মেহরাব শাহরিয়ার-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

৯৪ সাল ,সবে মাত্র বাংলাদেশে এসেছি, পেন্টাপ্রমোশন নিয়ে ভর্তি হয়েছি পঞ্চম শ্রেণীতে।খেলার নেশাটা দিনদিন পরিপক্ক হচ্ছে ।পত্রিকা হাতে পেয়েই খেলার খবর গোগ্রাসে গিলতে থাকি । ফুটবল খেলার সাথে সখ্যতা ততদিনে বেশ পুরনো , দেশে এসে কেবল দেশীয় দলগুলোর নাম জেনেছি । অনুভব করি ,ফুটবল উন্মাদনায় প্রকোপে মোহামেডান আবাহনী নাম উচ্চারণ হওয়া মাত্র শান্ত নিরিবিলি পরিস্থিতি কেমন গুমোট হয়ে উঠে , শিরোস্ত্রাণ পড়ে দু'দলে দু'ভাগ হয়ে এই বুঝি মারামারি শুরু হয়ে যায় ।
সেবার হঠাৎ করেই পত্রিকায় পাতা জুড়ে উত্তেজনা ছড়ায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নামের এককালের এলেবেলে দলটি । তাদের টাকার দাপটে সব খেলোয়াড় হারিয়ে অস্থি-চর্ম সার হয়ে উঠে আবাহনী । বেচারা মোহামেডানের চর্মটাও থাকে থাকে না , কঙ্কালের গায়ে উঠে সাদা-কালো জার্সি ।
বর্ষার সাথে সাথে ফুটবল মাঠে গড়ায় । ধানক্ষেত বানিয়ে ফেলা ঢাকা স্টেডিয়ামে ফেডারেশন কাপের চারা লাগানো হয় , তাতে ফাইনালে উঠে মুক্তিযোদ্ধা আর আবাহনী ।টিভি সেটের সামনে সেঁটে থাকি আমি , আর জাফরুল্লাহ শারাফাত , খোদাবক্স মৃধা আর শ্রদ্ধেয় হামিদ ভাইয়ের কমেন্ট্রি বোলচালে দেদারসে রাজা-উজির প্রাণ হারাতে থাকে ।
খেলার বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে যায়,স্লিপ কেটে দু'দলের খেলোয়াড়দের ধপাস করে সিরিয়াল পতন আর আপাদমস্তক কাদায় মাখামাখি ছাড়া খেলায় উত্তেজনার লেশমাত্র দেখি না । হঠাৎ কোথেকে একটা লব উড়ে আসে , গোলরক্ষকের সামনে একা বল পায়ে পেয়ে যান মুক্তিযোদ্ধার ফরোয়ার্ড ।গোল হওয়ার সম্ভাবনায় জাফরুল্লাহ তারস্বরে চিৎকার করে অনেক কিছু বলতে থাকেন ............ "আগুয়ান গোলরক্ষককককক , দেখা যাক মামুন তাকে ফাঁকি দিতে পারেন কিনা ।"
খানিকটা সামনে দৌড়ে ফাঁকা পোস্টে না মেরে মামুন জোয়ার্দার অদ্ভূতুরে সুন্দর নিশানায় আবাহনীর গোলরক্ষকের মুখের চাপা বরাবর বল ছুটিয়ে দেন । বলের আঘাতে থোতা মুখ ভোঁতা হয়ে যাওয়ার শোকে আবাহনীর খেলোয়াড়রা বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠে । ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে খোদাবক্স আর জাফরুল্লাহ অনেক শব্দ উচ্চারণ করেন , কিন্তু আমার কানে বাজে কেবল একটি শব্দ "আগুয়ান, আগুয়ান" ।
একবার মনে হয় , গোলরক্ষকের নামই বুঝি আগুয়ান , পরক্ষণে ভাবি "গোলরক্ষক আগুয়ান" না হয়ে "আগুয়ান গোলরক্ষক" কেন বলা হল ? আবার ভাবি নরেণ মাঝি বা তফিজ মাস্টার যদি হতে পারে আগুয়ান গোলরক্ষক হতে দোষ কি ?
মুশকিল আসান হয় কিছুদিন পর । সেকালে রন্জন নামে কোন একদলে একজন স্ট্রাইকার ছিলেন , লীগে কোন একবার পরপর দু'টি ম্যাচে দুরন্ত কায়দায় রন্জন একজোড়া গোলও করে বসলেন। পত্রিকার পাতায় ছাপার হরফে সে কথা লেখা হয় , পাশাপাশি লেখা হয় আগুয়ান রন্জন কি করে এমনতর অসাধ্য সাধন করে বসলেন সে কাহিনী।চোখ বুঁজে রন্জনের গোলের দৃশ্য কল্পনা করি , রন্জনের পায়ে দিব্যদৃষ্টিতে বলের বদলে আগুনের গোলা দেখি ।
বুঝতে বাকি থাকে না , আগুনের গোলা সদৃশ ফুটবল পায়ে খেলোয়াড়গুলোকেই আগুয়ান বলা হয় ।
কিছুদিন বাদেই বিশ্বাসে চিড় ধরে । সেবার রেডিওতে খেলা শুনছি , জাফরুল্লাহর কমেন্ট্রির মাঝে ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠা আগুয়ান শব্দের ঝংকারে আমার স্নায়ু সাড়া দিয়ে উঠে। বল পায়ে স্ট্রাইকার যে আগুয়ান ,সেই আগুয়ান হয়েই ডিফেন্ডার এসে ট্যাকল করে , আবার একই আগুয়ান যখন গোলরক্ষক হয় , বল তার হাতে এসে জমা পড়ে ।
নিশ্চিত হই , আগুয়ান রামও না , রাবণও না , বলও না , বল পায়ে ছুটে চলা খেলোয়াড়ও না ।
আব্বুর দ্বারস্থ হয়ে শেষমেশ আগুয়ানের হয় সমাধা , সংকটের হয় সমাধি।
পাদটিকা
আগুয়ান ---- অগ্রবর্তী, অগ্রগামী,অগ্রসর
তথ্যসূত্র : সংসদ বাঙ্গালা অভিধান, চতুর্থ সংস্করণ
-----------------------
(সামু ব্লগে সুদূর অ্তীতে প্রকাশিত)
মন্তব্য
দারুণ মজার লেখা! খুব ভালো লাগলো!
