মেহরাব শাহরিয়ার-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাঙালী যতই অস্বীকার করুক "চন্দ্রবিন্দু"র প্রতি তাদের গভীর প্রেমের কোন ঘাটতিই নেই। শৈশবে তারা "হাঁও মাঁও খাঁও, মাঁনুষের গঁন্ধ পাঁও" জপ করে ভূতের গল্প শোনে, যৌবনে তারা শুঁড়িখানায় যেতে চায়, হরদম শুভ্র দেবের গলার ভীষণ নাঁকি নাঁকি গান শুনে আমোদিত হয় ,আর খানিক বয়স বাড়লে ভুঁড়ি গজায়।

"চন্দ্রবিন্দু"র প্রতি আমার গভীর ভালবাসাও সেই পিচ্চিবেলার বর্ণশিক্ষার প্রথম পাঠ থেকেই।মানুষ যে কারণে আইপড ভালবাসে, যে কারণে যুগে যুগে ভোক্সওয়াগন ভালবেসেছে , ঠিক সে কারণেই আমিও চন্দ্রবিন্দুকে আমার মন দিয়েছিলাম। আকারে ছোট, ভীষণ কিউট আর চাঁদ-তারাসদৃশ মুখশ্রীই কেবল নয় , অন্য আর কোন বর্ণটি আছে যাকে বাকি বর্ণেরা মিলে মাথায় তুলেও রাখে?
বাংলা ভাষাকে মায়াবী করে তোলার পেছনেও চন্দ্রবিন্দুর অবদানের শেষ কোথায়? চন্দ্রবিন্দু বিহনে "হাতি শুঁড় তোলে"র বদলে যদি বলতে হত "হাতি সুর তোলে", কেমন লাগত বলুনতো ? সঠিকভাবে চন্দ্রবিন্দু প্রয়োগ করতে জানাটাও একরকম শিল্প , সে শিল্প ঠিকমত প্রয়োগ না করতে পারলে হতে পারে ঘোরতর সংকট।শৈশবের বাগধারা শেখার দিনগুলিতে এমনতর চন্দ্রবিন্দু সংকটে পড়ে কি বেহাল দশাটাই না আমার হয়েছিল , সেই গল্পই না হয় বলি ।
বাংলায় একটি বাগধারা আছে "গুড়ে বালি" , তা বোধ করি সবাই জানেন,(আখ/খেজুর)গুড়ে বালি থাকাটাও কতটা মর্মান্তিক তাও জানেন।শৈশবে বাগধারাটি প্রথম শেখার পর , শুধু তার অর্থই জানতাম তা নয়, সেটা দিয়ে চমৎকার বাক্যও রচনা করতে পারতাম। কিন্তু কোন এক কারণে বাগধারাটির শাব্দিক অর্থ আমার কাছে রহস্যাবৃত রয়ে গেল। কথ্য বাংলায় "গুঁড়ো" কে "গুঁড়ে" বা "গুঁড়া"ও বলা হয় । কিন্তু উচ্চারণের সময় ভূত-তাড়ানো মনোভাব থেকে নাকিসুর বর্জনের চেষ্টায় "চন্দ্রবিন্দু" টা অনেকেই উহ্য রাখেন । "গুঁড়া দুধ" তখন হয় - "গুড়া দুধ" , সোজা সাপ্টা ইংরেজি যার "Powder Milk" । যাই হোক , যেভাবেই হোক , আমি "গুড়ে বালি"র গুড়কে সোজা গুঁড়া সাব্যস্ত করে "গুড়ে বালি" কে উল্টে পাল্টে শাব্দিক অর্থটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম।ফলাফল যা দাঁড়ালো, Powder Sand থেকে "গুঁড়া বালি" আবার সেখান থেকে Powder Sand , এই বৃত্ত থেকে বেরুতেই পারলাম না।বালি তো এমনিতেই গুড়া গুড়া সেটা আলাদা করে বলার কি আছে , কিছুতেই সে কথা মাথায় খেলতো না । অনেক চেষ্টার পর জোড়াতালি দিয়ে একটা ব্যাখ্যা অবশ্য দাঁড় করানো গেল। এক বিকেলে ঘরের পাশে কনস্ট্রাকশনের জন্য রাখা বালুর ঢিবি থেকে হাত ভরে এক মুঠো বালু নেয়ার পরই হাতের ফাঁক গলে সবটুকু বালি ঝরঝর করে ঝরে গেল। বাগধারার নিগূঢ় অর্থও বোধ করি সেই মুহূর্তে টলটলে পরিস্কার হয়ে গেল।ভেবে দেখলাম , বালি ভেজা হলে বিনা বাক্য ব্যয়ে আপনার হাতের মুঠোয় বন্দীদশা মেনে নেবে ।কিন্তু শুকনো "গুড়া গুড়া বালি" আপনার সমস্ত ধ্যান-জপ-সাধনা বরবাদ করে দিয়ে হুড়মুড় করে হাত গলে বেরিয়ে যাবে,ঠিক তেমনি কোন ইচ্ছা বা চেষ্টা অহেতুক/হুদাহুদি/নিরর্থক ভাবে করার নামই "গুড়া বালি" ।
