মেহরাব শাহরিয়ার-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি


জি এইচ হার্ডি, প্রখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ। প্রফেসরের কথায় কথায় অক্টোবরে হার্ডির সাথে পরিচয় হল গেল অক্টোবরে । বেশ কিছুদিন ধরে গণিতের সাথে আমার সম্পর্কটা কিছুটা লুকোচুরি মিশ্রিত বলে জনাবের নাম শুনে দু'চার পা অগ্রসর হওয়ার বদলে না চেনার ভান করে পিছনেই ফিরে রইলাম। নভেম্বরে জানলাম তার আরেকটি তথ্য । ১৯৪০ এ প্রকাশিত হয়েছিল তার বিরল এবং বিখ্যাত বই, যার নাম আমাকে অন্ত:ত বিস্মিত করে তুলল-- A Mathematician's Apology। বইটার পেছনে লেগে গেলাম প্রায় সাথে সাথেই। Apology তথা ক্ষমা কেন চাইবেন একজন গণিতবিদ? খানিকটা এগুনোর সাথে সাথে পরিস্কার হতে শুরু করল সবকিছু , ক্ষমা অর্থে Apology ব্যবহার করেননি তিনি , সারাজীবনে তার গাণিতিক কর্মকান্ডের পেছনে Justification/যৌক্তিকতাগুলো তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।
জি এইচ হার্ডি সে কারণেই এখন আমার চোখে অন্যরকম কেউ। গণিতবিদের যেখানে কারও কাছে জবাবদিহিতা অপরিহার্য নয় ,সাহিত্যিকের বেলায় সেখানে যৌক্তিকতার বিশ্লেষণ আর আত্মসমর্থন অনেকাংশেই কাম্য । গল্প,কবিতা পড়ে পাঠক নিজের মত করে গল্পের গল্পসৌধ গড়ে , ছবি আঁকে , তবুও গল্পের পেছনে লেখকের গল্প জানবার তৃষ্ঞা কি তাতে কখনও লাঘব হয়? সেই না হওয়া ঘটনাটিই এবার ঘটল ।মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়ের "প্রযত্নে-হন্তা" গল্পগ্রন্থটি পাবার সাথে সাথে পৃষ্ঠা উল্টে প্রতিটা যখন লেখকের Apology সম্বলিত "গল্পের গল্প" অনুচ্ছেদটি চোখে পড়ল , আগ্রহের পারদ তখনই আকাশ ছুঁয়েছে।
Apology of a reviewer: একজন পাঠক হিসেবে আমার কিছু বৈশিষ্ট্য আছে , কারও দৃষ্টিতে সেটা সীমাবদ্ধতা মনে হলে আগাম দুঃখপ্রকাশ করে নিচ্ছি।
প্রথমত , আমি সাহিত্যের ঠিক সমঝদার পাঠক নই , কিন্তু আমি অক্লান্তভাবে নতুনত্বের সন্ধানী।
দ্বিতীয়ত, বেশিরভাগ গল্প যেখানে মূলত দাঁড়িয়ে থাকে ফিকশনকে আশ্রয় করে, সেখানে আমি কেবল সত্যাশ্রয়ী ঘটনাই বেশি করে খুঁজেই ক্ষান্ত হইনা, খানিক স্বার্থপরের মত আমি সব গল্পের মাঝে নিজের জীবনের প্রতিবিম্ব খুঁজি।সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচারক হয়ে উঠার চেষ্টাটা অনেক সময় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়ে যায় আমার ব্যক্তিগত ভাললাগার দিকে অবচেতন পক্ষপাতের কারণেই ।
তৃতীয়ত, ভেতর থেকে নির্মোহ থাকার প্রবল একটা অনুভূতি আমাকে তাড়া করে ফেরে, নিরপেক্ষতা হন্তারক কোন উপাদান । লেখক এখানে আমার অনুজপ্রতীম , চেনা জানা , আর আমি পড়ছি তারই ছোটগল্পের একটি সংগ্রহ। তাই রিভিউ লেখার চিন্তাটা ছিল একান্তই দুরাশা।
