সুরঞ্জনা-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি


সেই কবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।কবে যে খুলবে কে যানে। ভালো লাগেনা। নরওয়েজিয়ান মিশন, আর সিএনবি কলোনীতে আমার বন্ধুরা থাকে তাদের সাথে কত দিন দেখা হয়না। আস্তে আস্তে কারফিউ শিথিলের সময় বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু মানুষের আতঙ্ক তো কাটছে না। মানুষই বা কয় ঘর আছে এই শহরে? আমাদের এই শান্তিপাড়াতেই তো মাত্র ক’টি পরিবার। সুন্দর ভাই, মাখন ভাই ও পাড়ার আরও অনেক যুবকদের দেখিনা এখন। শুধু মিসিরউল্লার বড় ছেলে “লিয়াকত” ফিরে এসেছে সিলেট থেকে। কলেজ বন্ধ তাই।
আমার ছোট বোনটি দুধের শিশু, আব্বা, আম্মার চিন্তা ছিলো তার দুধের জন্য। অনেক খুঁজেপেতে আব্বা কয়েকটা দুধের কৌ্টা এনে আম্মার হাতে দিয়ে বললেন, এই দিয়ে যে কয়দিন যায় তাই চালাও। “তারপর”? আম্মার প্রশ্নে আব্বা কেমন রেগে গিয়ে বললেন, “তারপর চালের গুড়ি করে খাওয়াবে”। বাজারে দোকান পাট বলতে গেলে কিছুই নেই, সব পুড়ে ছাই হয়ে আছে। একদিন বড় রাস্তা পার হয়ে দেখতে গেলাম, কালো কালো কঙ্কালের মত কিছু পাকা পিলার, আর আগুনে বেঁকে যাওয়া লোহার পিলার যেন দাঁত ভেংচি দিচ্ছিলো। কালো ছাই গুলো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। আমাদের পাশের পাড়ায় কিছু ঘরবাড়ি এমনি পুড়ে ছাই হয়ে আছে। গ্রাম থেকে কিছু মানুষ মাছ, মুরগি শাক-সব্জি নিয়ে আসত, তাদের থেকেই কেনা হত। তাও প্রয়জনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ঘরে চাল, ডাল, আলু বস্তা ভরে কিনে রাখা হলো। আম্মা বললেন, বাসাতেই কিছু শাক-সব্জি লাগাতে হবে, আমি তো একপায়ে খাড়া। রান্না ঘরের পাশে মরিচ গাছ লাগালাম সারি করে, উঠোনে মাটি কুপিয়ে ঢেড়শ, বেগুন, ডাটা এসব লাগালাম, কিছু একটা কাজ করতে পেরে আমি মহা-খুশী।
রাত হলেই চারিদিক নিঝুম হয়ে যেত। আব্বা অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে আটটা বেজে যেত। কারফিউএর মাঝেও আব্বা
কে কাজ করতে হত, দুঃখ করে আব্বা বলতেন, “আমি তো সরকারের চাকুরি করি। চাকুরি মানেই “চাকর”। তারউপর সন্ধ্যা থেকেই লাইট নিভিয়ে হেরিক্যান জালাতে হতো। সেই হেরিক্যানের আলোও যেন ভেন্টিলেটার দিয়ে কোনমতেই বাইরে না যায় তার জন্য চিমনীর গায়ে চারকোনা করে কাগজ সেটে দেয়া হয়েছে। কাগজের ফাঁক দিয়ে যেটুকু আলো আসে তাতেই কাজ চালাতে হবে। মাঝে মাঝে রাতের নিরবতা ভেঙ্গে মেইন রোডের গাড়ির শব্দ শোনা যায়। আর মিছিরউল্লাহ’র বাড়িতে মানুষের কলরব। আগে ঐ বাসায় যেতে দিতে আম্মা কোন আপত্তি করেন নি, কিন্তু এখন কেনো জানিনা যেতে মানা করেন।