চন্দ্রবিন্দু সংক্রান্ত সংকট "গুড়ে বালি" তেই সীমাবদ্ধ রইল না, আছড় পরল অন্যান্য বাগধারার উপর। এর মাঝে একটি হল "গাঁয়ে মানে না , আপনি মোড়ল" ।সেবার চন্দ্রবিন্দু আমার চোখকে ফাঁকি দিল,আমি পড়লাম "গায়ে মানে না আপনি মোড়ল"। তারপর বহু বহুদিন আকাশ পাতাল ভাবলাম , কিসে থেকে কি হল , "গা=শরীর" মানে না "আপনি=You" মোড়ল কোথেকেই বা এল , কোথায় বা গেল ? বাক্য রচনা আর অর্থ যথারীতি এটারও জানা ছিল , শুধু কোথায় যেন সংযোগ করতে পারতাম না। এটার ব্যাখ্যাটাও শেষ পর্যন্ত বের হয়েছিল । তবে সেটা বেশ নাটকীয়ই বটে, বর্ণনা করতে গেলে আপনাদের কল্পনাশক্তি মোটামুটি পরিপক্ক হতেই হবে। ধরুন , দু'জন লোক সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আছে, প্রথম লোকটি বেশ বিবেকবান , কর্মঠ, চেহারায় ঝড়ে পড়ছে নূরের আভা। দ্বিতীয়জন রীতিমত অকর্মণ্য , গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো কিসিমের লোক, তবে গায়ে গতরে বেশ তাগড়া , ফিক ফিক করে ভিলেনী হাসি হাসে ,খোঁচা দাড়ি বিশিষ্ট মাঝ বয়েসী। কথা ছিল, সমাজ প্রথম মানুষটিকেই সেরার সম্মান দেবে, কিন্তু "একদিন সব কিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যাওয়া" স্টাইলে দ্বিতীয় লোকটিই কোন ভাবে এলাকা জুড়ে প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করল । মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিবেকবান লোকটির সমস্ত শরীর কাঁপছে বিবেকের তাড়নায় , কিছুতেই সে মানতে পারছে না , তার "গা=শরীর" মানছে না , তারপরও অনেক কষ্টে সে বশ্যতা শিকার করে দ্বিতীয় লোকটিকে বলল "স্যার আপনিই মোড়ল" । ব্যাস হয়ে গেল "গায়ে মানে না , আপনি মোড়ল"।
এই চন্দ্রবিন্দু দুর্বিপাকের ঘনঘটায় আরও বেশ ক'টি বাগধারা আমার কল্পনাশক্তি কর্তৃক নির্মমভাবে হয়রানির শিকার হল , তার মাঝে একটি না বললেই নয়, সেটি হল -- "মরার উপর খাঁড়ার ঘা" । আমি কোন এক অজানা কারণে জেনেছিলাম, "মরার উপর খোঁড়ার ঘা" । কল্পনায় যে ছবিটা আঁকতাম সেটি এমন -- "কেউ মরে গেছে , পড়ে আছে তার লাশ । কোন এক খোঁড়া লোক অবিরাম লাথি মেরে চলছে সে লাশে" -- কি বীভৎস । খোঁড়া লোক লাথিই মারতে পারবে না এমন কোন কথা নেই , তবে হাতে মারাটাই তার সাথে বেশি মানানসই। তার চেয়েও বড় কথা কিছুতেই ভেবে পেতাম না শেষ পর্যন্ত যদি মারামারিই, বীভৎসতা আর চরম বিপদই বুঝাতে হয়, তবে খোঁড়াকেই কেন আমদানি করতে হবে? তারপর নিজেকে প্রবোধ দিলাম,মনের মাঝে গড়লাম তার ব্যখ্যা, দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো-- "খোঁড়া লোকের পা ছোট , বা অকেজো , কিন্তু সেই পা-তেই তার অসীম শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে, ঠিক যেমন অটিস্টিক বাচ্চাদের মাথা ভর্তি থাকে গণিত। সেই পায়ে সে হাঁটতে পারে না বটে, কিন্তু একবার যদি পা তুলে কষে একটা লাথি মারতে পারে , তাহলে জীবন্ত মানুষের লাশ হতে সময় নেয় না" । একবার যদি সেটা ঘটেই যায় , খোঁড়া লোকের রাগ তাতেও পড়বে না , সে মেরেই যাবে , মেরেই যাবে , লোকে বলবে "মরার উপর খোঁড়ার ঘা"।
মন্তব্য
চমৎকার বিশ্লেষণ তো! গুঁড়েবালির বিশ্লেষণ এইভাবে কখনো কেউ বলেও নি, মাথায় ও আসে নি। অসাধারণ! অনেকদিন পরে তোমার লেখা পড়ে ভালো লাগলো।
কেমন আছো? ব্যস্ততা কেমন?