স্রষ্টা কিন্তু অন্যকিছু ভেবে রেখেছিলেন। বইটা হাতে নিয়ে উল্টো করে শেষ গল্পটা দিয়ে শুরু করলাম যখন, দ্বিতীয় আর তৃতীয় আশংকার মৃত্যুতে সময় লাগল না।
এক
"পাঠক সমীপেষু" গল্পের বিল্ড-আপটা বেশ তাৎপর্যবহ । সমসাময়িক প্রকাশিত উপাদানগুলোকে সংকলিত করে চলমান এক বিতর্কের নতুন করে সূত্রপাত ঘটে দু'দল লেখকের মাঝে। গল্পাশ্রয়ী, উপভোগ্য এ বিতর্কে ক্লান্তি আসে না এক মুহুর্তও , বরং দু'পক্ষের বহুলাংশে অকাট্য যুক্তির তোড়ে নিজের পুরনো বিশ্বাসের পেন্ডুলামরুপী কাঁটাটা টলে উঠে কেন যেন সাম্যাবস্থার চারপাশে স্থিতি পেতে চায়। পাঠক মানস বড় বিচিত্র ,বোধ করি ঠিক আমার মতই, এত উপভোগ্য বিতর্কেও খানিক পর আমি জয়-পরাজয়ের সন্ধানী হয়ে উঠি। বিতর্কের ফলাফল তবে কোথায় গিয়ে ঠেকবে , বাস্তব জীবনে বহতা এই তর্ক গল্পের ফ্রেমেও কি অস্পষ্টই থেকে যাবে কিনা সেসব নিয়ে কৌতুহল দানা বাঁধতে শুরু করে। গল্প ঠিক তখনই ভীষণ গতিতে আচমকা মোড় নেয় । টানটান উত্তেজনার আবহ ছড়ানোর পর চমক আসে , বাস্তবতার নিরীখে দশক বা যুগের বিতর্ক অসমাপ্ত রয়ে যাওয়ার ফাঁকে চাপা পড়ে যাওয়া তৃতীয় কোন সম্ভাবনার মৃত্যুর আকুতি বাজে খুব বেশি করে। ভীষণভাবে নাড়িয়ে যাওয়া মেসেজটি গল্পের শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ভাবায় । আমার মাঝের পাঠক সত্ত্বা তখন মুগ্ধ, সদ্য জাগ্রত ভাবুক সত্ত্বা আক্রান্ত গভীর ভাবালুতায়।
দুই
A Very Long Engagement নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম বছর চারেক আগে। সিনেমাটিতে ভাল লাগার শত উপকরণ শুরুর দিকের একটা দৃশ্য এখনও চোখে আটকে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রন্টে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন ফরাসী সেনা থিকথিকে কাঁদায় আটকে যাওয়া বুট ভীষণ সংগ্রাম করে টেনে টেনে সামনে এগিয়ে চলে। কোন অদৃশ্য অলঙ্ঘনীয় টানের অনুবর্তী করে, সে দৃশ্যটি আমাকে পুরো সিনেমাটি আদ্যোপন্ত দেখার প্রবল আকর্ষণে বেঁধে রাখে। এতগুলি দিন পর ঠিক একই রকম অনুভূতি ফিরে আসে ভিন্ন আবেশে, গল্প হয়ে।
সেই নামে আটকে থাকা গল্পটির নাম "র্দাপ"। নাম উচ্চারণের সংগ্রামে করতে ব্যর্থতা ক্রমশ: সংক্রমিত হয় কৌ্তুহলে । শুধু গল্পের নামকরণের রহস্য থেকে যে কৌতুহলের সূচনা তার সমাপ্তি অপেক্ষা করে অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক স্বীকোরক্তি দিয়ে।
