মেকানিক্স-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি


ভোরবেলায় কক্সবাজারের ছবি- উইকি থেকে নেওয়া
যাত্রা শুরু
পারিবারিকভাবে একসাথে সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া- এই ব্যাপারটি আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রে খুব বেশি স্বাভাবিক কিছু না। এর পেছনে আসলে অনেকগুলো কারণ কাজ করে এসেছে সবসময়। তবে সুখের বিষয় হচ্ছে কিছুদিন (আসলে প্রায় একমাস) আগে এই চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। আমার মা-বোন এবং বোনের ছেলেদের নিয়ে অবশেষে কোথাও ঘুরে আসা সম্ভব হল। এবং সেটা পৃথিবীর অসাধারণ জায়গাগুলোর একটি- আমাদের কক্সবাজার।
কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা হঠাৎ করেই হয়েছিল। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতি পরিবারের সবার উৎসাহের কোন শেষ ছিল না। বিশেষ করে আমার। কারণ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং এই সৈকতের নিকটতম শহর দর্শনের সৌভাগ্য এর আগে কখনো কপালে জোটে নি। তাই যখন আবিষ্কার করলাম একটি বিশাল সুযোগ সামনে চলে এসেছে তখন সেটিক আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে কোন প্রকার দ্বিধা প্রদর্শন করলাম না। I was just on it!
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৫ ডিসেম্বর। বিকেল চারটার বাসে উঠে পড়লাম সবাই মিলে। শীতের চমৎকার বিকেল। তখন শীতের মাত্রা একটু বেশিই ছিল। যাত্রাপথের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল কুয়াশা এবং ঠাণ্ডা বাতাস। শীতের বিকেল ক্ষণস্থায়ী হয়। তাই খুব দ্রুত চারদিক অন্ধকার হয়ে এল। এবং একটু পর আবিষ্কার করলাম আমাদের বাস আক্ষরিক অর্থেই বেশ ঝুঁকি নিয়ে চলছিল (অবশ্য বাংলাদেশের রাস্তাঘাট-হাইওয়েতে চলা প্রত্যেকটা যানবাহনই ঝুঁকি নিয়ে চলে- এটা বলে দেওয়া লাগে না)। কুয়াশার মাঝে বাস চালানোর ব্যাপারটা বেশ কঠিন। সুস্থ স্বাভাবিকভাবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ড্রাইভার সাহেবকে একটা সালাম দিয়ে আসলাম। তবে সেটা মনে মনে।
কক্সবাজার পৌঁছতে প্রায় নয়টা বেজে গেল। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম শহরটিতে নয়টা মানে মোটামুটি নিশ্চুপ। আমার স্পষ্ট ধারণা ছিল একটি পর্যটন শহরের প্রাণচাঞ্চল্যে রাত-দিন খুব বেশি প্রভাব রাখে না। অথচ দেখলাম ঐ সময়ই চারদিক বেশ চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। পরে অবশ্য জানতে পেরেছি ডিসেম্বরের ঐ সময়টা কক্সবাজার তার স্বাভাবিক পর্যটক সংখ্যার সংকটে ভুগছিল। বিভিন্ন কারণে বিশেষ করে রাস্তাঘাটের সমস্যার জন্য কক্সবাজারে পর্যটক সংখ্যা বেশ কমে যায়। এ নিয়ে পত্রিকায় একটি ফিচারও চোখে পড়েছিল আগে।
যাই হোক, গন্তব্যে পৌঁছলাম শেষ পর্যন্ত। মাধ্যম ছিল বিদ্যুৎ চালিত টমটম। দেখতে শুনতে চমৎকার এই যানবাহনটার মূল সমস্যা হচ্ছে জ্বালানি। দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সময়ে বিদ্যুৎ চালিত টমটম খুব ভালো ধারণা বলে মনে হল না।
অল্প কথায়
কক্সবাজারের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আদিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর এবং এই উপসাগর সংলগ্ন দীর্ঘতম বালুময় সৈকত। ব্যাপারটা আসলে এরকম, পৃথিবীতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো নিরবিচ্ছিন্ন বালুময় সৈকত আর নেই। সহজ করে বললে কক্সবাজারই দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। সমুদ্র সৈকতের আভিধানিক সংজ্ঞা অনুযায়ী। নিরবিচ্ছিন্নভাবে আমাদের এই সমুদ্রটি প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ।
কক্সবাজার শহরটির বর্তমান নামের পিছনে আছে বিশাল ইতিহাস। একটা সময় এই শহরটিকে সবাই "পানওয়া" (Panowa) নামে চিনতো। এর আক্ষরিক অর্থ 'হলুদ পুষ্পমালা'। নামটা কেন দেওয়া হয়েছিল জানতে পারলাম না। এর পিছনে নিশ্চিতভাবে কোন ইতিহাস থেকে থাকবে। হয়তো কক্সবাজার শহরে প্রচুর পরিমাণ হলুদ ফুল জন্মাতো। হতে পারে প্রচুর সরিষা জন্মাতো। কে জানে।
কক্সবাজার নামের মধ্য একটু ইংরেজি ছোঁয়া আছে। আসলে এই নামটি নেওয়া হয়েছে ক্যাপ্টেন কক্স নামক একজন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া'র একজন অফিসারের নাম থেকে। ১৮ শতকের দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই কর্মকর্তা অর্থাৎ ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স (Captain Hiram Cox) কে তখনকার "পালংকি" (Palongkee- কক্সবাজারের আরেকটি নাম) তে পাঠানো হয়। একজন সুপারিটেন্ডেন্ট হিসেবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৭৭৩ অনুযায়ী ওয়ারেন হ্যাস্টিংস (Warren Hastings) 'গভর্নর অব বেঙ্গল' (Governer of Bengal) হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর ক্যাপ্টেন কক্সকে এই অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়।