লেখকের মন্তব্য
ধন্যবাদ ইমন । অনেকদিন পর তোমার কমেন্ট পেয়েও ভাল লাগল। মাথায় না আসলেই ভাল , আমার এই ব্লগ পড়ে মাথায় কু-বুদ্ধি ঢুকে গেলে বিপদ
আছি - মোটামুটি , লাইফটা সাইন কার্ভ
ব্যস্ততা - পুরাই দৌড়ের উপর , মনে শান্তি নাই
হাহাহা! অতিশয় উপাদেয় পরিবেশনা!
জমায় দিসেন, মেহরাব! দারুণ মজা পাইসি!
খুবই ভালো থাইকেন!
লেখকের মন্তব্য
আপনার জন্যও শুভকামনা
ভাল থাকবেন
আমি যদি ঠিকভাবে মনে করতে পারি বছর দেড়েক আগে এই পোস্ট নিয়া আলোচনা হইছিলো। যেটা কিনা তোমার মতে ড্রাফটে জমা থেকে অতলে হারিয়ে যাওয়ার পথে ছিলো। সেটাকে আলোর মুখ দেখতে দেখে ভালো লাগলো।
বললে বিশ্বাস করবে না এই ব্লগ পড়ার আগে গায়ে মানে আপনি মোড়লে -- এর সদ ব্যাখ্যা আমি কখনোই ঠিক করতে পারি নাই। মরার উপর খাড়ার ঘায়ের অনেক ব্যখ্যাও বের করেছিলাম।
তবে গুড়ে বালির যে ব্যাখ্যা কইলা শুনে হাসতে হাসতে মরে গেলাম।
পোস্টে সাততারা।
লেখকের মন্তব্য
খাঁড়া মানে তো জানো ? তাহলেই সব পরিস্কার, আমি খাঁড়ার অর্থ জেনেছি অনেক বড় হয়ে।
গাঁয়ে মানে আপনি মোড়লে -- এটা কি সিরিয়াসলি জানতা না? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে , হেহে
আমার ধারণা ছিল আমিই একাকি বোকাসোকা , এখন কিন্তু মোটামুটি নিশ্চিত যে আরও লোকজন আমার দলে আছে।
পোস্টটা কিভাবে উদ্ধার পেল কে জানে । আমার বেশির ভাগ পোস্ট কোনদিনও মুক্তি পাবে না , কারণ সেগুলোর উপযোগিতা হারিয়ে গেছে ।
লেখা খুব ভালো লেগেছে।
লেখকের মন্তব্য
অসংখ্য ধন্যবাদ
চন্দ্রবিন্দু আমার কাছে বেশ ন্যাকা ন্যাকা মেকি লাগে । জানি না কেন ।
- - আমার একভাই মাংসাশীকে পড়তো মাংসাই !! এমন ভুল কখনো করি নাই ! 
তবে একটা পড়তে গিয়ে আরকেটা পড়ার মতো রোগ আরো মানুষের আছে জেনে অবাক হলাম -
আমি এখনো নিছক কে নিছিক পড়ি , আনাড়ীকে পড়ি অনাড়ী, এ্যাগোনিস্টিক কে এ্যাগোনিস্ট ।
এমন আরো কতোশত ভুল যে করি
এই রকম আরো সমস্যা আছে উচ্চারণে যেমন রূপ নগরকে রূপন গড়, গজ নফর কে গজন ফর ই রকম অনেক। আমি তো এখনো মিউচুয়ালকে মুটুয়াল বলি। এই বিষয়ে একটা মজার ঘটনা বলি ছোটবেলায় ঢাকা থেকে ফেনী যাচ্ছি বাসে করে। আহসেপাশে যা ই পাই বানান করে পড়ার চেষ্টা করি। একটা উদ্ভট শব্দ দেখে থমকে গেলাম। আমার এক ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম উদকান্ডি কী জিনিস, খায় না মাথায় দেয়। আমার ভাই কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না অথচ আমি তখনও প্যানপ্যান করে যাচ্ছি। শেষ মেষ কঠিন ঝাড়ি খেয়ে আমি তাকে আমার দেখা বাসের পিছনের কাঁচ দেখালাম। সেটা দেখে তিনি হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে পারছিলেন না। উল্লেখ্য সেখানে লেখা ছিলো,
ঢাকা -দা ।।। উদকান্ডি
উদকান্ডি

লেখকের মন্তব্য
সেইরকম মজা পাইলাম
ভাইরে, আমি যে নড়াইলকে পড়েছিলাম নড়াইলো, আর টাঙ্গাইলকে টাঙ্গাইলো - মানে নড়িয়ে দিলো আর টাঙিয়ে দিলো আর কী? পরে বুঝলাম নড়া ইল আর টাঙ্গা ইল!! হা হা হা!!!