মানসগ্রন্থের জটিলতম অধ্যায় "মন" নিয়ে র্দাপ এ চলে সংঘাত। গল্প যত এগোয় লাবণীকে ভীষণ চেনা লাগে , দু'চারবার ভাবতে হয় এ গল্পের মূল চরিত্র কি আমি নিজে ? তারপর একটা সময় লাবণী প্রতিস্থাপিত হয়ে যায় আমার নিজেকে দিয়ে ।গল্প এগোয় আমার নিজের মত করে , অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি লাবণীর দ্বৈত সত্ত্বার সাথে তার নিজের মাঝে জেগে ওঠা দ্বিতীয় সত্ত্বা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ।
মানুষের এই দ্বিতীয় সত্ত্বা ভীষণ গোঁয়ার , প্রতিনিয়ত নানান রুপে প্রশ্ন তোলে তার সাফল্যকে নিয়ে।জগৎ যেখানে প্রশংসায় অকুন্ঠ , চারপাশের আর দশটা মানুষ যখন আমাকে নিয়ে খেদহীন নিশ্চিন্ত , আমার দ্বিতীয় সত্ত্বা বিবেকের আশ্রয়ে নিজের বিচ্যুতিগুলোকে ক্যানভাসে এঁকে নিজেকে অপরাধী করে তোলে।
প্রশ্নের জওয়াব মেলে গল্পের একদম শেষ লাইনে এসে সম্পাদকের মৃদুহাস্য মিশ্রিত প্রশ্নে , "লাবণীরও একই সমস্যা?" লাবণী সেই মুহুর্ত থেকে আলাদা কেউ নয় , মানুষের মানসপটের প্রতিচ্ছবি। তড়িৎগতির স্লাইড শোর মত ঠিক তখনই পেছনে ফেলে আসা গল্পের অসাধারণত্বগুলো রং পেতে শুরু করে। লাবণীর আয়নায় "র্দাপ" কে আমরা পড়ি পর্দা , আয়নার মাঝে , দেয়ালের খাঁজে , পর্দার ভাঁজে স্পষ্ট করে দেখি আমাদের সমান্তরাল অস্তিত্বকে। সব মিলিয়ে র্দাপ দারুণ সফল তার প্রাঞ্জলতায়, বিকাশে , উপমা আর ভাষার ব্যবহারে।
"র্দাপ" পড়ার পর থেকে আমার অবচেতন মন বিশ্বাস করতে শুরু করে ,আমি একাই সম্ভবত আমার মত করে ভাবছি না ।ঠিক করে ফেলি সুযোগ পেলেই ,নিজেকে এরপর থেকে ক্ষুদ্র "আমি"র বদলে বৃহত্তর পাঠক পরিচয়েই পরিচিত করব।
তিন
ঈশিতা একটি আমগাছ খুঁজেছিল গল্পটির স্বাতন্ত্র্য, মূলত এর বর্ণনা ভঙ্গীতে । "ঈশিতা আরেকবার সারারাত কেঁদেছিল ঐ ঘটনার ১৪ বছর পর -- খুব সাধারণ এই বাক্যটি গল্প শেষ হওয়ার আগে গল্পের সাথে পাঠকের সম্ভাবনাটির মৃত্যু ঘটায় । গল্পের ভাষ্যে সাধারণ অতীতের ব্যবহারে গল্পে যখন একটা ছন্দ আসে , গল্পটাকে তখণ কখনও কবিতার মত লাগে , কখনও বা ছবির মত লাগে। কিন্তু কবিতা বা ছবি গল্পের চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর বলেই হয়ত একটা বিরাট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত গল্পটি ছবির মত বা কবিতার মত গল্প হয়ে উঠে না। অনর্গল সুরেলা ভাষারীতির সামান্য বিচ্যুতি গল্পের কিছু জায়গায় সুর কেটে দেয়, অসাধারণ একটা ছবি ফ্রেমে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগটি খানিকটা ফ্যাকাশে হয় । গল্পকারের ইচ্ছেটা অবশ্য তাতে মরে যায় না , পাঠকের ভাবনার উঠোনে শেষ বিকেলে বদলে যাওয়া সময়ের আলো ঠিকরে পড়ে।
চার