কক্স সাহেবের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল শৃংখলা রক্ষা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখনকার সময় এই অঞ্চলটিতে আরাকান উদ্বাস্তু (সম্ভবত রোহিঙ্গা) এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ এবং সংঘাত লেগে ছিল। এই সংঘর্ষের মাত্রা এতো বেশি ছিল যে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে স্থানীয় এই সমস্যাটি নিয়ে মাথা ঘামাতে বাধ্য হতে হয়। ঠিক একারণেই ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স স্থানীয় রাখাইন এবং আরাকান উদ্বাস্তুদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জটিলতার সমাপ্তি ঘটানোর গুরু দায়িত্ব নিয়ে এই অঞ্চলে চলে আসেন।
এবং ক্যাপ্টেন কক্স সুন্দরভাবেই দীর্ঘদিনের সংঘর্ষ-সংঘাত এবং জটিলতার পরিসমাপ্তি ঘটালেন। আরাকান উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করলেন নিপুণভাবে। এর সাথে সাথে বেশ অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেন শহরটির। আরো চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে কক্স সাহেব শুধু যে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করলেন, তা না। বরং এই সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে গেলেন। মানুষজনত তাকে খুব বেশি পছন্দ করতে। এবং সেটা এখনকার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে 'আলগা' অনুভূতির মতো না, আক্ষরিক অর্থেই সত্যিকারের ভালোবাসা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে কক্স সাহেব অকালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৭৯৯ সালের দিকে। প্রিয় মানুষের অকাল মৃত্যু স্থানীয় মানুষদের জন্য বেশ বড়সড় ধাক্কা হয়ে ওঠে। তার কর্মকাণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এই অঞ্চলে তখনকার সময় একটি বাজার স্থাপন করা হয়। তার নাম দেওয়া হয়েছিল "কক্সবাজার" (Cox's Bazaar)। সেখান থেকেই এই সুন্দর নামটি সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্টা পায় আজকের কক্সবাজার।
১৬৬৫-১৬৬৬ সালের দিকে আরাকান রাজার শাসন থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। একবার মুঘল সম্রাট শাহ সুজা কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে প্রায় এক হাজার পালকির একটি বহর নিয়ে যাওয়ার সময় কক্সবাজারের সৌন্দর্যে বেশ মুগ্ধ হয়ে পড়েন। তার নির্দেশে এক হাজার পালকির সেই বহর কিছু সময়ের জন্য ঐ জায়গায় অবস্থান করে। এই "এক হাজার পালকি" থেকে আবির্ভাব ঘটে নতুন নাম- "ডুলহাজরা"। আর এখন এই নামে একটি সাফারি পার্ক আছে কক্সবাজারে। বিখ্যাত "ডুলহাজরা সাফারি পার্ক।"
আমরা সবাই জানি উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলের শুরুতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমগ্র ভারতবর্ষ শাসন করতো। পরবর্তীতে তাদের মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠতে থাকে এবং ধীরে ধীর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকা এবং যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবক ছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির দু:শাসনের চিত্র খুব প্রকটভাবে প্রকাশ হয়ে পড়া। এসব ঘটনার পর বেশ কিছু বছর শেষে ১৮৭৪ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সব সম্পদ এবং সৈন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এসময় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অনেক সংস্কার এবং পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তখন থেকেই কক্সবাজার একটি জেলা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন অর্থাৎ ১৯৪৭ এর পর কক্সবাজার স্বাভাবিকভাবেই তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেসময় কক্সবাজারের পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন ক্যাপ্টেন অ্যাডভোকেট ফজলুল করিম। তিনি কক্সবাজার শহরে পাবলিক লাইব্রেরি এবং টাউন হল স্থাপনের জন্য জমি দান করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে উৎসাহিত হয়ে কক্সবাজারকে একটি সত্যিকারের ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি সুস্পষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন নির্দ্বিধায়। বর্তমান কক্সবাজারের অবকাঠামোগত পরিস্থিতির পেছনে তাঁর সুস্পষ্ট অবদান রয়েছে।

