লেখকের ক‌থা

সদর দরজা

যোজন যোজন দূরে

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি

***

ছোট্ট বাক্সটা হাতে নিয়ে বসে আছে সিমরান। কিছু কার্ড, শুকনো ফুল, পাতা। একটা শুকনো পাতা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে সিমরান। পাতাটার একদিকে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, "“সিমরান, সিমি, সিমু, সিম, সোনামনি......ভালবাসি.......অনেক বেশি......”।" সিমরান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে পাতাটার দিকে। মাহফুজ এরকমই ছিল। ওর নামটা নিয়ে খেলতো যেন। কতভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, কখনো সংক্ষেপ করে, কখনো একটু বাড়িয়ে নিয়ে ডাকতো। একদিন ক্যাম্পাসে বসে ছিল দুজন, একটা গাছের নিচে। মাহফুজ খেলছিল ওর চুল নিয়ে। সিমরানের লম্বা লম্বা চুল নিয়ে খেলাটা মাহফুজের অনেক পছন্দ ছিল। নিজের অজান্তেই সিমরানের হাত চলে যায় চুলে। সেই গোছা আর নেই। কেটে ছোট করে ফেলেছে ঝামেলা এড়াতে। একটু কি দু:খ হয়? নাহ্, কিছুই মনে হয় না এখন আর। হঠাৎ গাছ থেকে চুলে খসে পড়া পাতাটা নিয়ে মাহফুজ বলল, ‘'নাও, এটা তোমার'’। সিমরান হাসে, ‘'কি করব এটা দিয়ে?'’ মাহফুজ বলল, '‘দাও, সারাজীবনের জন্য এটা তোমার হবে'।’ এই বলে কলম বের করে লিখে দিল। সিমরান যত্ন করে রেখে দিয়েছে। মাহফুজের দেয়া প্রতিটা জিনিস ও এইভাবে গুছিয়ে রেখে দিয়েছে ওর ছোটবেলার পুতুলের বাক্সটাতে।
মাহফুজও তো ওর একটা পুতুল ছিল। অনেক আদরের, অনেক যত্নের, অনেক ভালবাসার। সিমরান ছোট একটা শ্বাস ফেলে। ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ বের হয়। কাগজের ভিতর স্কচটেপ দিয়ে আটকানো ছোট্ট একটা ঘাসফুল, বেগুনী ঘাসফুল। রোজ সকালে মাহফুজ ফোন করে সিমরানের ঘুম ভাঙাতো। '‘সিমরান সোনা ওঠো, রেডি হও। আমি এক্ষুণি চলে আসবো।’'
আর সিমরান আদুরে গলায় বলতো, '‘কি আনবা আমার জন্য?'’
মাহফুজ হাসতো, ‘'বল কি চাও?'’ কারণ ও জানতো সিমরান রোজ রোজ আজব সব জিনিসের জন্য বায়না ধরবে। কোনদিন ঘাসফুল, কোনদিন প্রজাপতি, কোনদিন হয়তো বলতো মিমি চকলেট। আশ্চর্য ব্যাপার হল মাহফুজ ঠিক ঠিক খুঁজে নিয়ে আসতো ওর বায়না ধরা জিনিসগুলো। সিমরান আনমনে একটু হাসে। হাসিটা এত করুণ!