লেখকের মন্তব্য
চন্দ্রবিন্দু ন্যাকা ন্যাকা তো বটেই । ওটা না থাকলে মেয়েদের আহলাদ ৬০ ভাগ কমে যেত
আবার এটার অবদানও কম না, এই ন্যাকা ন্যাকা ভাবের কারণেই বাংলাদেশীরা দুনিয়ার তাবৎ ভাষা উচ্চারণ করতে জানে।
ভুল পড়াটা আমার নিত্যদিনের কাজ। বেশি হয় এটা পত্রিকার হেডলাইন পড়ার সময়। একবার পড়ে আঁতকে উঠি , পরেরবার ঠিকমত পড়ি ।
হা হা হা!! ভারী মজা পেলাম। চন্দ্রবিন্দু নিয়ে আরো লোকজনের মাথাব্যথা আছে জেনে ভালোও লাগলো।
এত উপাদেয় একটা পোস্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ মেহরাব শাহরিয়ার।
[পোস্টে কিন্তু 'র' আর 'ড়' নিয়ে কিছু ওলোট-পালোট আছে, ঠিক করলে ভালো হয়।]
লেখকের মন্তব্য
আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ । সময় করে ঠিক করে নেব
সেঁরেছে!
এই পোষ্ট পৈড়া আমার আবারো মনে হৈলো, ক্লাস নাইন-টেনের সেই হলুদ বইটাই শেষ করতে পারিনাই!
আফসুস!
লেখকের মন্তব্য
হলুদ ছিল নাকি ? আমাদের ছিল পিংক কালার। ক্লাস এইট থেকেই ঐ ব্যকরণ বই ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল , বইটা কিন্তু ভাল ছিল
বইটা কিন্তু আমি বেশ ভালো পাইতাম
অঁনেক অঁনেক আঁনন্দে চিঁত্ত হঁল রঞ্জিতঁ, মেহরাব ভাইয়া!
আসলেই অনেক মজারু-সজারু। চাঁদ-তাঁরাঁর গল্প শুনলেই শুভ্রদেবের "আঁমি হ্যাঁমেলিনের সেই বাঁশিওয়ালাঁ"র মোহিনী মায়ায় স্বপ্নকাঁতর হই!
তঁবে কিছু মনে না করলে বৈয়াকরণ রন্ধনে একটা ছোট্ট (পাঁচ)ফোড়ন মিশাই?
'ব্যকরণ' রন্ধনে য'ফলা দিলেই সিদ্ধ হয়ে যায়, তবে আরেকটু মুখরোচক আর উপদেয় করতে হলে য-ফলা আকার দিয়ে 'ব্যাকরণ' বানি্যে নিতে হয়।
শুভেচ্ছা নিরন্তর।।
লেখকের মন্তব্য
অসাধারণ কমেন্ট , অনেক ভাল লাগল আপনার ধরিয়ে দেয়ার ভঙ্গিটা
ইদানিং বাংলা এত কম লেখা হয় , বানান নিয়ে সন্দিগ্ধ মনটা চিরস্থায়ীভাবে বসত করছে । অনেক কৃতজ্ঞতা , ছোটবেলায় কত যত্ন নিয়ে এই বানানটা ঠিক করে লিখতাম , এখন বেমালুম হজম করে বসে আছি । একজন বলে গেছেন , লেখায় অনেকগুলো র/ড় এর এলোমেলো হয়ে যাবার কথা । লজ্জার মাথা খেয়ে জিজ্ঞেসও করা হয়ে ওঠেনি , ঠিক কোথায় কোথায় ভুলগুলো , এদিকে আমি নিজে নিজে খুঁজে বের করতেও পারছি না
মন্তব্য করুন