সমুদ্র সৈকতের ধারে ঝাউবন। এই ঝাউবন স্থাপন করেছিলেন ফজলুল করিম। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য। পরবর্তীতে সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় এই ঝাউগাছের সারি।
উল্লেখ করা যায়, ২০০৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত হয়েছিল। কক্সবাজারকে তখন সাবমেরিন ক্যাবলের 'ল্যান্ডিং স্টেশন' হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
এক ঝলকে

The Sydney Morning Herald এ ৩১ জানুয়ারি ২০০৭ এ কক্সবাজার নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল এরকম: World's longest beach hidden in Bangladesh"

সৈকতে সুন্দর বসার জায়গা

আমাদের ছায়া
কফি ওয়ালা কফি বানানোর সময়

আমাদের প্রথম কফিওয়ালা। পোজ দিতে বলার সাথে সাথে সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে গেল।

প্রথম দিন সকালে। মানুষের ভিড় ছিল। তবে খুব বেশি না।

সূর্যাস্তের সময়

সূর্যাস্ত দেখতে আসা মানুষের ভিড়। সৈকত পুরোপুরি জনাকীর্ণ তখন।

সবুজ-নীল-আসমানি...আহা!

হিমছড়ি যাওয়ার পথে: রাস্তা, রাস্তার পাশে বেলাভূমি, তার পাশে সৈকত, তারপর সমুদ্র এবং শেষে অসীম আকাশ

রাস্তাঘাট খারাপ ছিল না। তবে সাপের মতো আঁকাবাঁকা।

আহারে!

হিমছড়ি সৈকতে। ঝাউগাছের দীর্ঘ সারি।

সানগ্লাসের কাচের ভেতর থেকে তোলা ছবি!

একটু স্পেশাল ইফেক্ট

আরেকটু ইফেক্ট: ধূসর সৈকত

শেষ একটু স্পেশাল ইফেক্ট

পানিভর্তি ফেনা

পায়ের ছাপগুলো কি সুন্দর!

একটুখানি সৈকত

হিমছড়ি ঝর্ণার দুর্দশা: সম্ভবত শীতকাল বলে এ অবস্থা। টাশকি খেতে হয়েছে দেখে। 

হিমছড়ি সৈকত: প্রায় জনশূণ্য ছিল। সম্ভবত একারণেই এখানে অসাধারণ লেগেছে 

কেমন হয়েছে?

ঐ দেখা যায় নীল আকাশ!