প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিনই সিমরান জানতো ওরা দুজন দুজনার। এটাই যেন ওদের নিয়তি। এছাড়া আর কিছু ও ভাবতেই পারতো না। মাহফুজের সামনে আসলেই ও অন্যরকম হয়ে যেতো। বুকের ভিতর ধুক ধুক, গলা শুকিয়ে কাঠ, মুখ ফ্যাকাসে আর সারা শরীর কেমন ঝিমঝিম করতো। সিমরান জানতো মাহফুজ সব বুঝতে পারছে। আর ওর এই ব্যাপারটা মাহফুজ দারুণ উপভোগ করতো। ঠোঁটের কোণায় মিশে থাকতো কৌতুক। সিমরান টের পেয়ে রেগে যেতো, আরো নার্ভাস হয়ে যেতো। মাহফজেরও যে এমন হতো না তা নয়। কিন্তু ও কিভাবে যেন একদম শান্ত থাকতো। সিমরানের বহুদিন লেগে গিয়েছিল মাহফুজের সাথে স্বাভাবিক হতে। আর যতদিন ও স্বাভাবিক আচরণ করেনি মাহফুজ কিচ্ছু বলেনি ওকে, কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি। অন্তত: সিমরান বোঝেনি। বাকিরা ঠিকই বুঝতো, বলতো, '‘মাহফুজ ভাইয়ের অবস্থাতো খারাপরে!’'
সিমরান ঠোঁট উল্টাতো, '‘হাহ্ খারাপ না কচু!’' কি করবে, ও যে বুঝতেই পারতো না।
মাহফুজের ব্যাপারে সিমরান ভীষণ পাগল ছিল। সবসময় আগলে রাখতো, যদি কেউ নিয়ে যায়, যদি মাহফুজ চলে যায়-এই ভয়ে অস্থির হয়ে থাকতো। সারাক্ষণ নজরদারি করতো মাহফুজ কোথায় গেল, কার সাথে কথা বলল, মোবাইলে কে ফোন করল, কে মেসেজ দিল-সমস্ত কিছুর ওপরে। এমনকি বিয়ের পরেও। কখনোই এমন কিছু পাওয়া যেতো না। মাহফুজ কখনো হাসতো, কখনো রেগে যেতো। সিমরান জানতো মাহফুজ শুধু ওরই, তারপরও কেন যে এত ভয় পেতো! হারানোর ভয়, হারিয়ে যাবার ভয়। ঠিক ছিল, সবকিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু তারপরও কেন, কিভাবে যে এমন ওলট পালট হয়ে গেল সিমরানের সাজানো পৃথিবীটা। ও টেরই পেল না মাহফুজ কখন এত দূরে সরে গেছে।
হঠাৎ করেই বদলে গেল মাহফুজ। আর ব্যাপারটা ঘটল ও চাকরিতে ঢোকার পর। যে সন্দেহ আর ভয় সবসময় সিমরান পেতো, সেটা দেখা দিল মাহফুজের মধ্যে। প্রায় প্রায়ই ঝগড়া, কথা কাটাকাটি,অশান্তি। মাহফুজের চিৎকার, ‘'তোমার রাত হয় কেন অফিস থেকে আসতে? কিসের এত মিটিং তোমার? কেন দুই দিন পর পর ঢাকার বাইরে যাবা? কি কাজ এত? বাসায় কেন অফিসের ফোন আসে? বসের সাথে পারসোনাল কথা শেষ হয় না?’' সিমরান প্রথম দিকে অবাক হয়ে যেতো, কষ্ট পেতো। তারপর প্রতিবাদ করতে শুরু করল। একদিন মাহফুজ সব সীমা অতিক্রম করে ওর গায়ে হাত তুলে বসল। ওইদিন থেকে অবাক হওয়ার ক্ষমতাও আর নেই সিমরানের।