খ্যাতনামা ইরানী পরিচালক জাফর পানাহির দারুণ একটি সৃষ্টিকর্ম "মিরর" সিনেমাটি হয়ত পাঠকদের অনেকেরই দেখা। সে সিনেমার পুরোটা সেলুলয়েড জুড়ে বিস্ময়করভাবে চলে কেবল একটি সিনেমা বানানোর সংকল্পের ছবি। প্রশ্ন ওঠে সিনেমাকে কি সবসময় প্রথাগত সিনেমাই হতে হবে? আর দশটা সিনেমার মত তাতে প্রেম ভালবাসা, বিরহ , হাসি থাকতেই হবে ? একটু ঘুরিয়ে যদি বলি, আমরা কি প্রশ্ন করতে পারি না যে, গল্পকে কি শুধু গল্পই হতে হবে ? গল্প বাঁধার গল্প কি গল্প হতে পারে না? বোধ করি , পানাহি স্বয়ং "লিখি চলো" গল্পটির সুন্দরতম বিশ্লেষণটি করতে পারতেন ।
লিখি চলো প্রচলিত অর্থে গল্প নয়, এটি একটি গল্পের পরিকল্পনা , যার মাঝে গল্পকে ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ভীষণ মমত্ব ভরা বর্ণনায় যেখানে একটি গল্পের ভ্রুণের জন্ম দেয়া হয়। প্রচলিত রীতি-নীতি ভেঙে সূত্রের অমোঘ নিয়মে বন্দীত্ব বরণ করে গল্পকার গল্পের জন্মের প্রয়াস নেন। পারিপ্বার্শিক নানান উপাদান থেকে থেকে জন্ম নেয় বিচ্ছিন্ন উপাদান , গল্পের জীবন চক্রের নানান ধাপে আলোড়িত হয় , কখনও হয় সংকুচিত বা প্রসারিত।
বিবর্তন চক্রে একটা সময় একটি গল্পের জন্ম হয় । অতঃপর লেখক গল্পের গল্পে ব্যাখ্যা করেন তার যৌক্তিকতা , কেন শুধু গল্পের খাতিরে এই গল্প নয় । এ গল্পটিতে বর্ণিত কাঠামো হটে পারে ভবিষ্যতের অনেক গল্পের সম্ভাবনা , অনেক গল্পের জনক এবং জননী ।
বইয়ের অন্য আর সবক'টি গল্পের চেয়ে এই গল্পটি অনন্য হওয়ার একটি কারণ হতে পারে গল্পটির পড়ার পর গল্প-শৈলীকে ছাপিয়ে গল্পের মাঝের উদ্যোগটি ঘিরে পাঠকদের মনে জেগে ওঠা প্রশ্ন ।ছাঁচে ফেলে এমন গল্প রচনায় গল্পের প্রাণ কি হারিয়ে যায় না? লেখকের হৃদয় নিঃসৃত অনুভূতির অবাধ প্রবাহের অভাবে এমনতর গল্প কি জরাগ্রস্থ স্রোতহীন হয়ে উঠতে পারে না?
পাঁচ
নামকরণ অনেকসময় প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে দেয়। পাঠক হয়ত সবচেয়ে বেশি সেটি অনুভব করবে 41 গল্পটিতে গিয়ে ।চিরায়ত ধারার ইতিহাস আশ্রয়ী গল্প একদিকে ৭১,২১ আর ৫২ কে দেয় অবারিত সুযোগ , অন্যদিকে মানবমনের অবচেতন একটি ধারা বড়জোড় খোঁজে , গল্পের নামে ১২ এর গুণিতক । কিন্তু , 41 কি করে তার নাম হয় ? সে প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে যাওয়াই গল্পের গভীর প্রবেশের মূল উদ্দীপনা যোগায় । গল্পের বিকাশের সাথে সাথে একটা সময় সায়েন্স ফিকশনের আবহের একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে থাকে , তবে শেষ পর্যন্ত সেটা আর প্রধান উপজীব্য রয় না। গোধুলী লগ্নে মোবাইল সেটে এসএমএস
এর প্লাবন আরমানকে যখন মুগ্ধ করে , তখন সবকিছু ছাপিয়ে নিগূঢ় মনস্তাত্ত্বিক বোধেরই প্রকাশ হয় । গল্প শেষে গল্পটির নামকরণে 41 প্রসঙ্গটি আরেকবার সামনে আসে , কিন্তু গল্পের ভেতরকার ব্যাখ্যা সত্ত্বেও নামকরণটি ঠিক গল্পের উপযোগী স্বার্থক হয়ে উঠতে পারে না।