এ রকম সবারই হয় মনে হয়! আমি তো এক সময় হিমশিম খাওয়া নিয়ে হিমশিম খেয়ে গেছিলাম! হিম ঠাণ্ডা শিম খেলে অসুবিধেটা কোথায় বুঝতে গিয়েই হিমশিম! আজও জানি না এই শব্দগুচ্ছের উৎপত্তি ইতিহাস!
ভালো থাকুন!
লেখকের মন্তব্য
আসলেই , প্রশ্নটার যৌক্তিকতা হারিয়ে কিন্তু যায়নি ? শিম খেলে কি হয় ? এই শিম কি সেই শিম ?
হা হা হা! আগুন বা আগুনের গোলা হয়ে যেতে পারে আগুয়ান!! শব্দ যথাস্থানে যথা প্রয়োগের ব্যত্যয় ঘটলেই যে শুধু প্যাঁচ লাগে তাই নয়, শুনবার বা বুঝবার ভুলেও হিমশিম খেতে হয়। হিমশিম যে ঠাণ্ডা শিম কেন নয়, তা বুঝতে বাপী হাসান যেমন হিমশিম খেয়েছে, তেমন ঘটনা আরও ঘটে নিত্যই।
সুন্দর একটা বিষয়ের অবতারনা করার জন্য ধন্যবাদ মেহরাব।
লেখকের মন্তব্য
আপনার জন্যও শুভকামনা
হা হা হা ... ... ...
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ
ভাইজান আগে কই ছিলেন, জাউজ্ঞা, তয় আপনার পোষ্ট পইরা বিয়াপক আনন্দিত হইলাম
। আরেকখান বিচয়
আপনার লগে আমার একখান জিনিচ্ মিল্লো ক্যামতে
। আমি কিন্তু কমুনা
কোন জিনিচ্।

পুষ্ট চেইরকম হইসে
লেখকের মন্তব্য
কোন জিনিস ? কোন জিনিস ? বলে ফেলেন , পুরান হয়ে গেছে পুস্ট , কেউ খেয়াল করবে না।
তার আগে বাসায় ছিলাম , বাসা ছিল বৈদেশে
হাহাহাহা'
দারুন দারুন।
আমার মধ্যেও এরকম কিছুটা ছিলো।
যেমন, 'বন্ধুর পথ'-কে আমি ভাবতাম, বন্ধু'র তৈরি করে দেয়া পথ বা বন্ধু'র বাড়ির পথ!
=============
ভাল থাকুন অবিরত!!
লেখকের মন্তব্য
আপনাদের অভিজ্ঞতাগুলো আরও বেশ চমকপ্রদ । "বন্ধুর পথ" --- হাহাহা
হা হা হা।।।।
এগিয়ে যান - আগুয়ান!
লেখকের মন্তব্য
এইতো আছি জোয়ান, হবই আগুয়ান
অনেক ধন্যবাদ পড়ার জন্য
আপনি দেখি ছোট ছোট অনেক শব্দ নিয়েই অনেক মাথা ঘামিয়েছেন
--
আমি একটা কবিতার লাইন নিয়ে একটু হিমশিম খাইছিলাম
আলসে নয় সে ওঠে রোজ সকালে
এটাকে পড়তাম, আসলে নয়সে ওঠে রোজ সকালে
আলসে জিনিসটা বুঝতাম কিন্তু নয়সে কি জিনিস বুঝতে অনেক বড় হওয়া লাগছে
লেখকের মন্তব্য
হাহাহা , হোহোহো
অনেক হেসেছিলাম যেদিন কমেন্ট করেছিলেন সেদিনই , আজও আবার প্রাণখুলে হাসলাম ।
আপনার স্মৃতিচারণগুলো আমার সাথে খুব মেলে। কাছাকাছি বয়স এবং মানসের বলে হয়তো
লেখকের মন্তব্য
জেনে ভাল লাগল , ভাল থাকবেন
একসময় আমি ভাবতাম। ওরফে বোধ হয় মানুষের নাম। মোহাম্মদ আলি ওরফে বাবু নাম হলে মোহাম্মাদ ওরফেউদ্দিনও কারো নাম হতে পারে।
লেখকের মন্তব্য
মজা পেলাম আপনার কমেন্ট পেয়ে , সবাই তাহলে আমরা একটা বিন্দুতে গিয়ে ঠিকই মিলে যাই , চিন্তাভাবনাগুলো সমান্তরাল হয়ে ওঠে ক্ষেত্রবিশেষে
মন্তব্য করুন