তারপর হঠাৎ করেই মাহফুজ শান্ত হয়ে গেল। আর ওর ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না, ও কোথায় গেল, কি করল খুব কমই জানতে চায়। প্রায় প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে সিমরান দেখতো মাহফুজ বিছানায় নেই। একদিন টের পেল মাহফুজ বসার ঘরে বসে কার সাথে যেন কথা বলছে ফোনে। পরদিন সকালে সিমরান কললিস্ট চেক করল, ঝুমুর। নাস্তার টেবিলে ঠান্ডা গলায় জানতে চাইল, ‘'ঝুমুর কে?'’ মাহফুজের নির্বিকার উত্তর, ‘'আমার গার্লফ্রেন্ড'।’ ঘৃণায় মুখ কুচকে গিয়েছিল সিমরানের, ‘'গার্লফ্রেন্ড?’' উদ্ধতভাবে মাহফুজ বলল, '‘হ্যাঁ গার্লফ্রেন্ড। তোমার কোন সমস্যা আছে?'’ সিমরান কিছু বলেনি, উঠে চলে গেছে নাস্তার টেবিল থেকে। ধীরে ধীরে জানতে পেরেছে আরো অনেক কিছু, জানতে পেরেছে কতটা নিচে নেমে গেছে মাহফুজ। সময় কাটাতে স্কুলের বাচ্চা মেয়েদের সাথে রাত জেগে কথা বলে। সিমরান কিছু বলেনা। দূরে সরে যায়। যে মাহফুজকে ও পাগলের মত ভালবাসতো, তার ব্যাপারেই হয়ে যায় নির্বিকার। দুজন একসাথে থেকেও হয়ে পড়ে একা। একসময় ওর একাকীত্ব দূর করতে এগিয়ে আসে ওর কলিগ নাফিস। প্রতিটা কাজে সঙ্গী হয়, সময় দেয়, ফোন করে খোঁজখবর নেয়। সিমরান বুঝতেই পারে না যে কারণে মাহফুজকে ও ঘৃণা করতে শুরু করেছিল, মাহফুজের অবহেলা সেদিকেই ওকে ঠেলে দিয়েছে। বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে সিমরানের।
একটা কার্ড বের করল সিমরান বাক্সের একদম তলা থেকে। টকটকে লাল একটা কার্ড। ঠিক এক বছর পরে এই কার্ডটা দিয়েছিল মাহফুজ। ওপরে লেখা, "“For My Sweetheart.....Love You Forever....”." এই দিনটাতেই প্রথম মাহফুজ বলেছিল, ‘'ভালবাসি'’। এই দিনটা ওরা খুব ঘটা করে পালন করতো। ‘'এই দিনটা না আসলে কি হতো সিমু?'’ মাঝে মাঝে হেসে বলতো মাহফুজ। সিমরান কিছু বলতো না। শুধু হাসতো। সিমরানের বুকের ভেতরে কেমন হাসফাস লাগে। ‘‘কি হতো! কি হতো আজকের দিনটা না আসলে!’’
জীবনের অসাধারণ সুন্দর সময়গুলো সিমরান পেতো না। কিন্তু এমন কষ্টও তো পেতে হতো না। কার্ডটা উল্টে-পাল্টে দেখে সিমরান। তারিখ দেয়া ৫ মার্চ। ৫ মার্চ...৫ মার্চ......ক্যালেন্ডারে চোখ পড়ে সিমরানের। আজই তো ৫ মার্চ। ও কি ভুলেই গিয়েছিল? নাকি ওর অবচেতন মনে কোন না কোনভাবে রয়ে গিয়েছিল দিনটা? নইলে কেন এত এতদিন পরে ও স্মৃতির ডালি খুলে বসেছে?
সিমরানের হঠাৎ করেই মাহফুজকে ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে হয়। সেই মাহফুজকে, যে তাকে পাগলের মত ভালবাসতো, যার জন্য সিমরান পাগল ছিল। যে মাহফুজ যত কষ্টই হোক ওর ছোট ছোট প্রতিটা ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করতো, অনেক ভালবাসা নিয়ে অনেক আদর নিয়ে ওকে বিচিত্র সব নামে ডাকতো। ওকে একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। সিমরান কি যাবে? কি করে যায়, এত কিছুর পর?