একদিন সন্ধ্যায় আম্মা আমাকে মাদুরের উপর বসে পড়াচ্ছিলেন। ভাইয়া বসার ঘরে পড়ছিল, ওর পাশে ছোট কাজের ছেলেটা। ছোট বোনটি মশারীর নিচে ঘুমিয়ে। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, আব্বা এসেছে মনে করে ভাইয়া দরজা খুলে দেয়। তিনজন পাক-সেনা এসে ঘরে ঢুকে, একজন ভাইয়াকে ঐ ঘরে ধরে রাখে, বাকি দুজন সোজা আমাদের ঘরে। ফোনা তোলা গোখরো সাপের মত আম্মা ফুসে উঠে বললেন, “কার অনুমতি নিয়ে আপনারা বাসায় ঢুকেছেন”? সে কথার উত্তর না দিয়ে তাদের একজন নিজেকে ক্যপ্টেন ( নাম মনে নেই) পরিচয় দিয়ে বল্ল, রাত আটটা থেকে ব্ল্যাক আউট, বাতি জ্বালাবেন না”। আম্মা বললেন, “দেখছেন না আমরা হেরিক্যান জ্বালিয়েছি”। বিছানার দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞাসা করে “ওখানে কে”? আম্মা বললেন, “আমার মেয়ে”। একজন গিয়ে মশারী তুলে দেখলো। আমি মুখে পেন্সিল পুরে সব দেখছিলাম, দরজার সামনাটা একটু ফাকা হতেই আম্মা আমায় ঠেলে দিয়ে বললেন, যাতো, পিস-কমিটির চেয়ারম্যান মিছিরউল্লাহ সাহেব কে ডেকে নিয়ে আয়। তখন ওরা বলে উঠল, “ ঠিক আছে ঠিক আছে, আমরা যাচ্ছি, কিন্তু খবরদার লাইট জ্বালাবেন না। ওরা চলে যেতেই আম্মা রক্তশুন্য মুখে ধপ করে বিছানায় বসে পড়োলেন। আমায় বললেন, ঐ বাসায় যেয়ে আব্বাকে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলতে।আমি অবাক হয়ে আম্মাকে দেখছিলাম। এই আর্মি দেখে আম্মা কেন এতো ভয় পেলেন তা আমার বোধগম্য হচ্ছিলোনা। ৬৯ এ এই আম্মার দেখেছি আগুন ঝরা রুপ। মিছিলে গুলিবিদ্ধ দুজন ছেলে আর্মির তাড়া খেয়ে আমাদের বাসায় ঢুকেছিলো।
আম্মা নিজের হাতে তাদের ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। তখন দরজায় মিলিটারি মুহুর্মুহু করাঘাত আর লাথি চালাচ্ছিলো। আম্মার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলোনা। চেয়ার দিয়ে দেয়ালে উঠে ওদেরকে বাসার পিছন দিকে পালাতে সাহায্য করেছেন। দরজা ভেঙ্গে যখন আর্মি ঘরে ঢুকেছিলো, তখনও আম্মা কত শক্ত ভাবে তাদের সাথে কথা বলেছেন। আম্মার সে আচরনে আব্বার সরকারী চাকরীতে জবাবদিহি করতে হয়েছিলো। আর এখন আম্মা আর্মি দেখে এত ভয় পেলেন? তখন বুঝিনি, বড় হয়ে বুঝেছি আমার ২৭ বছরের তরুনি মায়ের ভয়ের কারন।
মন্তব্য
অসাধারণ একটা কাজ করছেন আপা!
লেখকের মন্তব্য
অসাধারন কি রে পাগলি? স্মৃতির মাটি খুড়ে সে সময়এর কঙ্কাল বের করার চেষ্টা করছি।
লেখা পড়ে একদম সেই সময়কার অন্ধকার ভয়টা টের পাইলাম, গায়ে একটু একটু কাঁটা দিয়ে উঠলো।
আপনার মায়ের জন্য অনেক অনেক শ্রদ্ধা।
লেখকের মন্তব্য
সেই দুঃসহ সময়ের কথা মনে হলে অবাক হয়ে ভাবি, কি করে পার করেছি সে দিনগুলো।
ধন্যবাদ শাওন। চার বছর হলো আমার সাহসী মা ক্যান্সারের কাছে হার মেনে চলে গিয়েছেন। উনার জন্য দোয়া কোরো।
মমতাময়ী মায়েরাও ভেতরে ভেতরে কত সাহসী হতে পারেন, সময়ের প্রয়োজনে মানুষ কত কিছুই না করতে পারে।
লেখকের মন্তব্য
ঠিক বলেছ আপু। সময়ের প্রয়োজনে তখন এ দেশের নিরক্ষর, সহজ সরল মানুষগুলো কত দুঃসাহসী হয়েছিলো তা ভাবলে অবাক লাগে।
অসাধারণ!