ছয়
মনীষী সিন্ড্রোম গল্পটি নিঃসন্দেহে বইটির সৌকর্য বাড়িয়েছে । ডায়েরিকে পটভূমি করে অসংখ্য গল্প রচিত হয়েছে আজ অবধি , কিন্তু গল্পকার হয়ত দাবী করতেই পারেন তার গল্পে পাঠকের চিরাচরিত ধারণার বিপরীতে এমন কিছু উপাদান আছে যা হয়ত পাঠক আগে কোথাও দেখেনি। দু'টি মানুষের বিকাশ এবং বিবর্তনের স্বাক্ষী হয়ে রয় একটি ডায়েরি, সে পরিবর্তন ধরা পড়ে ডায়েরি পাঠক তৃতীয় একটি মানুষের চাহনিতে। একটা সময় ডায়েরি তৃতীয় মানুষটিকেও তার সত্ত্বার সাথে মিশিয়ে ফেলে , ডায়েরির সেই আবেদন অগ্রাহ্য করার ক্ষমতাটুকু তখন আর থাকে না। মানুষের মানসপটের ক্যানভাস চিরে নানান বর্ণের ব্যবচ্ছেদ করার লেখকের অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় মেলে এই গল্পে ।
সাত
"একটি লাল পিঁপড়া একটি কালো পিপড়াকে অতিক্রম করে গেল--- গুরুত্ব বিচারে এটি কোন ঘটনাই নয় ।" গল্পের প্রথম বাক্যটি যদি শৈল্পিক বিচারের প্রধান মাপকাঠি হত , তবে পাঠকের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে এগিয়ে থাকতো "গ,ল,হ; তবু গলগ্রহ" গল্পটি।
একমাত্রিক একটি ধারাকে ঘিরে গল্পের প্রথমাংশের বিকাশ , তারপর আরেকটি আলাদা ডাইমেনশনের উদ্ভবের সাথে কিছু সময়ের জন্য প্রথম ধারাটি হারিয়ে যায়। একটা সময় দু'টো ধারা মিলিত হয়ে অভিন্ন লক্ষ্যে ছোটে , গল্পের শেষে দু'টো ধারা আবার দু'টো প্রবাহে আলাদা হয়ে যাবার সম্ভাবনা উঁকি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে উঠে না । সম্পর্কের বিস্তৃত জালে ,বিচিত্র মানব ভাবনায়, মানুষের সংকল্পের ভঙ্গুর অবস্থানটিকেই গল্পের সবচেয়ে মোক্ষম পরিপূরক মনে হয় । যদিও গল্পের শেষটা কেমন হতে পারত সেটা নিয়ে পাঠকদের নিজস্ব মতামতের অবকাশ খানিকটা রয়ে যায়, তারপরও গল্পের বর্ণিত দু'টো ধারার সমন্বয়গুলো বেশ মসৃণভাবে এগোয় বলে গল্পটি সুপাঠ্য ।
আট
সাহিত্যে গল্পে, কবিতায় একাত্তর(৭১) এসেছে নানাভাবে , কিন্তু ৭দশ১’একাত্তর তারপরও আলাদাভাবে উল্লেখ করার দাবী রাখে। ৭দশ১’একাত্তর সুস্পষ্টতই একাত্তর নিয়ে প্রচলিত ধারার খোলস ভেঙে আসার দারুণ প্রয়াস। সে কাজটি করতে গিয়ে গল্পকারের মুনশিয়ানা চোখে পড়বার মত ।৭১ নিয়ে গল্পগুলো ঠিক যেখানে বাধা পড়ে থাকে ঠিক সেখানটাতেই গল্পে প্রথম আঘাত হানা হয় । ঘটনাগুলোর আবর্তনচক্র বর্তমান সময়কালে বলে , পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের উথান-পতন গল্পকার ঘটিয়েছেন সাম্প্রতিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই ।
গল্পটিতে একটি খুঁত অবশ্য আমাকে খুব বেশি ভুগিয়েছে -- সেটি হল ১২ বর্গফুট। ১২ বর্গফুটের একটি ঘরে কি আদৌ ৩ জনের থাকা সম্ভব ?