*****

নিজের ঘরে বসে সিগারেট খাচ্ছিল মাহফুজ। যে ঘরটা একসময় ওদের লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেটাই এখন মাহফুজের শোবার ঘর, কাজের ঘর, মাহফুজের পৃথিবী। এক রুমে থাকে না ওরা বহুদিন। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না, কেউ কারো ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না। একটা নিরব সমঝোতার মধ্য দিয়ে সরে গেছে দূরে। এই সময়টা মাহফুজ সাধারণত গান শোনে। কিন্তু আজ শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে না। চোখ কুঁচকে সিগারেটের ধোঁয়ার কুন্ডলী উপরের দিকে উঠে যেতে দেখে। একটা সময় ছিল যখন এই সিগারেট খাওয়া নিয়ে সিমরান তুলকালাম কান্ড করতো। মাহফুজ খাবেই কিন্তু সিমরান কিছুতেই দেবে না। কত ঝগড়া, মান-অভিমান, কান্নাকাটি। মাহফুজ প্রতিজ্ঞা করেছিল যে খাবে না কখনো। বাসায় বা সিমরানের সামনেতো খেতোই না। তবে কখনো-সখনো বাইরে গেলে খেয়ে ফেলতো। একদিন সিমরান টের পেয়ে চরম রেগে গেল। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলল, '‘কি পাইছো তুমি? তোমার এই ছাতার জিনিস তুমি খাওয়া ছাড়বা না। এত কথা বলি তবু তোমার গায়ে লাগে না। তুমি যদি খাও আমিও খাব।’' ঠিকই খুঁজে পেতে সিগারেট বের করে খাওয়া শুরু করল। কিন্তু পারবে কেন? কাশতে কাশতে চোখে পানি চলে আসল, আর তারপর বমি। পুরো অসুস্থ। ওইদিনের পর মাহফুজ আর কখনো সিগারেট খায়নি। কিন্তু এখন......এই যে মাহফুজ একটার পর একটা পুড়িয়ে যাচ্ছে সিমরানের কোন বিকার হয় না। একদিন শুধু সাপের মত ঠান্ডা গলায় বলেছিল, '‘তোমার যদি এয়ার পলুশনের এত শখই হয়, দয়া করে সেটা নিজের ঘরে বসে করো। বাসায় যে আরেকটা প্রাণী বাস করে সেটা আশা করি তোমার মনে থাকবে।'’ মাহফুজ কিছু বলেনি। বাসায় থাকলে এই ঘরেই ওর সমস্ত সময় কাটে। সিমরান ভুলেও আসে না এদিকে। ঘড়ি দেখে মাহফুজ। রাত দশটা, এখনো দেড় ঘন্টা। সাড়ে এগারোটার আগে ঝুমুরকে ফোন করা যাবে না। বাচ্চা মেয়েটার আদুরে কথা, ছেলেমানুষি সবকিছুই উপভোগ করে মাহফুজ। কেন যেন সেই সেই সিমরানকে মনে পড়ে যায়। সিমরানের এখনকার নিষ্প্রাণ শীতল দৃষ্টি, ঠান্ডা গলা শুনলে বোঝার উপায় নেই ও একসময় এরকমই ভীষণ অস্থির, অবুঝ, পাগলি পাগলি, আহ্লাদী ছিল, যত সব ছেলেমানুষি আবদার ধরতো যখন তখন। যে সিমরানের অনর্গল বকে যাওয়া মাহফুজের কাছে ছিল রূপকথার গল্পের মত, তার সাথেই এখন হয়তো সাত দিনে একদিন কোন বিশেষ প্রয়োজনে একটা-দুটো কথা হয়।
মাহফুজ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে কেন সিমরান এত দূরে সরে গেল! সিমরান কখনোই এত কেরিয়ারিস্টিক মেয়ে ছিল না। কিন্তু চাকরিতে ঢোকার পর হঠাৎ করেই কাজ, কেরিয়ার ওর কাছে এত বড় হয়ে গেল। যত দোষ ওই শালা নাফিসের। গালিটা দিয়েই হেসে ফেলে মাহফুজ। বউয়ের প্রেমিককে কি শালা বলে? হা হা হা........সিমরান প্রথমদিকে কিছুতেই স্বীকার করতে চাইতো না নাফিসের ব্যাপারটা। কিন্তু এখন আর লুকায় না। ভীষণ ডেসপারেট।
সিমরান একা একা কোন কাজই করতে পারতো না। যেকোন কাজেই মাহফুজকে ওর দরকার হতো। একটা দরখাস্ত করতে হবে, এসাইনমেস্ট তৈরি করতে হবে, শপিং করতে হবে, ঘর গুছাতে হবে, নাস্তা তৈরি করতে হবে, সাজুগুজু করতে হবে-সবকিছুতে মাহফুজকে দরকার হতো সিমরানের। অথচ এখন একাই ও সমস্ত কাজ করে ফেলে। কোন সমস্যাই হয় না। নাহ্ একা আর কোথায়? নাফিস তো হাজির আছেই ওর যেকোন কাজ করে দেবার জন্য।
