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, কিন্তু তারপরও আমরা হুযুগে বাঙালিরা সাবধান হচ্ছি না। অল্প পরিশ্রমে (প্রায় বিনা পরিশ্রমে) কোটিপতি হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজের স্বর্বস্ব হারানো লোকের সংখ্যাও একেবারে কম নয়।
কি এই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং?
মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের একটি সুন্দর উদাহরন হল “আপনি একটা পন্য ব্যবহার করলেন এবং আপনার ভাল লাগলে সেটা অন্যজনকে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করলেন। যেমন একটা মুভি আপনার ভাল লাগল, সেটা আপনার বন্ধুদেরও দেখতে বললেন। এভাবে পরোক্ষভাবে আপনি মুভিটির প্রচারনা করলেন কিন্তু ঐ মুভির সঙ্গে জড়িত কেউ আপনাকে কমিশন দিবে না। কিন্তু মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এ আপনাকে এর জন্য ঐ পন্যের মালিক একটা নির্দিষ্ট কমিশন দিবে।”
প্রথম এমএলএম কোম্পানি ছিল ক্যালিফোর্নিয়া ভিটামিন কোম্পানি (১৯৪৫)। বাংলাদেশে প্রথম কবে এমএলএম এর শুরু হয় সেই সম্পর্কে কোন নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমান নেই। তবে বলা হয় যে ১৯৯৮এ প্রতিষ্ঠিত GGN (Global Guardian Network) ই হল প্রথম বাংলাদেশী এমএলএম কোম্পানী।
বর্তমানে দেশে কতগুলো এমএলএম কোম্পানী আছে এই ব্যাপারে সঠিক কোন হিসেব না থাকলেও ধারনা করা হয় প্রায় ৭০টির মত প্রতিষ্ঠান আছে যারা এমএলএম এর সাথে জড়িত। এদের বেশির ভাগেরই নেই কোন অনুমোদন, অফিস। আছে শুধু চাপাবাজী।
কয়েকটি বিখ্যাত (যদিও একটু সন্দেহ আছে বিখ্যাত নাকি কুখ্যাত!) এমএলএম প্রতিষ্ঠান হল:
১. ডেসটিনি ২০০০ লি:
২. ম্যাকনম লি:
৩. ইউনিপে টু ইউ (ইতিমধ্যে ভাগছে)
৪. স্পিকএশিয়া লি: (ইতিমধ্যে ভাগছে, আবার আসমু আসমু কইতেছে)
৫. ইলিংকস লি:
৬. আইলিংকস লি:
৭. ব্রাভো আইটি লি:
৮. নিউওয়ে বিডি লি:
৯. ইজেন ইন্টারন্যাশনাল
১০. সুপার অনলাইন সার্ভিসেস
১১. রেভেন্যাক্স এলএলসি বিডি লি:
১২. এশিয়ান কিং
১৩. গ্লোবাল ইনসুরেন্স
১৪. এইমওয়ে কর্পোরেশন
১৫. এমওয়ে কর্পোরেশন
১৬. পানাছিয়া ইন্টারন্যাশনাল
১৭. ডোল্যান্সার
১৮. স্কাইল্যান্সার
১৯. দিশান বাংলাদেশ
২০. টিভিআই এক্সপ্রেস
২১. ভিসারেভ
২২. রিয়েল সার্ভে
২৩. রেম সার্ভে
২৪. বেরি সার্ভে
২৫. ডেইলি ট্রেড
২৬. গ্লোবাল গ্রীন
২৭. ইউনি গোল্ড
২৮. মাল্টিভিশন এশিয়া প্রা: লি:
এছাড়াও এরকম আরো অনেক নাম না জানা প্রতিষ্ঠান আছে যারা এমএলএম ব্যবসার নামে প্রতারনার ফাদ তৈরী করে রেখেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী প্রসারিত এবং প্রচলিত এমএলএম হিসেবে নাম আছে ডেসটিনি ২০০০ লি: এর। এবং এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সবচেয়ে বেশী। নিচে তার মাত্র কয়েকটা উদাহরন দেওয়া হল:
১. প্রভাবশালী ইংরেজি সাপ্তাহিক ব্লিটজ- ডেসটিনি নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করছে, যাতে উঠে এসেছে এই কোম্পানির অভ্যন্তরের অনেক চমকপ্রদ তথ্য।
প্রথম লিংক: http://www.weeklyblitz.net/1954/destiny-2000-destination-and-the-cheated-millions
দ্বিতীয় লিংক: http://www.weeklyblitz.net/1969/destiny-2000-destination-and-the-cheated-millions
এছাড়াও ব্লিটজ এর ওয়েবসাইটে গিয়ে ডেসটিনি লিখে সার্চ দিলেও পাবেন এই সম্পর্কে বিস্তারিত।
২. ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড: ডেসটিনি'র ওয়েব সাইটে দাবি করা হচ্ছে যে, এটি নাকি "FINANCIAL INSTITUTION" বা ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হবার লক্ষে বাংলাদেশ সরকার থেকে ২৩ এপ্রিল ২০০৫ তারিখে নিবন্ধিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মাসিক ৯ শতাংশ হারে উচ্চ সুদ আদায় করে এই প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি স্থায়ী আমানতও গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রনালয়ের আইন অনুযায়ী এসব শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অবৈধ ব্যাংক-এর কার্যক্রম সারা দেশে পরিচালার মাধ্যমে পক্ষান্তরে ডেসটিনি কর্তৃপক্ষ দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে।
৩. এই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি'র অন্যতম প্রকল্প "ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেড" দেশের অন্তত ৪৮ লাখ মানুষের কাছে বৃক্ষ রোপন প্রকল্পের কাল্পনিক গাছ বিক্রি করে ইতিমধ্যেই ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ডেসটিনি'র ওয়েব সাইটেই দাবি করা হয়েছে যে, ইতিমধ্যেই নাকি ৬,২৯৩ একর জমিতে ৯৪ লাখ গাছ রোপন করা হয়ে গেছে এবং ২০১২ সালের মধ্যে নাকি ছয় কোটি গাছ রোপন সম্পন্ন হবে। প্রথমত, ডেসটিনির মালিকানায় ৬,২৯৩ একর জমি নেই এবং বনায়ন বিশেষজ্ঞদের মতে ৯৪ লাখ বৃক্ষ রোপনের জন্য ৬,২৯৩ একর জমি মোটেও যথেষ্ট নয়। এছাড়া চারা বিক্রিতেও আছে বিশাল ধান্ধা। তাদের ১৫টি গাছের চারার দাম ৫০০০ টাকা। কিন্তু ৫০০০টাকা দিয়ে আপনি কি চারা কিনলেন তা আপনি নিজে কখনও জানবেন না। তাছাড়া একটি গাছের দাম পড়ে গড়ে ৩৩৩ টাকা। এমন কি গাছ বিক্রি করে যার দাম ৩৩৩টাকা। নার্সারী থেকে তো আমিও ১০টাকা দিয়ে মেহগনির চারা কিনি।
৪. ডেসটিনির আরেক প্রকল্পের নাম "বেস্ট এয়ার", যেটির শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক এই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি। সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে এটি নাকি দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারী বিমান কোম্পানি। কিন্তু, বাস্তবে ঢাকার বাড্ডা এলাকায় একটি অফিস ছাড়া এটির আর কোনো অস্তিত্বই নেই। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত কোন তথ্য ওদের সাইটে নেই। উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে তাদের একটি বোয়িং ৭৩৭ রয়েছে। এছাড়া আর কোন তথ্য কোথাও নেই।
৫. এছাড়া ডেসটিনির পন্য রয়েছে মনে হয় ২০০ এর মত। যার কোনটারই মান বা গুনাগুন সম্পর্কে কোন তথ্য তাদের সাইটে বা তাদের ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে নেই। তাদের কোন পন্যের ই বিএসটিআই এর লাইসেন্স নেই। বিএসটিআই এর লাইসেন্সবিহীন এতগুলো পন্য সরকারের সামনে দিয়ে বিক্রি হচ্ছে অথচ কারো কোন মাথাব্যথাই নাই। এমনকি ওদের আমদানীকৃত টিভি, ফ্রিজ, এসি, তেল, কফি, সাবান কোনকিছু সম্পর্কেই কোন নির্দিষ্ট তথ্য দেয়া নেই। আর পন্যের দাম! সামান্য একটা উদাহরন দিচ্ছি: ওদের নাইজেলা নামে একটা তেল আছে যেটা ১০ বোতলের একটা প্যাকেজ। দাম ৬০০০টাকা। মানে প্রতি বোতলের দাম ৬০০টাকা। Hair again Destiny- 2000" নামক প্রোডাক্ট প্রতি বোতল বারশ পঞ্চাশ টাকা (যেটা ব্যবহার করলে নাকি চুল গজাবে ১০০% গ্যারান্টি)! তাহলে আমার অনুরোধ ডেস্টিনির প্রধান রফিকুল আমিনের নিজের মাথাও তো টাক! দয়া করে একবার ব্যবহার করে দেখেন।
৬. সম্প্রতি ডেসটিনির এক প্রোডাক্টের(কফি) গায়ে দেখলাম লেখা ISO 9000:2005 Certified. আমার প্রশ্ন হল ডেসটিনি কবে থেকে কফি উৎপন্ন করে। আর যদি না করে তাহলে যেই কোম্পানি থেকে আমদানী করতেছে সেই কোম্পানীর নাম নেই কেন? নাকি সবই ভুয়া।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খবরের কাগজে তাদের নানান রকম জালিয়াতির কথা বের হয়েছে। নিম্মে তার কয়েকটির বিবরন দেওয়া হল:
১। টেকনাফে ডেসটিনি-২০০০লিঃ’র সনদ জালিয়াতি
http://www.teknafnews.com/2012/01/11/%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A7%87-%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B8%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A7%A8%E0%A7%A6%E0%A7%A6%E0%A7%A6%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%83/
২। কনসার্টের নামে ডেসটিনির প্রতারণা! কিশোরগঞ্জে কনসার্টের নামে টিকেট বিক্রি করে প্রতারণা করার অভিযোগ উঠেছে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
http://bdnews24.com/bangla/details.php?id=180772&cid=2
৩। পঞ্চগড়ে ডেসটিনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
http://www.banglanews24.com/news.php?nssl=65493
৪। ডেসটিনির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও আইন বহির্ভূত লেনদেনের অনুসন্ধানে নামছে দুদক
http://www.ejugantor.com/2011/12/09/1/details/1_r11_c4.jpg
http://www.ejugantor.com/2011/12/09/14/details/14_r8_c2.jpg
৫। ডেসটিনির অপকর্ম খতিয়ে দেখা হবে: সাহারা খাতুন
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-10-24/news/196331
এতক্ষন তো মাত্র ডেসটিনির বাজে দিকগুলো বললাম। বাকি কোম্পানি গুলো যে একবারে সাধু তা কিন্তু মোটেও না। বরং তারা আরও বড় ডিজিটাল চোর। যেমন:
১. ইলিংকস নামের একটা কোম্পানি আছে যারা Bio energetic Bracelet বিক্রি করে। তাদের একটা প্রোডাক্ট নাকি ৬৮০০ টাকা। আমার পরিচিত এক বড় ভাই একই জিনিস আনতেছে মাত্র ১৭০ টাকায় (যদিও ওনি নিজেও ইলিংকসের মত একটা প্রতিষ্ঠান দেওয়ার জন্যই আনছেন)। তাহলে বুঝেন ১৭০ টাকার জিনিস আমাদের কাছে ৬৮০০ টাকায় বিক্রি করতেছে। এইটা কি প্রতারনা না?
২. রিয়েল সার্ভে, রেম সার্ভে, বেরি সার্ভে ও স্পিকএশিয়া নামের কতগুলো কোম্পানি আসল সার্ভে নিয়া। মাত্র ৪মাসে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাত করে চলে গেল তারপরও আমাদের হুশ হল না। এখনও যদি নতুন কেউ এসে বলে আমরা আবার তাদের কথায় বিশ্বাস করব।
৩. ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ৫০টি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই প্রতিদিন দেড় ডলার করে পাবেন। মাসে ৪৫ ডলার। যা বর্তমানে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পৌনে চার হাজার টাকা। কেবল সাড়ে সাত হাজার টাকার বিনিময়ে সদস্য হলেই কমপক্ষে ১২ মাস এই ডলার আয়ের লোভনীয় সুযোগটি পাওয়া যাবে। এমনলোভনীয় কথার যাদুতে জড়িয়ে বেশ কয়েকটি নাম সর্বস্ব ইন্টারনেটভিত্তিক এমএলএম কোম্পানি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বেকার তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গৃহবধূরাও এই প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। DoLancer, SkyLancer এমনই কিছু ভূয়া কোম্পানীর নাম যারা ফ্রিল্যান্সীং কাজ দেওয়ার নামে MLM ব্যবসা করছে আর প্রকৃত অনলাইন ফ্রিল্যান্সীং কাজের মত সম্মানজনক একটি পেশার মানহানী ঘটাচ্ছে।
এইসব প্রতারনার হাত থেকে বাচার জন্য চাই একটু সচেতনতা এবং সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা। আমরা যদি আমাদের কাজ না করে ধনী হবার মনমানসিকতা বদলাই তাহলেই আমরা এই প্রতারনার হাত থেকে বাচতে পারি।
এই লেখাটির জন্য বিভিন্ন পেজ, ব্লগার এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে......
মন্তব্য
পোস্টটা প্রিয়তে রাখলাম।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ আপনাকে।
মন্তব্য করুন