ভাটার সময় সৈকতের মাটি এরকম স্তর হয়ে যায়

ভাটার সময়: সৈকতের মাঝে ছোট্ট ঝিল 

আবার ঝাউবন

ঐ দেখা যায় সমুদ্র!

দূর সমুদ্র: ঝাউবন থেকে

সিগাল পয়েন্টের প্রবেশপথ

অপসংস্কৃতির আগ্রাসন সবখানে: ভারতীয় সংস্কৃতি বর্জন করুন 

সমুদ্র সৈকতের কাছের দোকানগুলোয় সাজানো কতোকিছু!

সুন্দর!

পিচ ঢালা পথ
আত্মোপলব্ধি
কক্সবাজার ভ্রমণ করতে গিয়ে আত্মোপলব্ধির ব্যাপারটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ হয় নি। চমৎকার ভ্রমণের সময়গুলো খুব বেশি তাড়াতাড়ি পেরিয়ে গিয়েছে। তারপরও কিছু ব্যাপার খেয়াল করে খারাপ লাগল।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত একটি ট্যুরিস্ট স্পট। ট্যুরিস্ট স্পটকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসমূহের সিংহভাগ মানুষের জীবীকা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে সমুদ্র এবং সমুদ্র ভ্রমণে আসা ট্যুরিস্টদের উপর। কেউ শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরি বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছে, কেউ চা কফি বিক্রি করে চলেছে রাত দিন, আবার কেউ কেউ পানীয়-ছোটখাটো শুকনো খাবার বিক্রির চেষ্টা করছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই এসকল মানুষের জীবীকা অর্জনের ব্যাপারটি খুব বেশি কষ্টের। একটি উদাহরণ দেই:
আমি এবং আমার ভাগিনা সৈকতে ঘুরে আমাদের থাকার জায়গায় ফেরত যাচ্ছি। হঠাৎ একটা ছোট্ট মেয়ে পিছন থেকে হাত ধরল। দেখলাম, তার হাতে ঝিনুক দিয়ে তৈরি বিশাল মালা। সম্ভবত দরজায় লাগানোর জন্য এগুলো ভালো কাজ দেয়। আমাদের বলল, 'একটা নিবেন? বিশ টাকা।'
আমাদের পকেটে টাকা পয়সা ছিল না। থাকলেও তখন পর্যন্ত নেওয়ার কথা মাথায় আসতো না। বললাম, 'না।'
মেয়েটির মুখ করুণ হয়ে গেল। মাথা নিচু করে বলল, 'আচ্ছা যান, একটা পনেরো টাকা দিয়েন।'
আমরা তখন হাঁটা শুরু করে দিয়েছি। মেয়েটি পিছন থেকে দৌড়ে এল। তার মুখ আবার বিষাদে ঢাকা। 'একটা দশটাকা দিয়েও নিবেন না?'
আমার ভাগিনা বলল, 'অন্যদের বিক্রি করো।'
মেয়েটি এবার চুপ। আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবার পিছন থেকে মেয়েটি বেশ জোর বললো, 'ছয়টাই নেন। বিশটা টাকা দিয়েন।'
এবার চূড়ান্ত অবাক হলাম। পিছনে ফিরে দেখলাম ছোট্ট মেয়েটি বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। তাকে দেখে তখন প্রথমবারে পকেটে কোন টাকা না থাকার জন্য আফসোস লাগল অনেক। তাকে গিয়ে বললাম, 'আমাদের কাছে কোন টাকা নাই। থাকলে অবশ্যই নিতাম। সবগুলো নিয়ে যাইতাম।'
মেয়েটি আমার কথা বিশ্বাস করলো বলে মনে হলো না। ভদ্রবেশি দুইজন মানুষের কারো কাছে টাকা নেই, এই কথা তার কল্পনার অতীত। খুবই স্বাভাবিক। আমাদের দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে চলে গেল।