সিমরান দূরে সরতে শুরু করলে মাহফুজ একা হয়ে গেল অনেক। তখনই কথা হল ঝুমুরের সাথে। বাচ্চা মেয়ে, মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে। মাহফুজ অবলীলায় ওর সাথে বলে যায় অনেক গভীর সব কথা। ওর কোন বিকার হয় না। শুধু সময় কাটানো। ওর এখন আর মনেও হয় না যে কাজটা ঠিক হচ্ছে না।
হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। মাহফুজ উঠে যায় জানালার কাছে। আধ খাওয়া একটা চাঁদ আকাশে। আবছা একটা আলো পিছলে পড়ছে উঁচু উঁচু দালানের গা বেয়ে। কেমন অপর্থিব সুন্দর দেখাচ্ছে চারদিক। একদিন গভীর রাতে সিমরান জোর করে ওর ঘুম ভাঙিয়ে টেনে হিচড়ে বিছানা থেকে নামিয়ে ছাদে নিয়ে গিয়েছিল। ওই রাতে জোছনা ছিল, ভরা চাঁদের রূপালী আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চারদিক। ঘুম ঘুম চোখে ছাদে বসেও ঢুলছিল মাহফুজ। সিমরান ওকে ধরে বিকট ঝাকি, '‘দেখো দেখো, এইরকম জোছনা রাত সবসময় পাবা না। এত সুন্দর! এত সুন্দর!'’ মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সিমরান। আর মাহফুজ দেখছিল সিমরানকে। ওর চেহারাটা এত কোমল, মায়াভরা, আদুরে। সিমরান টের পেয়ে ভীষণ লজ্জা পেল, মুখ লুকাল মাহফুজের বুকে। তারপর গুনগুন করে গান গাইতে লাগল।
আলো জ্বলে উঠল হঠাৎ করেই। কারেন্ট চলে এসেছে। মাহফুজও ফিরে এল বাস্তবে। সিমরানের মুখটা এখন আর ওইরকম কোমল, মায়া মায়া নেই। স্থায়ী একটা কাঠিন্যের ছাপ পড়েছে মুখে, সারাক্ষণ কপাল কুচকে থাকে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে থাকে। ওর এই চেহারাটা অনেক নিষ্ঠুর মনে হয় মাহফুজের। ও সহ্য করতে পারে না, তাকিয়ে থাকতে পারে না বেশিক্ষণ।
ধীরে ধীরে মাহফুজ হাঁটে পুরো ঘরে। যখন ভীষণ অস্থির লাগে মাহফুজ ঘর জুড়ে চক্কর দিতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে ক্যালেন্ডারের সামনে এসে দাঁড়ায়। কত তারিখ আজ? ৫ মার্চ। ৫ মার্চ......৫ মার্চ কি কোন বিশেষ দিন? খুব পরিচিত লাগছে তারিখটা। চোখ কুচকে ভাবে কিছুক্ষণ মাহফুজ। মনে পড়ে, সাত বছর আগে এই দিনটাতেই সোনালী একটা বিকালে সিমরানকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে মাহফুজ একগুচ্ছ লাল গোলাপ দিয়েছিল। বলেছিল, ‘'ভালবাসি’'। সিমরান কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, থরথর করে কাঁপছিল ওর হাত। গোলাপগুলো কোনরকমে হাতে নিয়ে তাকিয়েছিল চোখ তুলে। ওর বড় বড় কাল চোখে টল টল করছিল পানি। ভেজা চোখে মিষ্টি একটা হাসি নিয়ে তাকিয়েছিল সিমরান। ওর ওই চেহারাটা কোনদিন ভুলবে না মাহফুজ। শুধু এই চেহারাটা দেখার জন্য ও যে কোন কিছু করতে পারতো। যে কোন কিছু। কিন্তু সিমরান থাকল না। সিমরান বুঝল না। চলে গেল, একই ঘরে থেকেও সিমরান এখন কত দূরে!
বুকের ভিতরে চাপ চাপ একটা ব্যথা হচ্ছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। অনির্দিষ্টভাবে একটু হাতড়ায় চারদিক। আস্তে আস্তে চেয়ারে বসে পড়ে হাঁপায় কিছুক্ষণ। আজকাল একটু বেশি টেনশন বা ভাবনা-চিন্তা করলেই এমন হয় মাহফুজের। ও কি মারা যাচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই?
হঠাৎ করেই সিমরানকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হল মাহফুজের- সেই সিমরানকে, সেইরকম আদুরে চেহারা, দুষ্টু দুষ্টু হাসি। সিমরানের পাগলামি ভরা ভালবাসা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল মাহফুজ।