নয়
ছোটগল্পের স্বার্থকতা কি কেবল তার মিলনাত্মক বা বিরহাত্মক পরিসমাপ্তিতে ? ছোটগল্প কখনও বা সফল বা কখনও ব্যর্থ হয়, অসমাপ্ত রয়ে যাওয়াটাকেই কি সবসময় ব্যর্থতার সংজ্ঞা হিসেবে দাঁড় করানো যায়?
এবার পরিপূরক কিছু প্রশ্ন করা যাক। ব্যর্থ হয়ে যাবার দেয়ার মানস থেকেই যদি
জন্ম দেয়া হয় কোন গল্পের , তবে কেমন হত সেটা? চরিত্রগুলো সুচারুভাবে পুঙ্কানুপুঙ্খরুপে গড়ে তোলার পর লেখকের ভীষণ হেয়ালিতে যদি সেই কাঠামোটি গুঁড়িয়ে দেয়া হত তবেই বা কেমন হত ?
আপাত কল্পনায় হয়ত আমরা পাঠকের কপালে বিরক্তিরেখা দেখি , মুখে দু'চারটি ক্ষোভ নিঃসৃত বাণী শুনি। কিন্তু অবাক ব্যাপার হল , অসমাপ্ত রেখে দেবার পরও "২৫ অক্টোবর" গল্পটি নিয়ে কোন ক্ষোভ জাগে না , বরং গল্প শেষ না করার পুরোটুকু স্বাধীনতা লেখককে দিতে ইচ্ছে হয় । আরেকটু যদি আশাবাদী কন্ঠে বলি , পাঠককে নিজের মনের মত করে গল্প গড়ে নেয়ার সুযোগ এর চেয়ে বেশি আর কোথায় পাওয়া যেতে পারে? তবে পাঠকের সে কাজটি সহজ করে দেয়ার স্বার্থেই হয়ত গল্পকার গল্পটি আরেকটি এগিয়ে নিতে পারতেন। তারপরও বলতে হয় , শুধুমাত্র চিন্তাধারার নতুনত্বের কারণে এ বইয়ের "২৫ অক্টোবর" গল্পটির ধারণাটি অনেকদিন মনে থাকবে।
দশ
কোন কিছুর ডিটেইলিং করা বেশ পরিশ্রমসাধ্য কাজ ।বইয়ের নামে যে গল্প "প্রযত্নে-হন্তা", সেখানে গল্পকার এই কঠিন কাজটিই করার জন্য ব্রতী।চারটি কেন্দ্রীয় চরিত্র , চারটি আলাদা জীবন , চারটি আলাদা প্রেক্ষাপট , চারটি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি, যেন চারটি সুদৃশ্য বক্ররেখা , যাদের উথান-পতন আছে , ছেদবিন্দু আছে, অথচ সমান্তরাল ধারায় তাদের বিকাশ লেখকের হাত ধরে। দীর্ঘ বিকাশ শেষে চারটি জীবনরুপী বক্ররেখা বারংবার পরস্পর পরস্পরকে ছেদ করে একটা বিন্দুতে এসে মিলে যায় , অদৃশ্য একটি নিয়তি বা শক্তির বাঁধনে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে । গল্পে এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে বদলে যাবার মাঝে সংযোগবিন্দুগুলোর উপস্থাপন কৌশলটিও বেশ অভিনব । গল্পটি যে ধাঁচে গড়ে ওঠে ,নিঃসন্দেহে এটি বইয়ের সবচেয়ে কঠিন গল্পগুলোর একটি , সে কারণেই মনে হতে থাকে সংযোগবিন্দুগুলোকে মসৃণ রাখা ভীষণ দুরুহ। লেখক হয়ত তার হৃদয় নিংড়ে গল্পটির দেহে প্রাণ সঞ্চার করেন , কিন্তু পাঠকের চোখে নিখুঁত গল্পই আরও বেশি প্রয়োজন । তাই শিল্পগুণে উৎরে গেলেও গল্পটা কেন যেন সুপাঠ্য হয়ে ওঠে না ।
--