লেখকের মন্তব্য
অসংখ্য ধন্যবাদ নুশেরা।
আপনার আম্মার জন্য মন থেকে দোয়া রইলো।
লেখাটা একই সাথে ভয়ের এবং মন খারাপের
লেখকের মন্তব্য
অনেক ধন্যবাদ নীল বালক।
তারা শর্ট পড়ে গেল সুরঞ্জনাদি। পরের পর্বের অপেক্ষায় আছি।
লেখকের মন্তব্য
আপনাদের ভালো লাগাই তো আমার জন্য ধ্রুবতারা মামুন হক।
অসংখ্য ধন্যবাদ।
পরের পর্ব আসুক। আচ্ছা আপনার বোনটির বয়স তখন কত ছিল?
লেখকের মন্তব্য
বোনটি তখন ২বছরের ছিলো।
সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ মেঘ।
আপনার বোনটির সাথে পরিচিত হতে ইচ্ছে করছে যে!
লেখকের মন্তব্য
মেঘ বোনটির সেই ছোট্টবেলার ছবি এই মুহুর্তে আমার কাছে নেই।
তুমি যদি এফবিতে আমার বন্ধু তালিকায় থাকো, তবে দেখাবো।
আপা, প্রতিটা পর্বে পূর্ববর্তী পর্বগুলোর লিঙ্ক যোগ করে দিও। পরে ট্রেইস করতে সুবিধা হবে।
লেখকের মন্তব্য
২ বছর ধরে ব্লগে থাকলেও লিঙ্ক দিতে পারি না।
তবুও চেষ্টা করে দেখবো।
অসাধারন লাগছে পড়তে। দম বন্ধ করে পড়ছি।
যে কোন ব্লগেই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে মুক্তিযুদ্ধের এরকম বর্ননা খুব দুর্লভ একটি বিষয়। প্রথম পর্ব শেষ করে দ্বিতীয় পর্বে এসে মন্তব্য করার লোভ সামলাতে পারলাম না। অনেক ভালো লিখেছেন আপু। পরের পর্বগুলোর পাঠক হবার আশা রাখছি।
কাজের ফাঁকে আপনার লেখাটা পড়ছি। আপনার লেখা এতো সাবলীল, মনে হছ্ছে চোখের সামনে সব দেখতে পারছি। সাথে আছি, পরের পর্বের অপেক্ষায়। ভালো থাকবেন।
লেখকের মন্তব্য
সাথে থাকায় অনুপ্রেরনা পাচ্ছি সুবর্ণা।
অসংখ্য ধন্যবাদ।
এক অসাধারণ সময়ের অসাধারণ গল্প!
লেখকের মন্তব্য
তখন কিন্তু আমাদের কাছে সময়টাকে ভয়ংকর মনে হয়েছিলো। এখনও মনে হয়।
আর দেশ যেদিন স্বাধীন হলো, তখন সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
অসাধারনের অনুভুতি পরে হয়েছে।
অনেক ধন্যবাদ চতূষ্কোণ সাথে থাকার জন্য।
পর্বগুলি যেন শেষ না হয়।
স্মৃতির গভীর থেকেও গভীরে গিয়ে তুলে আনুন সব, দরকার আছে তার।
লেখকের মন্তব্য
দীর্ঘ নয় মাসের সেই দুঃস্বহ দিনগুলোর কথা তো অতো সহজে শেষ হবার নয় তারার হাসি।
কিন্তু আমার লেখার ক্ষমতা যে সীমিত। তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছি যতটুকু পারি তুলে আনার জন্য।
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
ভয়ংকর ব্যাপার ।
মানুষের কি অসহায় ছিলো।
মনুষত্বের কতো অবমাননা হয়েছে ১৯৭১ এ ।
লেখকের মন্তব্য
১৯৭১ এর জ্বলন্ত গ্রামের ছবি বা রাজাকারদের হাতে বন্দী মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি অনেক খুজেও পেলাম না। এতো এতো ছবি আছে কিন্তু গ্রাম শহর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, গোয়ালে অগ্নীদগ্ধ পশুর পাশে ঝলসানো মানুষের শরীর, এসব সেলুলয়েডের পাতায় নেই। প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতির ক্যামেরায় রয়ে গিয়েছে।
অনেকদিন এত আগ্রহ নিয়ে কোন লেখা পড়িনি 'বু
অসাধারন 
লেখকের মন্তব্য
এতোদিন আছিলি ফাকিবাজ!

মন্তব্য করুন