*******

অন্যমনস্ক সিমরান মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে হেঁটে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়াল। একটু বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে ওকে। যেন বুঝতে পারছে না ও কি করতে চাইছে। হঠাৎ একটা শব্দ হতেই চোখ তুলে তাকাল সিমরান। ডাইনিং টেবিলের অন্য মাথায় দাঁড়িয়ে আছে মাহফুজ। একদৃষ্টিতে দেখছে ওকে। সিমরানের মনে হল মাহফুজের কাছে ছুটে চলে যায়। বুকে মাথা রেখে ওর হৃৎস্পন্দন অনুভব করে।
সিমরানের চোখের দৃষ্টিটা এত করুণ মনে হল মাহফুজের। মনে হল সিমরানওতো ওর মতই একা। ওরা দুজন দুজনার ছিল। পৃথিবীর আর কেউ কি পারবে ওদেরকে সেই পূর্ণতা দিতে? মাহফুজের খুব ইচ্ছা হল এগিয়ে যায়। আলতো হাতে আদর করে দেয় সিমরানকে। জড়িয়ে ধরে বলে, '‘কেন ভাবছো সোনা? এইতো আমি আছি তোমার।’'
কিন্তু ওরা কেউই এগিয়ে যায় না। ডাইনিং টেবিলের দুইপ্রান্তে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝের দিনগুলোর তিক্ততা, ঝগড়া, অশান্তি, ভুল বোঝাবুঝি ওদের মধ্যে তৈরি করেছে বিশাল দূরত্ব। ওরা সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে না। শুধু আকুল চোখে তাকিয়ে থাকে একজন আরেকজনের দিকে, যোজন যোজন দূর থেকে।

5.53
আপনার মূল্যায়ন: আপনি মূল্যায়ন করেন নি। গড় রেটিং: 5.5 (৮ জন মূল্যায়ন করেছেন)
শেয়ার করুন » Facebook Twitter Delicious Digg MySpace Google Orkut Blogger Google Buzz Technorati
অথবা এই সংক্ষিপ্ত লিংক শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য

ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬২৮৩(১)    

আরে!
আমাদের চতুরে আরেকজন গল্প নিয়ে আসলো, আর লোকজন ঝিমায় কেন?
অবশ্যই আপনাকে চতুর্মাত্রিকে স্বাগতম। চতুরে গল্প পাই খুবই কম।
আপনার গল্প নিয়মিত পাবো তো?
সমুদ্র সেঁচে গল্প নিয়ে আসুন চতুরে।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯১৩৩২(২)    
লেখকের মন্তব্য

অনেক অনেক ধন্যবাদ শাওন।

গল্প লিখতে ভাল লাগে বটে, কিন্তু বড্ড আলসেমী লাগে। তাই লেখা হয়ে উঠে না। চেষ্টা করবো।

ভাল থাকবেন।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬২৯৬(৩)    

ভুল বোঝাবুঝি খুব খারাপ জিনিস। খুব সুন্দর সম্পর্কও নষ্ট করে দেয়।

ভালো লাগলো আপনার লেখা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯১৩৩৫(৪)    
লেখকের মন্তব্য