এ ঘটনায় বুঝতে পারলাম খাটাখাটনি করে সমুদ্রের ঝিনুক-শামুক দিয়ে বানানো জিনিসগুলোর বিক্রি খুব বেশি হয় না। যদি হতো তাহলে 'বিশটা টাকা'র জন্য মেয়েটি নিশ্চয়ই এমন করতো না।
সমুদ্র সৈকতে প্রবেশের সময় ক্যামেরা হাতে বেশ কিছু মানুষ চোখে পড়ে। দেখে প্রথমে মনে করেছিলাম শখের ফটোগ্রাফার ট্যুরিস্ট। তবে পোশাক আশাক খেয়াল করে একটু পরেই বুঝতে পারলাম তারা ট্যুরিস্ট না, ফটোগ্রাফার। এবং সমুদ্র সৈকত ভ্রমণে আসা ট্যুরিস্টদের ছবি তুলে প্রিন্ট করে দেওয়াটাই তাদের কাজ।
আমাদের দেখে বেশ কয়েকজন অনুরোধ করল, "ভাই, ছবি তুলবেন?"
সাথে একটি ভালো মোবাইল ছিল। মোবাইলের ক্যামেরাও চমৎকার (ঐ ক্যামেরা দিয়েই ছবিগুলো তুলেছি।) আলাদা করে ফটোগ্রাফার দিয়ে ফটো তোলানোর প্রশ্নই আসে না। তাই না করে দিলাম।
সৈকতে ঘুরতে ঘুরতে চারদিক মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম আমার মতো শুধু আমি না, আসলে সবাই-ই চিন্তা করছে। আমরা এখন তথ্যপ্রযুক্তির চমৎকার এক যুগে বাস করছি। ভালো মানের ক্যামেরা এখন অনেকেরই হাতের নাগালে। বিশেষ করে যারা শখ করে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কক্সবাজার বেড়াতে যান, তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে একটি ক্যামেরা বা ভালো মানের মাল্টিমিডিয়া মোবাইল সেট কেনা কঠিন কিছু না। সাথে আছে চাইনিজ সেটগুলোর সহজলভ্যতা। সবকিছু মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য আবশ্যিক যন্ত্রটি সাথে থাকা খুব বেশি স্বাভাবিক। আর এজন্য স্থানীয় ফটোগ্রাফারদের দিয়ে ছবি তোলানোর অর্থহীন কাজ কেউ করতে চাইবেন না- এটাও খুব স্বাভাবিক। যার ফলে তাদের জীবীকার আবশ্যিক জায়গাটি প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়ছে দিন দিন।
তৃতীয় দিন সৈকতে প্রবেশের সময় একজন ফটোগ্রাফারের সাথে কথা হল। বললাম এ কথাগুলো। সহজ প্রশ্ন করলাম, "এখনকার সময় ছবি তোলা তো কোন ব্যাপার না। আপনাদের কাজ কাম হয়?"
ফটোগ্রাফারের ভাবের কোন পরিবর্তন হল না। সম্ভবত এই প্রশ্ন তার কাছে পুরাতন জিনিস। ভাবলেশহীনভাবেই বলল, "হয় না। কি করুম?"
উত্তর দিলাম, "অন্য কোন ব্যবসা ধরেন।"
বুঝতে পারলাম আমার কোথায় সে বিরক্ত হয়েছে। বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করল না। সোজাসাপ্টা জবাব, "একটা ব্যবসায় ঢুকতে দশ লাখ টাকা লাগবে। কই পামু এই টাকা? এই ব্যবসা ছাড়া উপায় নাই এখন।"
আমি আর কিছু বলার চেষ্টা করলাম না। 'হুম' বলে চলে এলাম।
ছোট ছোট বাচ্চারা সমুদ্র সৈকত ঘুরে বেড়ায় সারাদিন। কেউ শামুক-ঝিনুকের অলংকার বিক্রি করে, কেউ পানির বোতল ফেরি করে বেড়ায়, আবার কারও কাজ গান শোনানো। সাত আট বছরের একটা ছেলের কণ্ঠে গান শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। সুর-টান বেশ সুন্দর। গলায় জোরও আছে যথেষ্ট। বুঝতে পারলাম এই ছেলেমেয়েগুলোকে গানগুলো শেখানো হয়েছিল ট্যুরিস্টদের মনোরঞ্জন করে কিছু টাকা উপার্জনের জন্য। কিন্তু এখন আর তাদের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