লেখার স্বার্থকতা তখন,যখন লেখকের নিজস্ব ভাল লাগাগুলো পাঠকের চাহিদার কাছে হারিয়ে যায় না । লেখার স্বার্থকতা তখন , যখন গতানুগতিক ধারার বাইরে লেখক নতুন কিছু পাঠকের জন্য সৃষ্টি করতে জানেন।আর তিনিই সফল লেখক যিনি উপরোক্ত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে পাঠকের ভাল লাগা / খারাপ লাগার মত আপেক্ষিক ব্যাপারটিকেও অতিক্রম করে পাঠক মন জয় করতে জানেন । গতানুগতিক এবং আপাত স্তিমিত সাহিত্যধারার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এবং উপরোল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর বিচারে "প্রযত্নে-হন্তা" পাঠককে নিঃসন্দেহে নতুন কিছু দিয়েছে। পাঠকের ভাল লাগা/খারাপ লাগার স্বাধীনতাটা না হয় পাঠকের কাছেই সংরক্ষিত থাকুক , কিন্তু একজন সৃজনশীল গল্পকার হিসেবে মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়ের জন্য শুভকামনা রইল।
মন্তব্য
ধন্যবাদ মেহরাব ভাই।।। আপনার রিভিউয়ের যে ব্যাপারটি আমাকে সবচেয়ে বেশি টানল, তা হল, প্রতিটি গল্পের ক্ষেত্রে আপনার নিজস্ব চিন্তাধারাটি বোঝা গেছে, যা রিভিউগুলোতে সাধারণত দেখা যায়না।।।পাঠকের এই গুণটি আমি উপভোগ করি; গল্পের ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে নিজের একটা চিন্তাধারা তৈরি করতে চায়।।। তাই এই রিভিউ অবশ্যই আলাদা মাত্রা দাবি করে।।।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ । আলোচনা জারি থাকুক
আপনার রিভিউটাই ভালো লাগলো বেশ - সবাই এতো রিভিউ দিচ্ছে সব গুলো গল্পই পড়ার ইচ্ছা জাগছে - বিশেষ করে র্দাপ ।
লেখকের মন্তব্য
একদিকে হিমালয়ের দশটি গল্পের ভাবনা দশরকম , অন্যদিকে দশটি ভাবনাই প্রচলিত ধারার ভাবনাগুলো থেকে স্বতন্ত্র । আপনার মুভি-চয়েস সম্পর্কে ধারণা থেকে বলতে পারি , গল্পগুলো আপনার ভাল লাগবে।
রিভিউ লেখার ধরণটা বেশ টেনেছে আমার কাছে। তবে যেটা আসল ব্যাপার সেটা হলো গল্প ধরে আলোচনা করতে গেলে এক ব্লগে পুরো স্থান দেয়াটা বেশ কষ্টকর। তারপরেও তোমার লেখার মধ্য দিয়ে বইয়ের মূল ফ্লেভার কিছুটা হলেও আসে- সেটা বড় সফলতা বলতে হবে।
লেখায় একটু তাড়াহুড়ার ছাপ আছে। তারপরেও এটাকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে অপটিমাম রিভিউ বলেই আমি রায় দিবো।
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ । আমি নিজে সামান্য অসন্তুষ্ট রিভিউ নিয়ে , গল্পগুলো পড়ার সময় আমার মাথায় আরও অনেক কিছু ভর করছিল , কিন্তু সবগুলো গল্প যখন পড়া শেষ করলাম , তখন সেসবের অনেক কিছুই ধোঁয়াটে হয়ে গেছে । সে কারণে এই বইয়ের পুরোটা একসাথে রিভিউ করা বেশ কঠিন মনে হয়েছে, প্রতিটা গল্প যদি আলাদা করে রিভিউ করা যেত , তাহলে হয়ত তৃপ্তি পেতাম
মন্তব্য করুন