আমাদের খুব বড় সমস্যা হল আমরা কখনো সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাই না। নিজের ভুলটাও স্বীকার করতে চাই না, কখনো নিজে থেকে এগিয়ে যেতে চাই না, আমাদের ইগো বড্ড বেশি। আর এজন্যই খুব সুন্দর, সহজ, স্বাভাবিক সম্পর্কও এইরকম জটিল আর তিক্ত হয়ে উঠে।

ধন্যবাদ দারুচিনি লবঙ্গ।

শুভকামনা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩২৮(৫)    

চতুরে স্বাগতম।গল্প ভালো লাগল

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯১৩৩৬(৬)    
লেখকের মন্তব্য

অনেক ধন্যবাদ আরিশ।

ভাল থাকুন।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩৪৪(৭)    

খুবই ভালো লাগলো গল্পটা

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯১৩৩৭(৮)    
লেখকের মন্তব্য

ধন্যবাদ শ্রাবণের ফুল।

শুভেচ্ছা।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩৪৬(৯)    

দূরত্ব অতিক্রম করার দরকার কি - ডিভোর্স করে ফেল্লেই পারে।
যে যার লাইফ নিয়ে সুখী থাকো ।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯২১৮৫(১০)    
লেখকের মন্তব্য

আপনার কমেন্ট পড়ে খুব হাসলাম আরণ্যক। ঠিকইতো, ডিভোর্স করে ফেললেই পারে। সহজ সমাধান। কিন্তু হয় কি জানেন, মাঝে মাঝে খুব সহজ বিষয়গুলোও আমরা কেমন বোকার মত জটিলতার জালে জড়িয়ে ফেলি। আর তারপরে আমরা নিজেরাও জড়িয়ে যাই সে জালে আষ্টে পৃষ্ঠে। তখন খুব সহজ সমাধানগুলোও হয়ে যায় অনেক দূরের আর দুর্বোধ্য।

আর ডিভোর্স করে ফেলতোই যদি তাহলে কি আর এটা গল্প হতো বলেন?

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩৭৫(১১)    

হ্যাল্লো ম্যাডাম, ব্যাপক মজা পাইলাম তোমারে চতুরে দেইখা! খুবই ভাল্লাগলো। থাকবা তো আমাদের সাথে? না থাকলে কিন্তু তোমারে (ঢিসুমাইক)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯২১৮৭(১২)    
লেখকের মন্তব্য

বাপরে...এমনে মাথায় হাতুড়া মারলে কেমনে কি করবো? হি হি...ভয়েইতো আত্মারাম খাঁচা ছাড়া।

থাকবো না কেন মেঘু? আমিতো আছিই, তাই না?

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩৭৯(১৩)    

গল্প ভালো লাগলো
চতুরে স্বাগতম সমুদ্রকন্যা
:)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩৮২(১৪)    

ভালো লাগল।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৩৯১(১৫)    

(স্বাগতম)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৫৭৩(১৬)    

(স্বাগতম) গল্প ভাল পেলাম।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৬৬০৫(১৭)    

আর্বান দাম্পত্য, শৈত্য, দুজনের ভেতরে তুষারপাত আর ক্রমশ নিজেদের হারিয়ে ফেলা - এইসব।

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৮৭৬০৬(১৮)    

আমার চরম শত্রুরও যেনো এরামটা না হয়! আপনাকে স্বাগতম :)

 
ব্লগারের প্রোফাইল ছবি
#৯১৩৫৮(১৯)    

চতুরে স্মুদ্রের মেয়েরে দেইখা আরাম পাইলাম। :)

সবার গল্পে সংসারে খালি অশান্তি। আর ভাল্লাগে না। :(

 

মন্তব্য করুন

এই তথ্যটি সর্বদাই গোপন রাখা হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ছবি যাচাই
আপাতত: শুধু মানুষদের জন্যই আমাদের দুয়ার খোলা। পরে নাহয় রবোট, বায়োবট বা এন্ড্রয়েডদের কথা বিবেচনা করা যাবে।
8 + 0 =
এই গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করুন এবং সঠিক উত্তরটি উপরের ঘরে লিখুন। যেমনঃ ১+৩ এর জন্য লিখুন ৪।