সবকিছু দেখে বুঝতে পেরেছি কক্সবাজার যেমন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের জন্য চমৎকার আনন্দের স্থান, ঠিক তেমনি আরেকটি শ্রেণীর মানুষের জন্য বেশ অস্বস্তির জায়গা। এই শ্রেণীর মানুষগুলো না পারছে যেভাবে বেঁচে আছে সেভাবে থাকতে, না পারছে নতুন কিছু করতে। তাদের জন্য বর্তমান বেশ কষ্টের, ভবিষ্যৎও পুরোপুরি অনিশ্চিত। ধনী গরিবের এই সুস্পষ্ট পার্থক্য বেশ খারপ লেগেছে।
এখনো অনেকের কাছে আরেকটি সূর্যোদয় মানে আরো একটি দু:সহ দিন।
পরিশিষ্ট
২০১১ সাল ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য একটু কষ্টকর ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের দুর্দশা দেখে নিজেরই লজ্জা লাগতো। ব্যতিক্রম ছিল ডিসেম্বর মাস। ডিসেম্বর মাসের কক্সবাজার ভ্রমণ এবং আরো কিছু কাজের কারণে শেষ পর্যন্ত ২০১১ এর উপর বিতৃষ্ণা কিংবা বিরক্তির ছিঁটেফোঁটাও এখন আর নেই। ডিসেম্বরের খুব চমৎকার কিছু সময় কেটেছে কক্সবাজারে। অন্যভাবে কক্সবাজার আমাকে চমৎকার কিছু দিন উপহার দিয়েছে। এজন্য এই শহরটির কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে বহুদিন।
আরেকটি কথা। এই পোস্ট হঠাৎ করে দিতে হল। এক প্রকার বাধ্য হয়েই। ব্লগিং এ এখন আমি আর তেমন নিয়মিত থাকতে পারি না। কিছু সমস্যা হয়েই যায়। এই পোস্ট দেওয়ার কারণ চতুর্মাত্রিকে বর্ষপূর্তি। আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে (আসলে ১ বছর ৪ দিন আগে) এই চমৎকার ব্লগটিতে লেখার ইচ্ছায় যুক্ত হয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এক বছর পূর্তির ব্যাপারটি খেয়াল করতে আমি দুই দিন দেরি করে ফেলেছি। 
ও আচ্ছা, এই লেখাটি আমি আমাকে উৎসর্গ করলাম।
কারো কোন সমস্যা??
যাই হোক, সবার জন্য ব্লগীয় ভালোবাসা! 
মন্তব্য
নাহ, কোনই সমস্যা নেই। বর্ষপূর্তির এমন সুন্দর একটা পোস্ট নিজের নামে উৎসর্গ করতেই পারেন। অনেক অনেক শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন।
লেখকের মন্তব্য
দেখার জন্য ধন্যবাদ!
চতুরে আমার পাঠক হ্রাস পাইল মনে হয়। সংকটে আছি।
কোন সমস্যা নাই, মেকানিক্স! নিজেরে উৎসর্গ করাটা তো ভালোই!
- দুর্দান্ত পোস্ট হইসে এইটা! কক্সবাজার আমার জীবনেও বিরাট একটা জায়গা নিয়া আছে। অনেক উজ্জীবনের স্মৃতি!
- আপনের দেখার চোখ ভালো, সেই চোখে আমরাও দেখলাম। সুন্দর, ইনফরমেটিভ, আনন্দদায়ক লেখা।
- শুভ বর্ষপূর্তি!
- সমস্যাগুলো পদানত হয়ে যাক! ভালো থাকেন, আনন্দে থাকেন!
লেখকের মন্তব্য
সুন্দর মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ বাপী ভাই!
ছবিগুলো চমৎকার!

বর্ণনাও ভাল লেগেছে।
কিন্তু আফসোস,আমি কখনো যাইনি জলে......
লেখকের মন্তব্য
ঘুরে আসেন যখন পারেন। জীবনে এই অপূর্ণতা রাইখেন না।
ধন্যবাদ!
আমি ও হাউসসা বাজার গেছিলাম,
স্থানিয়রা কক্সবাজারকে হাউস্যা বাজার বলে জানেন নাকি?
লেখকের মন্তব্য
না ভাই। এইটাতো জানতাম না!
পড়ার জন্য ধইন্যা।

@আকাশগঙ্গা ভাই, স্থানীয়রা হসসবাজার বা হাসসবাজার বলে।

আমি কিন্তু কক্সবাজারের
ঐ হসস বাজাররে ই আমি হাউস্যা বাজার শুনছিলাম মনে হয়। আমার এক বন্ধুর বন্ধুর বাড়ি ওখানে। তার মুখে শোনা।
লেখকের মন্তব্য
সবই একই কথা আকাশ ভাই!
হাউসসাবাজার, হসসবাজার, হাউস্যাবাজার সব একই!
লেখকের মন্তব্য
কক্সবাজারের কই থাকেন??
হোটেল সায়মানের পাশে? আপনি?
মেকানিক্স ভাইরে একটা লম্বাআআআআআআআআআআআ কইরা ধন্যবাদ। বেশ সুন্দর হয়েছে পোস্টখানা।


তয় বাড়িতে গেলেতো আমি হাঁটতে হাঁটতেই বীচে চলে যায়। তাই আপ্নাগো লাইগা আফসুস লাগে
-----------------
চতুরে নিয়মত চাই আপনাকে।
লেখকের মন্তব্য
সময় হইলেই ইনশাআল্লাহ চলি আসুম পুরাপুরি।
হ ভাই। কক্সবাজার গিয়া আমার ভাইগ্না প্রথম যে কথা কইসিল তা হইল, ইশ মামা! আমরা যদি এইখানে জন্মাইতাম!
বোঝেন অবস্থা।
কক্সবাজারের কাউরে দেখলে জিগাই, বাড়ি থেইকা সমুদ্র কতোদূর?
আপনে তো ভাগ্যবান ভাই!
লেখকের মন্তব্য
ইয়োও ম্যাশ! থ্যাংক্স আ লট!

হয়তো আপনে আমাকে দেখসেন, আমিও দেখসি। কিন্তু চিনি নাই!
কতোকিছুই তো হইতে পারে!
ন পড়োব্লেম ভাই। চেনার অপেক্ষায় থাকলাম। আপনাকে সবসময় স্বাগতম কক্সবাজারে।
লেখকের মন্তব্য
ধইন্যা!
চেনাজানা হইলে তো ভালোই!
:D
ধইন্যা আমি খাইনা।

মেকানিক্স ভাইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম। চেনার অপেক্ষায়, পরিচিত হওয়ার অপেক্ষায়।
লেখকের মন্তব্য
ফেসবুক আইডি দিয়া যান। সবই হইবো!
টেরাই মাইরা দেহেন তো
http://www.facebook.com/profile.php?id=1120052727
হে হে হে

আমারো একই কাহিনী
হেই এম , আমিও ডিসেম্বরের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে ওখানে ছিলাম । নিয়মিত বীচে যাওয়া হতো । হয়ত একসময়ে ছিলাম , অন্য জায়গায় ।
দারূণ পোস্ট এম ।
বর্ষপূর্তির শুভেচ্ছা ।
লেখকের মন্তব্য
ইয়োও ম্যাশ! থ্যাংক্স আ লট!
হয়তো আপনে আমাকে দেখসেন, আমিও দেখসি। কিন্তু চিনি নাই!
কতোকিছুই তো হইতে পারে!
ছবি গুলো অসাধারণ!
লেখকের মন্তব্য
ভাইয়ারে, কয়দিন লাগসে এই পোস্ট রেডি করতে?
আর ছবিগুলাও পুরা মাথা নষ্ট করা!
সীমাতিক্রম্য সৌন্দর্যের ছবিগুলো!!
---
প্রিয়তে রাখলাম।
লেখকের মন্তব্য
মাত্র পাঁচ ছয় ঘণ্টা। দুই দিনে শ্যাষ!
ছবি নিয়া কথা বলার জন্য ধইন্যা! কেউ তো কয় নাই।
লেখকের মন্তব্য
অ স্যুরি! কইছে তো কয়েকজন!
ছবিগুলা আমারো ব্যাপক প্রিয়!
মন্তব্য করুন